মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সকল বয়সী মানুষকেই আকর্ষণ করে। তবে কিশোর-তরুণদের নিকট এই আকর্ষণ এককথায় দুর্নিবার। জলপ্রপাতটির অবস্থান মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায়। দেশের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে যাওয়া-আসা এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ততোটা মানসম্মত না হইলেও সকল বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া দেশের নানা প্রান্ত হইতে প্রতি বত্সরই শত শত শিক্ষার্থী ছুটিয়া যান মাধবকুণ্ডে। কিন্তু সকলেই ফিরিয়া আসিতে পারেন না। অচিরেই তারুণ্যের নির্মল প্রাণোচ্ছ্বাস পরিণত হয় শোকের অন্তহীন বিষাদে। সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাইয়াছে উত্তরা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসির ছাত্র জসিম শেখ। এই তালিকা দীর্ঘ। কারণ প্রায়শ অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে এক বা একাধিক শিক্ষার্থীর প্রাণ। আরও বেদনাদায়ক বিষয় হইল, তাহাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনার ধরনও অভিন্ন। সাঁতার কাটিতে গিয়া ডুবো পাথরের খাঁজে আটকাইয়া কিংবা সুউচ্চ জলপ্রপাতের উপর হইতে পা পিছলাইয়া পড়িয়া এইসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটিতেছে। খালি হইতেছে মায়ের কোল। অথচ সামান্য কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইলেই মাধবকুণ্ড মৃত্যুফাঁদে পরিণত হইত না। অকালমৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইত সম্ভাবনাময় অনেক জীবন। স্থানীয় প্রশাসনও তাহা জানেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হইয়াছে। অই পর্যন্তই। বাস্তবতা হইল, উপর্যুপরি দুর্ঘটনা সত্ত্বেও গত তিন দশকেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই।
প্রশ্ন হইল, মাধবকুণ্ডের মতো প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থা যদি এই হয়, তাহা হইলে অন্য সকল ক্ষেত্রের অবস্থা কী? ইহার উত্তর সুবিদিত। সামগ্রিকভাবে দেশের অবস্থাও ভিন্ন নহে। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নাই। নাই নিরাপত্তা। সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথ— সর্বত্রই ওত পাতিয়া আছে ভয়ঙ্কর সব মৃত্যুফাঁদ। সর্বত্রই চরম বিশৃঙ্খলা। মহানগরগুলির বেশিরভাগ ফুটপাত বেদখল হইয়া আছে। তদুপরি আছে ঢাকনাবিহীন অসংখ্য ম্যানহোল। কোথাও বা রাস্তার মাঝখানেই মুখ ব্যাদান করিয়া আছে বিশালাকৃতির গর্ত। ব্যস্ত সড়ক-মহাসড়কে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হইয়াছে অনেক গতিরোধক। আছে বৈধ-অবৈধ অজস্র লেভেল ক্রসিং। রেললাইন-সংলগ্ন স্থান দখল করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে বস্তি। সেইখানে নিয়মিত হাটবাজার বসিতেছে। রেললাইনের উপর চলিতেছে শিশুকিশোরদের ছুটোছুটি। সড়ক-মহাসড়কগুলির চিত্রও ভিন্ন নহে। কোথাও কোথাও ফুটওভারব্রিজ থাকিলেও ব্যস্ত রাস্তার উপর দিয়াই অবাধে চলিতেছে পথচারী পারাপার। কিন্তু দেখিবার কেহ নাই। নাই সতর্কতামূলক কোনো চিহ্ন। ফলে নিয়মিত মারাত্মক সব দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। দীর্ঘ হইতেছে অনভিপ্রেত মৃত্যুর মিছিল।
বিশ্বের সর্বত্রই জননিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাইয়া থাকে। ইহার জন্য জরুরি বার্তা ও সংকেত-সংবলিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থার যেমন কোনো বিকল্প নাই, তেমনি জনসচেতনতার বিষয়টিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দেশে সেইসব দিকে কাহারও নজর নাই। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদির ঘাটতি যেমন চরমে, তেমনি জনসচেতনতার অভাবও অত্যন্ত প্রকট। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে দেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সতর্কতামূলক কিছু ব্যবস্থা গৃহীত হইয়াছে। ইহার ব্যাপক সুফলও পাওয়া যাইতেছে। ব্যক্তিগত অসতর্কতার কারণে মাঝেমধ্যে দুইএকটি দুর্ঘটনা ঘটিলেও সৈকতে প্রাণহানির ঘটনা হ্রাস পাইয়াছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মাধবকুণ্ডসহ অন্যসব ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্তটি অনুসরণযোগ্য। ইহা সত্য যে সামর্থ্যের অভাবে অতি জরুরি অনেক কাজও আমাদের দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে এই ক্ষেত্রে সামর্থ্য কোনো বাধা নহে, মূল বাধা হইল সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার অভাব। জননিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসন আন্তরিক হইলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জরুরিভিত্তিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এই ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা কঠিন কোনো কাজ নহে। ইহা প্রশাসনের দায়িত্ব বটে। কিন্তু সেই ইচ্ছা বা দায়িত্বশীলতা কি তাহাদের আছে?
