কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে জানতে পারলাম যে, আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব রয়েছে তা কিভাবে নিরসন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করবেন। উদ্যোগটি অত্যন্ত মহত্ এবং প্রশংসনীয়। আমিও ব্যক্তিগতভাবে এই রকম একটি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধি করছি কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব হতে পারে তা নিয়ে কোন চিন্তা করতে পারছি না। শুরুতেই এটাও বলে রাখা দরকার যে, আমাদের সেনাবাহিনী বহু বছর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে কিভাবে একটা সংঘাত-সংঘর্ষে জর্জরিত জনপদে শান্তির কাঠামো বিনির্মাণ করা যেতে পারে সে সম্পর্কে যথেষ্ট বাস্তবিক জ্ঞান ও অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে যা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে উপকারে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা সংঘর্ষ ব্যবস্থাপনা ও সংঘর্ষ নিরসনের উপর অনেক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে নিজেদেরকে এ বিষয়ে অনেক সুদক্ষ করে গড়ে তুলেছেন। তাই মিজানুর রহমানের উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক সম্ভাবনার ও আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন সেনাবাহিনীর সাথে এই আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ? পাহাড়ী জনগণের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের এবং এই অঞ্চলের স্থানীয় লোকদের বক্তব্য থেকে এটা বোঝা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত সমস্যার মূলে যেসব বিষয় আছে তাদের মধ্যে সামরিকীকরণ একটি অন্যতম বিষয়। জিয়া সরকার সামরিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গি পাহাড়ি জনগণ ও সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি করে দাঁড় করিয়েছিল। ১৯৮০ এবং ’৯০ দশকে যেভাবে মানুষজন নির্যাতিত হয়েছিলেন সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাদের মাঝে এখনো সেনাবাহিনীর প্রতি ভয় ও অবিশ্বাস সঞ্চার করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা এবং পাহাড়ি জনগণেরও দেশের প্রতি টান থাকার কারণে ১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল তার মাধ্যমে পার্বত্য জনগণের সেনাবাহিনীর প্রতি যে ভীতি ও অবিশ্বাস ছিল তা কিছুটা লাঘব হয়েছে। কিন্তু চুক্তির পরেও বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত সামপ্রদায়িক হামলাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পক্ষপাতমূলক আচরণ (বিভিন্ন সময় আদিবাসী সংগঠনসমূহ অভিযোগ করে আসছে) এবং পাহাড়ি জনগণকে এসব হামলা থেকে রক্ষা করতে না পারার কারণে পাহাড়ি জনগণ এখনো সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করতে পারে না। সমপ্রতি মাটিরাঙ্গার তাইন্দঙ হামলার যারা শিকার হয়েছেন, সেসব অনেক পাহাড়ি মানুষ মিডিয়াকে বলেছে,“আমরা এই বিজিবিদের বিশ্বাস করি না। তারা হামলার আগে আমাদের গ্রামে এসে আশ্বাস দিয়ে গেছে যে, কোন কিছু হবে না”। এই যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের খেলা, জনগণের জীবনের সাথে প্রতারণা— এ সবকিছুর কারণে আজ এই আস্থার সংকট ও অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করছে। এই অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা যেমন একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তেমনি এত বছরে জন্ম নেয়া মানসিক দূরত্বও একদিনে, একমাসে কিংবা একবছরে কমে আসবে তা প্রত্যাশা করাও অনেকটা ভুল হবে। সেজন্য ধৈর্য ধরে আমাদের সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। আসুন আমরা সবাই অতীতকে ভুলে গিয়ে একটা সুন্দর ভবিষ্যত্ রচনা করি। একজন আরেকজনের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। একজন আরেকজনকে শ্ত্রু না ভেবে বুকে টেনে নিই। একজন আরেকজনের সুখ-দুঃখের সাথী হই। ১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন হয়েছিল তার বাস্তবায়নে সবাই কাজ করি। এই অঞ্চলের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। সহিংসতা, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ‘না’ বলি। এসবের জন্য কেবলমাত্র একটি জিনিস দরকার তা হল মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। আমরা যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে পারি তাহলে এই অঞ্চলে আর আগামীতে রক্ত ঝরবে না, কোন শিশু এতিম হবে না, কোন বোন বিধবা হবে না, কোন মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে হারাবে না, কোন গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যাবে না। আমার মত অনেকের এই চাওয়া-পাওয়ার জন্য তেমন কিছু করার দরকার নেই। আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হলে জনগণের এই আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আমি মনে করি।
আরো বলতে চাই, সংলাপের কোন বিকল্প নেই। মারামারি, হানাহানি কোন সভ্য সমাজের সমাজ পরিচালনার নীতি হতে পারে না। আমরা যারা শান্তি ও সংঘর্ষ নিয়ে অধ্যয়ন করি আমাদের মূল বক্তব্য হল, সহিংসতা সহিংসতার জন্ম দেয়। তাই আসুন আমরা সবাই আমাদের জীবনের প্রত্যেকদিনকে শান্তিপূর্ণ করি। এটার জন্য প্রয়োজন সংঘর্ষে জড়িত গোষ্ঠী বা দলসমূহ নিজেদের উদ্যোগে গঠনমূলক আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান করা। তাদেরকে শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনে পিসিজেএসএস ও এখানকার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে সেনাবাহিনী ও সরকারের একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে কি কি সিদ্ধান্ত হল তা (জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপন বিষয় ব্যতীত) জনগণকে জানানো যেতে পারে যাতে জনগণ অন্ধকারে না থাকে।
এছাড়াও আমি আরেকটি বিষয় অবতারণা করি। বিভিন্ন গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরে প্রাথমিক কিছু বিষয় হাতে নিতে হয়। গেরিলাদের নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্বাসন করতে হয়। উদ্বাস্তু মানুষের সমস্যার সমাধান করতে হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করতে হয়। রাষ্ট্রের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হয়। দ্বন্দ্বের মূল সমস্যাকে অতি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হয়। প্রশ্ন হল, আমরা আমাদের পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পরে এসব বিষয়সমূহ কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি?
পরিশেষে বলব, মিজানুর রহমান স্যারের মত পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে সংলাপে বসা আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেনাবাহিনীর আন্তরিকতা ও সততা বাদে এই অঞ্চলে কখনো শান্তি বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, সেনাবাহিনী বিভিন্নভাবে শান্তি প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারে যেসবের মধ্যে আমি কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করলাম। প্রথমত, সেনাবাহিনীকে সবসময় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে একপেশে ইতিহাস ও প্রবন্ধ লিখেন তা পাহাড়িদের সাথে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি করে যা বন্ধ হওয়া খুবই জরুরি। কারণ, একটি দায়িত্বশীল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা দেশের স্বার্থে এসব বিভেদমূলক ও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করে এমন বক্তব্য দিতে পারেন না। তৃতীয়ত, সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য যেভাবে পাহাড়ি জনগণের সাথে ঔদ্ধত্য আচরণ করে তাও বন্ধ করতে হবে। আমি দেখেছি ২০০৭/০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময় পানছড়ি জোনে নিয়োজিত একজন সেনা কর্মকর্তা যেভাবে পাহাড়িদেরকে অপদস্থ করেছেন তা কখনো ভুলবার নয়। তিনি অনেক বয়স্ক মুরুব্বীদেরকে অকথ্য ভাষায় দুর্ব্যবহার করেছিলেন যা কোনমতে কাম্য নয়। চতুর্থত, সেনাবাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকারের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল হতে হবে। অনেকের মত ব্যক্তিগতভাবে আমিও মনে করি আমাদের বর্তমান সেনাবাহিনী অনেক সুশৃঙ্খল, সুশিক্ষিত এবং সুদক্ষ একটা সেনাবাহিনী যার আন্তর্জাতিকভাবে আলাদা একটা সুনাম ও বিশেষ পরিচিতি আছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই সুপরিচিতি এবং খ্যাতি যাতে কোনমতে বিনষ্ট না হয় তার জন্য সেনাবাহিনীকে আরো অনেক সংযত ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। রাষ্ট্রের একটা দায়িত্বশীল বিভাগ হিসেবে এই বাহিনীকে যাতে কোন গোষ্ঠী তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য সতর্ক হতে হবে। তাদেরকে রাষ্ট্র যে পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছে তা নিরপেক্ষতার সাথে পালন করতে হবে। প্রত্যাশা করি, আমাদের পাহাড়ি জনগণের সাথে সেনাবাহিনীর যে ভুল বুঝাবুঝি ও অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব রয়েছে তার সন্মানজনক সমাধান হবে এবং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পার্বত্য চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। এতটুকু আশা করতে পারি এই কারণে, যেহেতু আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক, কেউ কারোর প্রতিপক্ষ নই। তাই দ্বন্দ্ব-সংঘাত ভুলে গিয়ে আমরা সবাই মিলেমিশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে দেশ গড়ার কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োজিত করি।
লেখক: প্রভাষক, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
anurug.pacs^du¦yahoo.com
