ঐশীকে নিয়ে কিছু লেখা মনে হয় অতোটা সহজ নয়। বেশ জটিল ও কঠিন। কারণ সে এমন ভয়াবহ ঘটনাই ঘটিয়েছে, যা নিয়ে চিন্তা করে কুল কিনারা পাওয়া মুশকিল। ভাবছি আমাদের দেশের রাজনীতিতেও শেষ পর্যন্ত এ জাতীয় ভয়াবহ কিছু ঘটে বসে কিনা! ঐশী কি সে সিগন্যালই দিয়ে গেল? এতো সব সম্ভবের দেশ। যেমনটি ঐশী নিজেকে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে মাদকের বদৌলতে। আমাদের রাজনীতিতেও না কোন মাদক ঢুকছে যার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আমাদের আবার ডুবাবে।
সর্বনাশা মাদকাসক্তির সংক্রামক ব্যাধি সমাজে যারা ছড়ায়, তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কাজটি যেমন কোন সরকারই করতে পারেনি, তেমন ভয়াবহ রাজনৈতিক অসততা ও দুর্বৃত্তায়ন যারা করে তারাও নিরাপদে সক্রিয়। রাজনীতি ও নির্বাচন যদি সমাদর্শের ভিত্তিতে গঠিত ও পরিচালিত হয়, তবে আদর্শ রাজনীতি ক্ষমতার মোহে ভ্রষ্ট হবে না। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি জাতির সেবা ও মঙ্গল হয়, তবে সে রাজনীতি হবে ত্যাগের ও দেশপ্রেমের। পরিতাপের হলেও বাস্তব যে, আমাদের রাজনীতি এখন ঐশী দোষে দুষ্ট, রাজনৈতিক মাদকাক্রান্ত।
গোটা জাতি আজ এ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে আতংকিত, অনেকটা হতাশাগ্রস্ত। বিশেষত সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে। সমরেশ মজুমদার ক’দিন আগে বাংলাদেশে এসে বলে গেলেন- আওয়ামী লীগের উচিত বিরোধী দলে যাওয়া। আরেকজন সাহিত্যিক হয়তো বলতেই পারেন যে, বিএনপি আরেক দফা বিরোধী দলে থাকলে দোষের কি? এ জাতীয় মন্তব্য বড় কথা নয়, বড় কথা রাজনীতির মানসিকতা নিয়ে। ঐশী যেমন হুইস্কি খেয়ে বন্ধুর প্ররোচনা ও সমর্থনে মা-বাবা নিধনে মেতে উঠে। তেমন রাজনৈতিক হুইস্কি আগামী রাজনীতি ও নির্বাচনকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। দেশী-বিদেশী প্রভু বা বন্ধুদের ইন্ধন ও ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে দু’দলের কঠিন অবস্থানের পেছনে।
নির্বাচন পদ্ধতি প্রশ্নে তথা তত্ত্বাবধায়ক বনাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পদ্ধতি ও রূপরেখা প্রশ্নে প্রধান দুটো দল শুধু দু’মেরুতেই নয়। বিরোধী দল যেখানে এক দাবিতে অনড়, সরকারি দলের নেতারা সেখানে নানা ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন। শেষ পর্যন্ত কথায় চুলোচুলিও হয়েছে।
২৪ জানুয়ারীর মধ্যে নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে। ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। অনেকে বলছেন, অক্টোবরে বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে যাবে। মন্ত্রীরাও যেকোন আন্দোলন দমাবার হুমকিতে পিছিয়ে নেই। সংকটটা কিন্তু গণতন্ত্রের! ঐশী যেমন মা-বাবার প্রতি তার প্রতিশোধ স্পৃহাকে সামলে, তাদেরকে ভুলে গিয়ে পৃথক হয়ে যাবার নিরাপদ পথ ধরতে পারেনি, পৃথিবী থেকে সরিয়ে স্বাধীন জীবনের কথা ভেবেছিল, আমাদের আগামী ক্ষমতার রাজনীতি আর ক্ষমতামুখী নির্বাচনও আজ গণতন্ত্র ছেড়ে স্বেচ্ছাচারী বল্গাহীন গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যে রাজনীতি ও নির্বাচনে দেশ ও জাতির শুভাশুভ বড় বিষয় নয়। বিএনপি ও আ’লীগের দ্বন্দ্বই যেন আজ বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা জানি, ঝগড়ার বিষয়ে সালিশ লাগে, মধ্যস্থতা লাগে। একবার প্রখ্যাত ছড়াকার ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ প্রমুখ মধ্যস্থতা করে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংকটের বরফ গলাবার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আজও তেমন কোন গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী পক্ষ প্রয়োজন। দু’দলকে অবশ্যই কারো না কারো মাধ্যমে সমঝোতায় আসতেই হবে। নইলে ১/১১ বা অন্যকোন দুর্যোগ যদি জাতীয় রাজনৈতিক আবহাওয়ায় ঘটে যায়, তাহলে তার দায় দায়িত্ব দু’দলকেই বহন করতে হবে। আমাদের ভোগান্তিই যেন কপাল লিখন।
মাত্র ৪/৫ বছরে ঐশীর এতোটা অবক্ষয় ও অধঃপতন অকল্পনীয়। আমাদের রাজনীতির অবক্ষয় ও দুর্বৃত্তায়নের পেছনেও একশ্রেণীর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের কালো হাত বিগত চার দশকে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে রাজনীতিতে যে জিদ, জিঘাংসা ও প্রতিহিংসা চলছে, এ অপচর্চা দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকে অপরিণামদর্শী পরিণতিতে পৌঁছে দিতে পারে। তাই ব্যক্তি-দলের উপর দেশ ও জনগণের স্বার্থকে স্থান দিয়ে সংলাপ ও সমঝোতার পথ খুঁজতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর ও অখণ্ডিত চেতনাও তো আমাদের অনৈক্য ও বিভক্তির অবসান ঘটিয়ে অখণ্ড জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের মহা মিলনের শুভ সূচনা করতে পারে।
লেখক :শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক,
লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ
নধহমষধ.ধড়ধিল—মসধরষ.পড়স
