ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি অর্থনীতি

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:২৩
জমির ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনা একটি অনুচ্চারিত অধ্যায়ের নাম। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যত উপকরণই সংযুক্ত হোক না কেন, একথা আজও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এ দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। হাজার বছর ধরে কৃষির উপর নির্ভর করেই চলছে এ দেশ, এ দেশের মানুষের জীবন জীবিকা। কৃষির উন্নয়ন ব্যতীত এ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে অসম্ভব তা অনেকেই স্বীকার করবেন। একটা কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে তার জমি ও জমির যথার্থ ব্যবহার। দ্বিধাহীন চিত্তে এটা বলা যায়, এতো সমতল আর উর্বর ভূমি পৃথিবীতে সহজলভ্য নয়। এ ছিলো প্রকৃতির এক বিশাল অবদান। জমি শব্দটা উচ্চারণমাত্রই কৃষকের কথা এসে যায়। জমি আর কৃষক পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে জমি ও কৃষকের উন্নয়ন ব্যতীত অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনয়ন দুঃসাধ্য বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ কথা সত্য, জমি বা কৃষকের উন্নয়ন এ দেশে হয়নি কখনো। বৃটিশ শাসনামলে কোম্পানি তাদের শাসন ব্যবস্থা নিরাপদ রাখা এবং নিজস্ব মুনাফা লাভের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনায় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলো। বর্তমান সময় পর্যন্ত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন এরই ধারাবাহিকতায় চলছে। জমি বা কৃষকের উন্নয়নে তথা ভূমি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা মাফিক কোন ব্যবস্থা এই স্বাধীন দেশের ৪২ বছর সময়েও আমরা শুরু করতে পারিনি। শুরু তো বহুদূর এমন পরিকল্পনাও আমাদের নেই। হাজার বছর আগে আর্যরা এ দেশে এসে কৃষি ব্যবস্থায় লাঙ্গলের যে ব্যবহার শুরু করেছিলো, আজ হাজার বছর পরও আমরা এরচেয়ে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারিনি। কৃষি ব্যবস্থা যে আমাদের অর্থনীতির প্রাণ, এ বিষয়টি আজ আমরা ভুলতে বসেছি। তাই প্রকৃত অর্থে আমাদের অর্থনৈতিক অর্জন আজো কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা স্থবির। প্রাণহীন। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক আমাদের অর্থনীতিতো স্থবির বা প্রাণহীন নয়। জনশক্তি ও পোশাক রপ্তানি করে আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিন দিন বাড়িয়ে চলেছি। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। কথা অবশ্য মিথ্যে নয়। কিন্তু ধরুন-ক এর বাত্সরিক আয় ৬০ টাকা, খ এর ৩০ টাকা, গ এর ৭ টাকা এবং ঘ এর ৩ টাকা। তাহলে ১০০ ` ৪ = প্রত্যেকের বাত্সরিক গড় আয় ২৫ টাকা। কথাটি কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়? এই হচ্ছে আমাদের গড় আয়। এ দেশে গ এবং ঘ এর সংখ্যাই অধিক। শতকরা ৯০ ভাগ লোক এই গ এবং ঘ। এরাই হচ্ছে শ্রমিক, যারা ফসল ফলায়, রিক্সা চালায়, মজুর খাটে, গার্মেন্টস-এ কাজ করে, ছোট মাঝারি ব্যবসা করে, সরকারি-বেসরকারি চাকরি করে, দোকান দেয়, সাংবাদিক হয়, বেকার হয়। যাদের সংসার চলে সীমাবদ্ধতায়। অপরদিকে ‘ক’ আর ‘খ’ এর কথা নাই বা বললাম, সকল সম্পদ ও ক্ষমতা তাদের। যাই হোক এ আরেক ভিন্ন প্রসঙ্গ। বলছিলাম কৃষি ব্যবস্থার কথা, জমি ও কৃষকের কথা। কৃষি ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটলে কৃষিই হতে পারতো এ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। তাতে অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা সামগ্রিকভাবে গতিশীল হতে পারতো। যে কৃষি ব্যবস্থা হতে পারতো এ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি, সনাতন ব্যবস্থা ও পদ্ধতির কারণে, পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে এই কৃষি ব্যবস্থা হয়ে আছে অবহেলিত। এখন বিজ্ঞানের যুগ। তথ্য প্রযুক্তির উত্কর্ষের যুগ। এই যুগে, এই সময়ে, আমাদের মৌলিক সম্পদ, এই জমি, এই কৃষির কোন পরিবর্তন হয়নি, কেন ঘটেনি কোন উন্নয়ন, তা উপলদ্ধি করতে হলে ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হয়। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরালেই দেখা যায়, বিদেশি শাসকরা এ দেশ শাসন করেছে সুদূর অতীতকাল থেকে। শাসকরা শুধু রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজনে এ দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় মাঝে মাঝে মনোযোগী হয়েছে। মোঘল শাসনামলেও এ দেশে ভূমির জরিপ হয়েছে। জরিপ হয়েছে সম্রাট আকবর ও আওরঙ্গজেবের সময়। জরিপের কারণ ছিলো, জমির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। তখনও এ দেশের জনগণ জমিদার ভূস্বামী এবং রায়ত প্রজা হিসেবে কৃষি ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত ছিলো। এ সময় জমিদার, ভূস্বামীকে উত্পাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব প্রদান করতে হতো। কৃষি ব্যবস্থায়, মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল তখনো সৃষ্টি হয়নি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথায় বা তার আগে জমি হস্তান্তর ছিলো অবৈধ। ফলে ভূমিহীন কোন কৃষক ছিলো না। কিন্তু প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নের ফলে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরে আইনগত কোন বাধা ছিলো না। কৃষকরা জমির মালিক হলেন এবং হস্তান্তর প্রক্রিয়া বাধাহীন হওয়ায়, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে জমি হস্তান্তর হতে থাকলো। কেউ পুঁজি সংগ্রহ করে অন্যকিছু করার জন্য জমি বিক্রয় করলো। প্রান্তিক কৃষক অভাবগ্রস্ত হয়ে জমি বিক্রি করতে থাকলো। তাতে দিন দিন ভূমিহীনের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়া শুরু করলো। সেই ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ভূমিহীনরা বর্গাচাষী বা দিনমজুরে পরিণত হলো। আর মধ্যস্বত্বভোগীরাও জমির উদ্ধৃত আয় জমিতে ব্যয় করেননি। ব্যয় করলেন শহরে জমি, বাসা ক্রয়ে। এ রকম ঐতিহাসিকভাবে ক্রম ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত কোন সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য, অর্থনৈতিক উত্থানের জন্য কৃষি ব্যবস্থায় মনোযোগী হননি। বর্তমান সময়েও কৃষি ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত উন্নয়নের জন্য যে পরিকল্পনা, সময় এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন, সব সরকারই এ বিষয়ে থেকেছে উদাসীন। কারণ এ দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি কেউ নিতে চায় না। হিসাবটা পাঁচ বছরের। আর সে হিসাবও উন্নয়নের নয়, সে হিসাব ক্ষমতায় থাকার, সে হিসাব ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থের, সে হিসাব পুনর্বার ক্ষমতায় যাওয়ার, সে হিসাব শ্রেণিস্বার্থের। ভোটের কিংবা অন্যবিধ হিসাব-নিকাশ। এখানে জমি আর কৃষককে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মোট কথা, কৃষিপ্রধান দেশের কৃষিতে কোনদিনও ঘটলো না কোন বিপ্লব। হলো না আধুনিকীকরণ। পোশাক শিল্প রপ্তানির মাধ্যমে আমরা আজকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করে তারচেয়েও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিলো সম্ভব। কারণ দেশটাইতো কৃষিপ্রধান। কৃষিই তো এদেশের অর্থনীতির প্রাণ। উন্নয়নতো ঘটেইনি বরং কৃষি খাত দিন দিন অবহেলিত হতে হতে এমন এক পর্যায়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে কৃষির সাথে সম্পর্ক আছে এমন পরিচয় দিতেও মানুষ কুণ্ঠাবোধ করে, ভোগে এক ধরনের হীনমন্যতায়। জমির মালিক আজ আর জমিতে নেই, থাকেন শহরে। গ্রামের প্রান্তিক চাষি বর্গাচাষ করে ভূমি। ভূমি মালিকগণ বর্গাচাষিদের মাধ্যমে ভূমি থেকে মুনাফা গ্রহণ করেন, থাকেন শহরে। জমির প্রকৃত মালিক এখন আর জমিই চেনে না। চেনে বর্গাচাষি। এভাবেই কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে আসা হয়েছে। অথচ এই দেশে ভূমি ব্যবস্থার একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং কৃষি অর্থনীতিতে বাজেটের সিংহভাগ অর্থ যোগানের মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও স্বার্থে বিধি ব্যবস্থার প্রণয়ন না হলে, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন কখনোই ঘটবে না। আর যতদিন না পর্যন্ত আমাদের মূল অর্থনীতিতে কৃষি ব্যবস্থা বা কৃষিপণ্য সর্বোচ্চ অবদান না রাখতে পারবে এ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, দিন বদলের বাস্তবতার জন্য, অর্থনৈতিক সাম্য ও সমৃদ্ধির জন্য, তৃণমূল পর্যায়ে সচ্ছলতা আনয়নের জন্য, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে সামগ্রিকভাবে আর্থিক অগ্রগতির জন্য এবং দেশের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য ততদিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। লেখক :গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন