চিকিত্সা ও নৈতিকতা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:২০
অনেক দুঃসংবাদের মধ্যে একটি আশাপ্রদায়ক সুসংবাদ এই যে, অবশেষে এই দেশের চিকিত্সকগণ বুঝিতে বা উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন যে, তাহারা ক্রমান্বয়ে নৈতিকতার দিক দিয়া পিছাইয়া পড়িতেছেন। অর্থাত্, চিকিত্সার মূল যে নীতি, সেই নীতি হইতে বহু বহু দূরে তাহারা অবস্থান গ্রহণ করায় দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থায় আজিকার এই যারপরনাই বদহাল সৃষ্টি হইয়াছে। শনিবার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত চিকিত্সকদের এক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা যথার্থই এই ক্ষেত্রে বিরাজমান মূল সমস্যাটিকে চিহ্নিত করিয়াছেন। তাহাদের এই আত্মোপলব্ধি প্রশংসার দাবি রাখে বৈকি! ইহা শুধু আত্মোপলব্ধিই নহে, ইহা তাহাদের সত্যোপলব্ধিও বটে! এই আত্মোপলব্ধি এবং সত্যোপলব্ধির সহজ সরল প্রকাশ বা স্বীকারোক্তি সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকদেরকে গৌরবান্বিত করিবে নিশ্চয়ই। কেননা, আমরা তো আজকাল আত্মসমালোচনা করিতে ভুলিয়াই গিয়াছি, উপরন্তু সত্যের নিরিখে কেহ আমাদের যথার্থ সমালোচনা করিলেও উহাতে আমরা অসহিষ্ণু এবং বিদ্বেষপরায়ণ হইতেই শিখিয়াছি। ফলে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অধিক দক্ষতা অর্জনের যে অলিখিত নিয়ম-নীতি একদিন সমাজে চালু ছিল তাহা আজ কর্পূরের মত উবিয়া গিয়াছে। অর্থ-বিত্ত অর্জনের নেশাই হইয়া উঠিয়াছে মুখ্য। আর এই কারণেই এই দেশে যোগ্য চিকিত্সক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, প্রশাসক থাকিলেও তাহাদের সেই যোগ্যতা মানুষকে সেবাদানের পরিবর্তে নিছক বিত্ত-বৈভব গড়িয়া তোলার কাজেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়োজিত হয়। আর উহার পরিণামে দুর্ভোগ পোহায় মানুষ। চিকিত্সা কখনো কোন ব্যবসায় হইতে পারে না। চিকিত্সার মৌলিক নীতি ও উদ্দেশ্যই হইতেছে সেবাপরায়ণতা। শিক্ষাদান যেমন শিক্ষকের নিকট একটি মহান ব্রত হওয়া উচিত তেমনি চিকিত্সা সেবা প্রদানই চিকিত্সকের প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, আজিকার এই অবস্থায় আর সকল পেশার ন্যায় চিকিত্সা ক্ষেত্রেও চিকিত্সকদের ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি প্রকট হইয়া উঠিতেছে। চিকিত্সকদের ঐ নৈতিকতা বিষয়ক গোলটেবিলে যে সত্যটি উঠিয়া আসিয়াছে উহা এই যে, চিকিত্সকেরা নৈতিকতার দিক হইতে পিছাইয়া পড়িতেছেন। অথচ এইখানে চিকিত্সা বিজ্ঞান অনেক দূর অগ্রসর হইলেও চিকিত্সকেরা তাহাদের নৈতিক অবস্থানে দৃঢ়ভাবে থাকিতে পারিতেছেন না। তাহারা যদি নৈতিক অবস্থানটিকে দৃঢ়তর করিতে পারিতেন, তাহা হইলে চিকিত্সা ব্যয় কমপক্ষে ৩০% কম হইতো। কি সাংঘাতিক কথা! এই দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর পকেট কাটিয়া এইরূপ অনৈতিক উপায়ে অর্থোপার্জন নিশ্চয়ই চিকিত্সকদের মানায় না। তথাপি একশ্রেণির অসাধু ও লোভী ক্লিনিক ব্যবসায়ী, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক, ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও চিকিত্সকেরা মিলিয়া এমনই এক দুষ্টচক্র গড়িয়া তুলিয়াছে যাহা ভাবিলেও গা শিহরিয়া ওঠে। উন্নত বিশ্বেতো এই ধরনের অসাধুতা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু উপমহাদেশে বা অনুন্নত বিশ্বে এই জাতীয় নৈতিকতা বিবর্জিত কাণ্ড-কারখানা যেন একেবারেই ভাত-মাছ। ফলে চিকিত্সকেরা তাহাদের সেবা ধর্ম-পরিহার করিয়া আত্মসম্মানবোধ ও মর্যাদা জলাঞ্জলি দিতেছেন। পেশা চর্চায় চিকিত্সকের নিকট রোগীর স্বার্থই সর্বাপেক্ষা বিবেচনা লাভের দাবি রাখে, কিন্তু এইখানে এই মুখ্য বিষয়টিই সর্বাপেক্ষা উপেক্ষিত হইয়া থাকে। রোগীর নিকট অসত্য পরিচয় উপস্থাপন, প্রয়োজনের অধিক ঔষধ প্রয়োগ, ভুল ঔষধ প্রয়োগ, রোগনির্ণয় কেন্দ্র হইতে কমিশন গ্রহণ ইত্যাদি নানাবিধ অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকিয়া চিকিত্সকেরা প্রকারান্তরে তাহাদের পেশার ও নিজেদের প্রতি যে অমর্যাদা করিতেছেন ইহা সর্ববিচারেই পরিত্যাজ্য। অর্থ-বিত্তকে মুখ্য না করিয়া তুলিয়া সেবাকে মুখ্য এবং একমাত্র বিবেচ্য বিষয় করিয়া তুলিতে পারিলে অর্থ যে চিকিত্সকেরই পশ্চাদ্ধাবন করিবে ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই! অবিশ্যি, কবে চিকিত্সকের মনে এই বোধ জাগ্রত হইবে কে জানে! তবে এই গোলটেবিল বৈঠকে এই বোধ জাগ্রত হইবার খানিক আভাষ পাওয়া গিয়াছে উহাই বা কম কিসে!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন