আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার না অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হবে — এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব শেষ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। এখনও যেহেতু দু’দলের মধ্যে কোন সমঝোতা হয়নি, এমনকি সমঝোতার কোন উদ্যোগও সরকার দলের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে না—ধরে নিচ্ছি এই দ্বন্দ্বের স্বাভাবিক পরিণতিই ঘটবে। অর্থাত্ সমঝোতা হবে না। কারণ, এই দ্বন্দ্বের মূল কুশীলব ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন না। বি.এন.পি বলছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে দলটি নির্বাচনে যাবে না। তাদের সন্দেহ শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবেন। যে কারণে ১৯৯৫-৯৬ এ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়াকে আওয়ামী লীগ মানতে চায়নি, ঠিক একই কারণে বি.এন.পি শেখ হাসিনাকে মানতে চাইছে না। এই অবস্থায় চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে পত্র-পত্রিকার বিভিন্ন বিশ্লেষণে তিনটি সম্ভাব্য চিত্রই বর্ণিত হয়েছে। প্রথম চিত্রটি হচ্ছে, সকল দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই নির্বাচন সরকারি দলের অবস্থান অনুযায়ী তাদের terms of reference অর্থাত্ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। আর বি.এন.পি’র দাবি সকলের অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই সম্ভব হবে। এ দু’টোর কোনটিই যদি না হয় তাহলে তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে কোন নির্বাচন-ই হবে না।
প্রথম সম্ভাব্য চিত্রটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক পথেই এগোবে। সংবিধানের ১২৩(ক) এর (খ) উপধারা অনুসারে মেয়াদ শেষের তিন মাস আগে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া গেলে সেক্ষেত্রে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। অধিকতর সংকট এড়াতে আওয়ামী লীগ মেয়াদ শেষের তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচন করবে। দলীয় প্রধানের বক্তব্যে তারই ইঙ্গিত আছে। আর এটি না করলে আওয়ামী লীগ ঘরে-বাইরে রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে যাবে। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে দলটির চূড়ান্ত ধস নামবে। আমার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। তবে সেক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অর্থ, সরকারি আমলাদের বদলি সংক্রান্ত ক্ষমতা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ক্ষমতা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে ছাড় দিবে। আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে উপরোক্ত বিষয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিবে বলেই আমার ধারণা। সেই সাথে নির্বাচন কমিশনকে এই মুহূর্তে নিজের ক্ষমতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখতে সরকার সচেষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। এটি আওয়ামী লীগের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অত্যাবশ্যক। এই প্রেক্ষাপটে বি.এন.পি নির্বাচনে যাবে, কারণ এ অবস্থায় নির্বাচন বয়কট করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকবে না। ঝুলন্ত ভোটাররা সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে সুশাসনের বিষয়ে যেমন, হলমার্ক, ডেসটিনি দুর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী আচরণ বিষয়ে স্বচ্ছ, সময়োপযোগী আচরণ আশা করেছিল, যা তারা পায়নি। এই ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইমেজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা থেকে কাটিয়ে উঠার বাস্তবসম্মত চেষ্টা করতে দলটি এখনও সফল হতে পারছে না। ফলে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ভোটে বি.এন.পি’র জয়ের পথ প্রস্তুত করে রেখেছে। সঙ্গত কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও হেফাজতে ইসলামের প্রতি আওয়ামী লীগের আচরণ ধর্মীয় অনুভূতিসম্পন্ন ভোটারদেরকে সংক্ষুব্ধ করেছে। ফলে তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে প্রচারণায় নামবে। এদের ভোট পুরোটাই বি.এন.পি’র দিকে যাবে, যা কিনা ভোটের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব পাল্টিয়ে দেবে এবং বিরোধী রাজনীতির মোকাবেলায় মধ্যবিত্ত ভোটাররা আরও নমনীয় আচরণ আশা করেছিলো। আর এই নির্বাচন বয়কট করলে তা বি.এন.পি’র জন্য রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। খালেদা জিয়ার পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যত্ তমসাচ্ছন্ন হবে। সর্বোপরি নির্বাচন থেকে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদেরকে দূরে রাখা বি.এন.পি’র জন্য দুরূহ হবে। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির উত্থান ঠেকাতে হলে বি.এন.পি’র নির্বাচন করা ছাড়া আর বিকল্প থাকবে না।
যদি উপরের সম্ভাব্যটি কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিবে। নির্বাহী ক্ষমতা বিষয়ে যদি আওয়ামী লীগ কোন ছাড় না দেয়, তখনই বি.এন.পি নির্বাচন বয়কটের সম্ভাবনাই বেশি। বি.এন.পি সেক্ষেত্রে তার মিত্রদের নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নির্বাচন ঠেকাবে। নির্বাচন ঠেকাতে বি.এন.পি ও তার মিত্ররা নির্বাচনের দিনে সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল বা ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা, এমনকি ভোট কেন্দ্রে ব্যারিকেডের সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবে। আওয়ামী লীগ নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করলে সহিংসতা বাড়বে। যে কারণে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি অনেকটা ১৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৯৬) মতোই হবে। ফলে এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলবেন। তবে আইনগতভাবে নির্বাচনটি হতেই হবে এবং এই নির্বাচন দ্বারা সৃষ্ট সংসদই পরবর্তী সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে পারে। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে একটি অবৈধ সংসদের জন্ম দিয়ে সংকট মোকাবেলার চেয়ে উপরের বিকল্প গ্রহণ করাই হবে আওয়ামী লীগের জন্য সংকট উত্তরণের Safe Exit।
সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) ধারা অনুসারে সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বর্তমান সরকারই দায়িত্ব পালন করবে। সেটি হলেও রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতা কমবে না। আর রাজনীতিকে ঐ অবস্থায় টেনে নিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সততা জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আওয়ামী লীগ নিজেদের রাজনৈতিক ইমেজকে পুনরুদ্ধার করতে হলে এই পথ থেকে ফিরে আসতে হবে।
এখন আসি আমরা তৃতীয় সম্ভাব্যতার দিকে। যথাসময়ে নির্বাচন না হলে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে। আর এর দায়ভার ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। যেমনটা বি.এন.পি’কে নিতে হয়েছিল ১/১১ সরকার আগমনের পটভূমি তৈরিতে।
নির্বাচন না হলে অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসবে। এটি আগের চেয়ে আরও সংগঠিত উপায়ে আসতে পারে। আর এই শক্তি আসলে দুই নেত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ আগের চেয়ে আরও সংকটাপন্ন হবে। সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলা হবে। দল ভাঙ্গার রাজনীতি যে আবার শুরু হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, তাতে আওয়ামী লীগ ও বি.এন.পি উভয়ের ক্ষতি বেশি। কেননা, এই ১/১১ সরকারের মতই এই সরকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। এই সরকারের পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আগের চেয়ে আরও বেশি থাকতে পারে।
তবে ১/১১ এর অভিজ্ঞতা দুই নেত্রীর স্মৃতিতে ভাস্বর। তারা অন্তত: চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশকে ঐ পর্যায়ে নিয়ে যাবেন, এটা এবার নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে চলমান রাজনৈতিক সংকটের ইতিবাচক সমাধান হবে এবং এক্ষেত্রে প্রথম বিকল্পটি কার্যকর হবে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
