একটি দুঃখজনক ও অমানবিক ঘটনা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৩
কুষ্টিয়া মেহেরপুরের একটি ঘটনা। ঘটনাটি সামান্য হইলেও তাহাতে ভাবিয়া দেখিবার বিষয় আছে। গত সোমবার মেহেরপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে একটি কাণ্ড-কারখানা ঘটিয়াছে। আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আদালত অবাধ্যতার অভিযোগ আনিয়াছে। পুলিশ ও একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের ভাষ্য হইল, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে এক দল ছা্ত্রলীগ কর্মী একটি মামলার শুনানি চলাকালে মামলার অগ্রগতি দেখিতে আদালতে উপস্থিত হয়। এক পর্যায়ে দুই ছাত্রলীগ কর্মী আদালতের একজন কর্মচারীর নিকট পানি খাইতে চাহেন। কিন্তু শুনানি চলার অজুহাত দেখাইয়া তিনি সেই নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানান। বলাবাহুল্য, ইহাতে সরকারি দল সমর্থক ঐ ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মর্মাহত ও ক্ষিপ্ত হন। তাহারা ঐ কর্মচারীকে তত্ক্ষণাত আদালত হইতে বাহির হইয়া আসিতে বলে এবং দেখিয়া নেওয়ার হুমকি দেয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট তাহাদের ডাকিলে সেখানেও তাহারা তাহার সহিত অসদাচরণ করে বলিয়া জানা যায়। এই ঘটনাটি দুঃখজনক। ইহাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কিছুটা হইলেও বাড়াবাড়ি করিয়াছেন। কিন্তু ইহাকে কেন্দ্র করিয়া পরে যাহা ঘটিয়াছে তাহা আরও দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত। এই ঘটনায় আদালতের ঐ কর্মচারী আটজন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর নামে দ্রুতবিচার আইনের আওতায় মামলা করিয়া বসেন। ফলে উত্তেজিত হইয়া ছাত্রলীগ কর্মীরা মেহেরপুর শহরে সড়ক অবরোধ করে এবং কয়েকটি যানবাহনে আগুন ধরাইয়া দেয়। অবশেষে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বিষয়টি মিটমাট করিয়া দেওয়ার আশ্বাস দিলে তাহারা শান্ত হয়। ঘটনাটির সূত্রপাত হইয়াছে তুচ্ছ ঘটনা তথা পানি না দেওয়াকে কেন্দ্র করিয়া। যে কোন সময় যে কোন লোকের পানির পিপাসা দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে পিপাসার্ত মানুষকে সাহায্য করিতে সকলেই আগাইয়া আসেন। গ্রামে-গঞ্জে তো বটে, শহরাঞ্চলেও এই ভদ্রতাটুকু রক্ষা করা হয়, যদিও শহরে এখন পানি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিনিয়া খাইতে হয়। তাহাছাড়া একজন মানুষের ন্যূনতম মানবিক বিবেচনাবোধও থাকা দরকার। এই দৃষ্টিকোণ হইতে বলা যায়, আদালতের ঐ কর্মচারী অমানবিক কাজ করিয়াছেন। প্রয়োজনে আদালতের শুনানি কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেওয়া যাইত। ইহাতে মহাভারত অশুদ্ধ হইত বলিয়া মনে হয় না। আমরা জানি, পানি না পাইয়া কারবালার মরু প্রান্তরে শহীদ হইয়াছিলেন ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাহার অধিকাংশ পরিবারবর্গ। ইমাম হোসাইন (রা.) বিবি সখিনার শিশুপুত্র আলী আসগরের জন্য একফোঁটা পানি ভিক্ষা চাহিয়াছিলেন। কিন্তু পাষণ্ড এজিদের দল পানির বদলে তীর ছুঁড়িয়া আসগরের বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া দেয়। কবির ভাষায়, ‘এক কাতরা পানি দেয়নি কম জাতরা’। তাই সীমার-এজিদের অনুসারী ছাড়া পানি নিয়া কেহ এইভাবে বাগড়া দিতে পারে না। রোজ হাশরের দিন আল্লাহ তায়ালা বান্দাহদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখিবেন এই বলিয়া যে, তাহারা তাহাকে পানি পান করায় নাই। তখন মানুষেরা বলিবে, ইহা কিভাবে সম্ভব? তখন তিনি বলিবেন, পৃথিবীতে তাহার পিপাসার্ত বান্দাদের পানি পান করিতে দিলেই তাহা তাহাকে পানি খাওয়ানোর শামিল হইত। এই ধর্মীয় শিক্ষাও আমরা গ্রহণ করিতে পারি নাই। যাহা হউক, দেশের প্রাচীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ হাল জামানায় অনেক অন্যায়-অপকর্ম করিলেও তাহাদের রক্তে প্রতিবাদের ধারা ও ঐতিহ্য বহমান। আমরা আশা করি, মেহেরপুরের উক্ত ঘটনার মীমাংসায় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সংযম, ধৈর্য্য ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন