বান কি মুনের ফোনালাপ ও সংলাপের রাজনীতি

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৬
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, নির্বাচনসর্বস্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পাঁচ বছর পরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় জীবনে উত্সবের আমেজ নিয়ে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ঠিক উত্সবের দিনটিতে পৌঁছানোর যে পথ তা মোটেও মসৃণ নয়। বিগত কয়েক দশকের ইতিহাস বলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে এই পথ এতটাই বন্ধুর যে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রাণপ্রদীপ পর্যন্ত নিভে যায়। সংবিধান অনুযায়ী চলতি বছরের শেষদিকে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবার তিন মাস আগে অর্থাত্ ২৫ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। শুরু থেকে এ ইস্যু নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার জোট জোর আপত্তি জানিয়ে আসছে। তারা কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে স্বচ্ছতার বিষয়ে নিরাপদ বোধ করছে না। ফলে বিগত কয়েকটি বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করে আসছে ১৮ দলীয় জোট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে প্রধান দুই জোটের অনড় অবস্থানের কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন সম্পর্কে বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সবকিছু চলবে। সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না তিনি। পরদিন ১৯ আগস্ট বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত সমাবেশে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনের বাতাসে চুল তো থাকবেই না, বরং অস্তিত্বও যাবে। পরিস্থিতি যখন এমন ঠিক তখন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। বিষয়বস্তু ছিল- আগামী নির্বাচন, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। মোদ্দাকথা ছিল, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে উভয় দলকেই সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান। ফোনালাপকালে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই নির্বাচন পরিচালনা ও ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। অনির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া বা তাদের মাধ্যমে নির্বাচন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মহাজোট সরকারের সময় সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক রায়ে দুটি অংশ ছিল। দ্বিতীয় অংশে দেশ ও জাতির স্বার্থ বিবেচনায় আগামী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তার জোট আদালতের রায়ের দ্বিতীয় অংশটি বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন। দেশের সর্বোচ্চ দৈনিক ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষের কাছ থেকে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবি উঠে আসে। এটা শান্তিকামী মানুষের চাওয়া- পাওয়া। সরকার যদি ৫ বছরে জনগণের চাহিদাগুলোর বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন ইস্যুতে সাধারণ জনগণের সরকারের উপর আস্থা রাখতে আপত্তি থাকার কথা নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা পুনরায় পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধানে পরিবর্তন এনেছেন। বলেছেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনতার নিকট দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যাওয়া দেশের রাজনীতিকদের নিত্যনৈমিত্তিক আচরণে পরিণত হয়েছে। ৯৫ ভাগ মানুষের মতামতকে তোয়াক্কা না করা সরকারের জনদায়বদ্ধহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ফোনালাপকালে বিরোধীদলীয় নেত্রী জানিয়েছেন, সংকট নিরসনে যে কোনো ধরনের সংলাপে প্রস্তুত তারা। পাশাপাশি এটাও জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের অধীনে কোন নির্বাচনে তারা যাবেন না। দেশের জনগণ আসলে সংঘাতপূর্ণ কোন পরিবেশে নির্বাচন চায় না। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও মূলত এই প্রত্যাশার কথাই জানিয়েছেন। আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমাদের দেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে তা সমাধানের পথ হচ্ছে আলাপ-আলোচনা। শুধু তাই নয়, এই আলাপ-আলোচনা হতে হবে ফলপ্রসূ। কিন্তু সত্যি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। কেননা, উভয় দলেরই মনোবাসনা যেন এমন যে, বিচার যাই হোক তাল গাছটা আমার চাই। একটু মির্জা গালিবের আমল থেকে ঘুরে আসা যাক। মুঘল শেষ বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের সভাকবি ছিলেন মির্জা গালিব। ১৮৫৭ সালে ইংরেজদের হাতে লালকেল্লার (রেড ফোর্ট) পতন ঘটলে বাদশাহকে ধরে নিয়ে যায় ইংরেজ সৈন্যরা। বাদশাহর সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে ইংরেজ সৈন্যরা মির্জা গালিবকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে জেরার ফাঁকে জিজ্ঞেস করা হল যে, সে মুসলমান কিনা। এই জীবন-মরণ সময়ে যেখানে গালিবের ফাঁসিও হয়ে যেতে পারে সেখানে রসিকতা করে গালিব উত্তর দেন— “মুসলমান কিন্তু আধা” এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “শরাব পীতা হু, লেকিন শূকর নেহি খাঁ তা” অর্থাত্ “মদ পান করি কিন্তু শূকর খাই না”। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অনেকটা এরকমই । আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচনকে মানি; কিন্তু এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যে পরমতসহিষ্ণুতা, অপরের মতকে গুরুত্ব দেবার গুণাবলী থাকা দরকার তার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপও করি না। বর্তমান সময়ে কোন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আসলে আর অভ্যন্তরীণ থাকে না। নানা কারণে এর আন্তর্জাতিক সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। দেশের মঙ্গলের জন্যই রাজনৈতিক সব সমস্যার সমাধান দেশেই করা উচিত। প্রবাদে আছে- “নিজের ভালো পাগলেও বোঝে”। কিন্তু আমরা মনে হয় পাগলেরও অধম। কেননা, আমরা দেখে আসছি যে, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমস্যাকে সমাধানের পথে না নিয়ে গিয়ে এতটাই প্রকট করে ফেলেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ না করে উপায় থাকে না। আমাদের মাঝে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়- অসুখের সমাধানে ডাক্তারের পরামর্শে প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ ওষুধ খেয়ে যখন একটু সুস্থ বোধ করি তখন ঐ ওষুধের কথা আর মনে থাকে না। আমাদের স্বভাবটা আসলে এরকমই। এজন্য প্রতি নির্বাচনের সময়ই ডাক্তারের মত নানা পরামর্শ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো হাজির হয়। গত বছরের নভেম্বর ও এ বছরের মে মাসে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি হিসেবে দুই দফায় ঢাকা সফর করেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। এরপর সফর করেছেন ওবামা সরকারের দুই প্রতিনিধি রবার্ট ব্লেক ও স্টিফেন সারমেন। সঙ্কট নিরসনে তারা দফায় দফায় সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। এবার চীনের রাষ্ট্রদূতও পরামর্শ দিয়েছেন সংলাপে বসার। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য গত ‘সেনা সমর্থিত’ ও দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন রাজনীতিকরা শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। সংলাপ-সমঝোতা না হলে চরম মূল্য দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশ। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দুই নেত্রীর অনড় অবস্থানের মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের ফোনালাপ আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশের মানুষের কথা চিন্তা করেই দুই নেত্রীকে সংলাপে বসে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুঁজে বের করা উচিত। বিএনপি তাদের আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি থেকে সরে এসে ছাড়ের মানসিকতা দেখিয়েছে। বিএনপির মূল আপত্তি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসাবে শেখ হাসিনার থাকা নিয়ে। ক্ষমতাসীন দল হিসাবে আওয়ামী লীগের উচিত কিছুটা ছাড়ের মাধ্যমে হলেও সংলাপের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। এখন দেখার বিষয় দুই নেত্রী কী করেন ? তবে মনে রাখা দরকার শুভস্য শীঘ্রম। লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন