দ্বাপর যুগে আবির্ভূত সনাতন ধর্মের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আজ ২৮ আগস্ট শুভ জন্মতিথি। সংস্কৃতে ‘কৃষ্ণ’ শব্দের অর্থ ‘কালো’। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে কৃষ্ণকে নীল মেঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পাশবিক শক্তি যখন সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল তখন সেই অসুন্দরকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। বিশৃঙ্খল ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের অমিত বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনই ছিল সে বাণীর মূল বিষয়। তাই তিনি ভক্তদের কাছে প্রেমাবতার।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদুবংশে মহাত্মা বসুদেবের পত্নী দেবকীর গর্ভে কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করেন। বসুদেবের পুত্র বলে তিনি বাসুদেব নামেও ভক্তদের কাছে পরিচিত। কৃষ্ণানুসারীদের মতে ও সংখ্যাতত্ত্ববিদদের ধারণায় খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার ২২৮ অব্দে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তার ভক্তদের কাছে ‘জন্মাষ্টমী’ নামে যুগ যুগ ধরে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।
দ্বাপর যুগে কতিপয় রাজা রাজধর্ম, কুলাচার, সদাচার ভুলে গিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্যায়-অবিচারে মত্ত হয়ে উঠেছিল। মথুরার রাজা কংস পিতা উগ্রসেনকে উত্খাত করে নিজে সিংহাসনে আরোহণ করেছিল। একই রকম ত্রাসের শাসন চালিয়েছিল জরাসন্ধ, চেদিরাজ, শিশুপালসহ অনেক রাজা। এই জরাসন্ধ এক শত রাজাকে বলিদানপূর্বক এক পাশবিক যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন এবং তদুদ্দেশ্যে ৮৬ জন রাজাকে ধৃত ও শৃঙ্খলিত করে রেখেছিলেন। এছাড়া হস্তিনাপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল দুর্যোধন-দুঃশাসন। মহাভারতের কাহিনীতে বর্ণিত দুঃশাসন কর্তৃক সভাসমক্ষে কূলবধূ দ্রৌপদীর অবমাননা এক লজ্জাকর অধ্যায়। জনসমক্ষে নারীর এমন অবমাননার প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না তখন সত্-ধার্মিক ব্যক্তিদের। এভাবেই তখন পাপের রাজ্যে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদত। এই অরাজকতার দিনের অবসান ঘটাতে অবতীর্ণ হন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার জন্ম নিয়ে বলেছেন, আমার জন্ম সাধারণ মানুষদের মত নয় এবং আমার মৃত্যুও সাধারণ মানুষের মতো নয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায় কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়া—দুটিই আমার অলৌকিক লীলা। গীতাতে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আরো বলেছেন, ‘আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা শ্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।
শ্রীকৃষ্ণ অবতারের দুটিই উদ্দেশ্য আছে। এক, অন্তর্জগতে মানবাত্মার উন্নতি সাধন দুই, বাহ্য জগতে মানব-সমাজের রাষ্ট্রীয় বা নৈতিক পরিবর্তন সাধন। লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে আবির্ভূত হয়ে আমাদের জন্য যে দিব্য জীবনের আদর্শ রচনা করে গেছেন, তার মূল রহস্য আত্মস্থ করে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়পরায়ণতায় ও অমৃতলোকের অন্বেষায় শুরু হোক আমাদের অভিযাত্রা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত শ্রীমদ্ভগবদ গীতাকে পাথেয় করে ফলের আশা, কর্তৃত্বাভিমান তথা সমস্ত মানবীয় সংকীর্ণতাকে পরিহার করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও মানব কল্যাণব্রতে আমাদের অঙ্গীকার হোক ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’। ভক্তরা তাকে যে নামে ডাকেন সে নামে তিনি সাড়াদেন। যেভাবে তাকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন। সনাতনী সমাজে তার অবস্থান অনেকটা পরিবারের একজনের মতো। তাই তো তিনি দেবকী ও বসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাগারে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হন পুত্ররূপে, কৃষ্ণ নামে ধরাকে কলুষমুক্ত করতে। শুভ জন্মষ্টমী।
লেখক :সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ
