চুল হচ্ছে ত্বকের বাইরের স্তরে অবস্থিত ফলিকন থেকে উত্পন্ন হওয়া চিকন লম্বা সুতার মত প্রোটিন তন্তু। কেরাটিন হচ্ছে চুলের প্রধান উপাদান। ত্বকের বহিঃস্তরে অবস্থিত ওই চুল শুধু মানুষের থাকে বিষয়টি এমন নয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরেও দেখা যায়। তবে মানুষ ছাড়া অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে যে নরম সুন্দর চুল পাওয়া যায় তাকে ফার বা লোম বলে। আবার ভেড়া এবং ছাগলের শরীরে উত্পন্ন চুলকে উল বলে। এভাবে প্রাণীর পার্থক্য ও ভাষার ভিন্নতায় চুলের নামকরণ হয়েছে ভিন্নভাবে। যেমন হিন্দি ভাষাতে চুলকে যা বলা হয়; তা বাংলা ভাষাভাষীদের দৃষ্টিতে অশ্লীল কথা। গালি হিসেবেই তা ব্যবহূত হয়। তবে যাই হোক সামপ্রতিক সময়ে যে চুল নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত হয়েছে তাতে প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জড়িয়ে পড়াতে শেষ পর্যন্ত যে তা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যায়নি সেটাই আমাদের ভাগ্য! কারণ ওই বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রাজপথে চুলাচুলির ঘটনা ঘটলে তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াত -আমরা কী একবারও ভেবেছি? শেষ পর্যন্ত ওই চুলাচুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল হরতাল, অবরোধ, পথসভা, মানববন্ধন ডাকলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। আশার কথা হচ্ছে, এখনও পর্যন্ত ওই রকম কোন ঘটনা ঘটেনি। ওই চুলাচুলির বিষয়টি কেবলমাত্র রাজনীতিবিদরা কথার পাল্টা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তবে ওই ধরনের রাজপথে চুলাচুলির ঘটনাও রাজনীতিতে নতুন নয়। সরকারি ও বিরোধী দলের নারী কর্মীরা বহুবার প্রতিপক্ষের সাথে আবার কখনওবা নিজ দলের কর্মীদের সাথে চুলাচুলির ঘটনায় জড়িয়ে সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন প্রায়ই ইডেন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে হলের সিটের দখল নিয়ে চুলাচুলির সংবাদ পেতাম। ক্যাম্পাসে ওইসব চুলাচুলির সাথে সম্পৃক্ত মেয়েদের দেখলে ছেলেরা ভেংচি কাটত এই বলে: চুল আর শাড়ি, দুই মিলে নারী/ যে করে চুলাচুলি-মারামারি, পোস্ট পায় সে তাড়াতাড়ি। এই কথার সত্যতাও ছিল। ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রী হলের কমিটি দিলে দেখা যেত ওই চুলাচুলিতে পারদর্শী ছাত্রীরাই বড় পদগুলো বাগিয়ে নিয়েছে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে যেখানে জাতি সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য আশা করে সেখানে ওই ধরনের চুলাচুলি জনগণের প্রত্যাশার বাইরে। জনগণ চায় আসন্ন নির্বাচন কিভাবে শান্তিপূর্ণ হবে সেই বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ। সরকারি দল কতটুকু ছাড় দিয়ে সংলাপের মাধ্যমে বিরোধী দলকে নির্বাচনমুখী করবে সেই বিষয়ে আলোচনা। অন্যদিকে, বিরোধী দল কী হরতাল,অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির ধারাতে আন্দোলন সংগ্রাম করবে না শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকারকে বাধ্য করবে তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে সেই বিষয়েই মূলত নেতা-নেত্রীর কাছে শুনতে চায়। কিন্তু আমরা দেখছি ঠিক এর উল্টা ঘটনা ঘটছে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তার কথায় স্থির থেকে এক চুলও ছাড় না দেন এবং বিরোধী দল আন্দোলনের মাধ্যমে সেই চুল উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন; তবে রাজপথে সরকারি ও বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে চুলাচুলির ঘটনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর ওই চুলাচুলি যদি শেষ পর্যন্ত পুনরায় লগি-বৈঠার তাণ্ডব নৃত্যের মত মানুষের প্রাণহানি ঘটালেও ঘটতে পারে, তাতে এক-এগারোর মত কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও রাজনীতিবিদরা তার দায় এড়াতে পারবে না।
লেখক:শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]
