আলোকপাত

হায়রে সন্তান ও পিতা মাতার ভাবনা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৫
“রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একলা জাগিছে মাতা করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা, শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরান দোলে।” হায়রে সন্তান! তার কল্যাণে সর্বদা মায়ের ব্যাকুলতার অন্ত নেই। গভীর রাত। সমগ্র বিশ্ব ঘুমে আচ্ছন্ন। কোথাও কোনো সাড়া নেই। পরিপূর্ণ নিথর রাত্রির বুকে হয়ত আমি একাই জেগে। এক নিঃসঙ্গতা। সবাই ঘুমাচ্ছে। শুধু ঘুম নেই আমার চোখে। দূরে কোথায় দূরে, আমার মন বেড়ায় ঘুরে। নিয়ে যায় ক্রমাগত উপলব্ধির গহিন গহনে। ক্রমশ চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলে আনন্দে-বেদনায়,সুখ স্মৃতি রোমন্থানে। একাকি কাঁদতে ইচ্ছে করে। এক সময় ক্লান্তিতে ঢলে পড়ে দেহ মন। মৌন প্রকৃতির বুকে জেগে উঠে বিচিত্র অনুভূতি। না-বলার কথার ধ্যানমৃদঙ্গ ধ্বনির মতো মনের গহ্বরে কেবল বেজেই চলে। মন চলে যায় শৈশব-কৈশোরে। মনে পড়ে কত কথা। আমাদের জীবনের এই অস্তিত্ব, সাফল্য ও উত্কর্ষতায় বাবা-মা এর ভূমিকা সীমাহীন। বাবা-মা এর ভালোবাসা, বিশেষ করে মায়ের ভালোবাসা আকাশচুম্বী। সন্তানের কল্যাণে শর্তহীন, স্বার্থহীন বিনিময়হীন ভালোবাসা কেবল বাবা-মাই দিতে পারেন। পবিত্র কোরানে ভক্তি ও শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে আল্লাহর পরেই পিতা-মাতার স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন— যে পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট করে সে আমাকে সন্তুষ্ট করে। মহানবী হয়রত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। পিতা-মাতার স্নেহ মায়া-মমতা বেহেশতের শ্রেষ্ঠদান। সুতরাং পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালনের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে পৃথিবীতে স্মরণীয়-বরণীয় এবং মর্যাদা লাভ করা যায়। বই পড়লে মাতৃভক্তির অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। যেমন, বায়েজীদ বোস্তামী অসুস্থ ঘুমন্ত মায়ের শিয়রে গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রাত কাটিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের চিঠি পেয়ে খরস্রোতা নদী পার হয়েছেন সাঁতার কেটে। এ সবই সম্ভব হয়েছিল গভীর মাতৃভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে। অথচ আজ কোথায় সে ভালোবাসা? যখন খবরের কাগজে দেখি সন্তানের হাতে পিতা-মাতার নৃশংসভাবে খুন হওয়ার কাহিনী; তখন ভাবি আধুনিক সভ্যতা, পৃথিবীর ক্রমবিকাশ এ কোনিদকে অগ্রসর হচ্ছে? সন্তান হয়ে দিনের পর দিন বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা করে ঐশী। পরিশেষে একদিন বেশি করে কফির সাথে ঘুমের ওধুষ/চেতনানাশক খাইয়ে পরিকল্পনা মাফিক হত্যা করে তার জন্মদাতা মা-বাবাকে। এটা কি একটি বাস্তব ঘটনা? এও কি সম্ভব? এই মনকে যেন বিশ্বাস করানো যায় না। সমাজ জীবনে এটি একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। এটা সমাজের একটি বিরাট অবক্ষয়। ব্যাপারটি সিরিয়াসলি ভেবে দেখার মত। সমাজের বিবেকবান মানুষের তাই সময় এসেছে সমাজকে নিয়ে ভাবার। সমাজের অবক্ষয় দূরীকরণের দায়িত্ব নেবার। নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ঘটায় জাতি আজ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ভবিষ্যত্ বংশধরদের আচরণ দেখে দিশেহারা হচ্ছেন। যে কোন ভাবে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। দিন দিন মানুষ যন্ত্রময় দানব হয়ে যাচ্ছে। মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা দিন দিন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বর্তমান সমাজে নানা রকম দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটায় নৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। কোনো প্রকার অন্যায়ই যেন আজ অন্যায় বলে বিবেচিত হয় না। সমাজে এ এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই জাতিকে সঠিকভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে তরুণ সমাজের কি যথেষ্ট নজর রাখতে হবে। ভাবতে হবে, প্রত্যেকটি সন্তানই তাদের মধ্যে স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসার চাহিদা থাকে। তাই সন্তান পরিচালনায় তার মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণ করা ও সন্তানকে সুখী করার বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। ধর্মীয় নিয়ম-কানুন, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, বিনয়, ভদ্রতা, নম্রতা, দয়া সহানুভূতি ইত্যাদি তাদের মধ্যে জাগ্রত করে তুলতে হবে। তাই জাগ্রত চেতনা, সূক্ষ্ম দৃষ্টি, দায়িত্বশীল মনোভাব আর মমতাময়ী হূদয় দ্বারাই একদিন এই বখে যাওয়া, ড্রাগ নেয়া, রাত-দুপুরে বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দেয়ার মত তরুণ সমাজের নানা রকম সব কাণ্ড-কারখানার এই ভয়াবহ অবক্ষয়ের নদী পাড়ি দিয়ে তীরে পৌঁছানো সম্ভব। হতাশ হলে চলবে না। তাই সকল মনোক্লান্তি ঝেড়ে মুছে দৃঢ় মনোবল নিয়ে সন্তানকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবেই বর্তমান সমাজ জীবনের রুচি-বিকৃতির এই কুয়াশা অপসারিত হয়ে শ্রীঘ্রই নতুন আশা ও আদর্শের সূর্যোদয় ঘটবে। লেখক :এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন