আই হ্যাভ আ ড্রিম :মানবমুক্তির শ্রেষ্ঠ গান

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৩
‘স্বপ্ন’ সকলেই দেখিয়া থাকেন। বলা হইয়া থাকে মানুষ তাহার স্বপ্নের সমান বড়। স্বপ্নে ফেরিওয়ালাও এ জগতে কম নাই, যাহাদের স্বপ্নের ফানুস একটুখানি আকাশে উড়িতে না উড়িতে গোত্তা খাইয়া ধরাশায়ী হয়। তাই স্বপ্ন বা ড্রিম থাকিলেই হয় না, তাহা বায়বীয় হইলে, দিকনির্দেশনায় ধোঁয়াশা থাকিলে সেই স্বপ্ন স্বপ্নের বিপুল ব্যাপ্তির সম্ভাবনাকে চালিত করে হিমঘরে। তাহার পরও এই বিশ্বে যুগে যুগে কিছু মহামানবের স্বপ্ন হইয়া ওঠে আবহমান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁকবদল। মাত্র ৩৪ বত্সর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এমন একটি স্বপ্নের কথাই বলিয়াছিলেন। সকল মানুষই জন্মসূত্রে স্বাধীন এবং সমান। একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়িতে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন নূতন বর্ণবিরোধমুক্ত দেশ। আজি হইতে প্রায় দেড়শত বত্সর পূর্বে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান হইতে বিলোপ সাধন করিয়াছিলেন অমানবিক দাসপ্রথার। সবাই সমান, সবাই এক—যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এই সমতা আর ভ্রাতৃত্ববোধের কথাই বলা হইয়াছে ঠিক, তাহার পরও একটি স্বপ্নের চারিপাশে দু:স্বপ্নের পরগাছা চাপিয়া বসে, তাহাকে বাড়িতে দেয় না। ১৯৫৫ সালেও আমরা তাই দেখিতে পাই, শ্বেতাঙ্গ জনমানসে রহিয়াছে বর্ণবিদ্বেষের বিষ, যাহা চোরাস্রোতের মতো বহিতে থাকে মার্কিন সমাজের অন্দরে-বাহিরে। কৃষ্ণাঙ্গদের জন্ম-কর্ম-চলাচলে বহাল থাকে বর্ণবিদ্বেষের রক্তচক্ষু। “আমার শরীরে মেলানিন কম রহিয়াছে (অর্থাত্ আমি শ্বেতাঙ্গ), আর তোমার শরীরে মেলালিন নামের রঞ্জক পদার্থ অত্যধিক রহিয়াছে (অর্থাত্ তুমি কৃষ্ণাঙ্গ) বলিয়া আমি তোমা হইতে অধিক উন্নত বটে। এই কথা কে বলিয়াছে? কেন, আমি বলিয়াছি। আমি সাম্রাজ্যবাদের বংশজাত, সুতরাং তাহা আমাকে রক্ষা তো করিতেই হইবে, নিজের জাত্যাভিমানের কেতন সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিতে হইবে, তাহাতে কোনো মানব ইতরতুল্য হইলেই কি-বা আসে যায়। আমি যাহা পারি তুমি তাহা পারো হয়তো, কিন্তু তাহা করিবার কোনো অধিকার নাই তোমার। তুমি কি করিয়া আমার সমান হইবে? তোমার এত সাহস? এত ধৃষ্টতা?”—শতকের পর শতক ধরিয়া শ্বেতাঙ্গদের এহেন মানসিক-বৈকল্যের শিকার হইয়াছে কোটি কোটি অশ্বেতাঙ্গ মানুষ। নিজের মানসিক মর্যাদা রক্ষায় ও মানবিক নিষ্পেষণের প্রতিবাদ জানাইতে আজি হইতে ৫০ বত্সর পূর্বে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র রচনা করিয়াছিলেন এক অহিংস আন্দোলনের রূপকথা। সেইদিন লিংকন মেমোরিয়ালে আড়াই লাখ মানুষের সামনে শোনাইয়াছিলেন এমন একটি স্বপ্নের কথা, যাহা ছিল শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মানবমুক্তির কবিতা—আই হ্যাভ আ ড্রিম। সর্বকালের সেরা স্বপ্নের উচ্চারণ : ‘...আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির ভিতরে বাস করিবে, যেইখানে তাহাদের চামড়ার রং দিয়া নহে, তাহাদের চরিত্রের গুণ দিয়া তাহারা গ্রহণযোগ্যতা পাইবে।...এই বিশ্বাস লইয়া হতাশার পর্বত হইতে আমরা সৃষ্টি করিব আশার প্রস্তর। এই বিশ্বাস লইয়া আমরা আজকের এই কোলাহল হইতে জন্ম দিব ভ্রাতৃবন্ধনের সুন্দরতম সংগীতের। এই বিশ্বাস লইয়া আমরা একসঙ্গে কাজ করিব, প্রার্থনা করিব একসঙ্গে, একদিন আমরা মুক্ত হইব এই জানিয়া—একসঙ্গে শামিল হইব সংগ্রামে।’ মার্টিন লুথার কিংয়ের স্বপ্ন আজ এই বিশ্বকে কোথায় লইয়া গিয়াছে এবং যাইতেছে, তাহা কি পঞ্চাশ বত্সর পূর্বে তিনি ভাবিতে পারিয়াছিলেন? নিশ্চয় তিনি ভাবিতে পারিয়াছিলেন। তাহার যে স্বপ্ন রহিয়াছে! সেই স্বপ্ন বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে ছড়াইয়া দেয় অহিংসার বার্তা, শোনায় ভবিষ্য অমরাবতীর কথা। সেই স্বপ্নের উচ্চতা যে মানব জাতির মুক্তির সমান বৃহত্! ‘দাস’ হিসাবে আফ্রিকা হইতে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হইয়াছিল প্রায় ৪০ লাখ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পিতা এবং মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ওইসকল দাস পরিবারেরই সন্তান। ভালোবাসা ও অহিংসাই কীরূপে সবচাইতে শক্তিশালী হাতিয়ার হইতে পারে, বিজয় ছিনাইয়া আনিতে পারে শতকের পর শতক জুড়িয়া জাঁকিয়া বসা নি:সীম বৈষম্যের বিরুদ্ধেও, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়াছিলেন মহাত্মা গান্ধী হইতে। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকায় তাহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইয়াছি নেলসন ম্যান্ডেলার কণ্ঠে। রক্ত ছাড়াও যে যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়, তাহাই তাহারা আমাদের শোনাইতেছেন যুগে যুগে। সবার ওপরে যে মানুষ সত্য, সেই অমোঘ সত্যই তাহারা দাঁড় করাইয়াছেন সভ্যতার সম্মুখে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন