নেশা মানুষকে অমানুষ করে দিচ্ছে, ঐশীর মতো খুনী বানিয়ে দিচ্ছে। আর দেশে যেভাবে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে তাতে গোটা দেশজুড়েই এ নিয়ে আতংক তৈরি হয়েছে। হবে বৈকি? রাজধানী ঢাকার চামেলীবাগে যেভাবে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান নিজ সন্তানের হতে খুন হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। শংকা তৈরি করার মতো ঘটনা। প্রশ্ন হলো ঐশী যদি বাবা-মাকে খুন করেই থাকে তাহলে শিশুটি কেন এমন কাজ করলো? জানি মাদকের নেশা তাকে খুনি বানিয়েছে! প্রশ্ন আসবেই, ঐশী কেন মাদকাসক্ত? কিভাবে তার হাতে মাদক পৌঁছালো? ঐশী কেন খুনী হলো? এ দায় কার? ঐশী আজকের অবস্থার জন্য মোটেও দায়ী নয়। যদি বলি আমরা দায়ী! সমাজ দায়ী! অথচ কেউই নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করি না। মাদক নির্মূলে সচেষ্ট হই না। তাই দেশ মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। যুবসমাজ মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছে। কেবল পুত্রসন্তান নয়, কন্যা সন্তানদের হাতেও পিতামাতা খুনের ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। নেশা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এতো ব্যর্থতা, তবুও এক্ষেত্রে সরকারের নজর নেই কেন? এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। ঐশীদের আর মাদকাসক্ত হতে দেয়া যাবে না। ঐশীদের আর খুনী বানানো যাবে না। এদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। অনেকেই বলেছেন- ঐশীর কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার, আর কোন সন্তান যেন এমন নিষ্ঠুরতা করতে না পারে। তাদের বলবো, এক ঐশীর বিচারই শেষ কথা নয়। ঐশী যে কারণে খুনী হলো আগে সে জায়গাটাতে হাত দিতে হবে। দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে হবে।
মাদকাসক্ত ছেলে বাবা-মাকে খুন করছে, ভাই ভাইকে নেশার ঘোরে খুন করছে। সন্তান যখন পরিবারের সদস্যদের জন্য সহিংস হয়ে ওঠে তখন এর চেয়ে ভয়ানক আর কি হতে পারে? আমরা ধর্ম-কর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ভিনদেশী কালচার রপ্ত করছি। দেশ মাদকে সয়লাব করে দিচ্ছি আর সামাজিক বন্ধন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিধায় এমন ঘটনা ঘটছে। অবাক হওয়ার বিষয়— কত কিছু নিয়েই না ঝড় বয়ে যায় দেশে। মাদক নিয়ে কেউ কথা বলেন না। সংসদে গালাগালি, খিস্তি-খেউড় কত কিছু হয় মাদক নিয়ে, তারা এক্কেবারে চুপ থাকেন। কেন থাকেন? সরকার দলের তারাও চুপচাপ, বিরোধীদলের তাদের মুখেও কুলুপ আঁঁটা থাকে। দু’একজন যাও বলে তা মোটেও জোরালো নয়। আর দেশের মাথাওয়ালাদের চুপচাপ এমন পরিবেশই দেশ মাদকে সয়লাব করে দিচ্ছে আমাদের মাদক বিক্রি সিন্ডিকেট। দেশজুড়ে কেবলই মাদকের লুটোপুটি। কি করছে সরকার? সরকারের কি দায়-দায়িত্ব বলে কিছু নেই। তা প্রতিকারে রাষ্ট্রযন্ত্রের তত্পরতা নিষ্প্রভ কেন? মাদক নির্মূলে াইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বটা একটু বেশি। আজকাল পত্র-পত্রিকাতে যা দেখছি তাতে মাদক নির্মূলের চেয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদককে লালন করছে বেশি।
রাজধানী ঢাকায় ঐশী নামে এক শিশু মেয়ের হাতে বাবা-মা খুন হয়েছে। শিশুটি মাদকাসক্ত। এমন অবিশ্বাস্য-নির্মম ঘটনা কি কখনো ঘটেছে দেশে? আমার জানামতে এটাই এ জাতীয় প্রথম ঘটনা। তবে সজ্ঞানে নয়, মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে অসুস্থ মস্তিষ্কে বাবা-মাকে হত্যা করছে সন্তান। যেমনটি ঐশীর ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু ঐশীই নয়, অনেক তরুণ-তরুণীই এখন মাদকাসক্ত হয়ে ঘটাচ্ছে ভয়াবহ অপরাধ। এসব ঘটনায় তারা গ্রেপ্তারও হচ্ছে। কিন্তু সমস্যার মূলে হাত পড়ছে না। রোধ করা যাচ্ছে না দেশব্যাপী মাদকের অবাধ বেচাকেনা। যাদের এ অবৈধ ব্যবসা রোধ করার কথা সেই আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ও অবৈধ ব্যবসায়ীদের মদদেই চলছে মাদক ব্যবসা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশাসনিক কলকব্জা আয়ত্তে এনে সারা দেশে অবাধে চলা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। তাদের চোখের সামনে দিয়েই সীমান্তপথে আসছে মাদকের চালান। বিকিকিনি হচ্ছে পুলিশের নাকের ডগাতেই। হাত বাড়ালেই ইয়াবা থেকে শুরু করে ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক পাচ্ছে স্কুল, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এর ফলে ভেঙে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন। বাড়ছে অপরাধ। বিপথে যাচ্ছে অসংখ্য নিষ্পাপ তরুণ-তরুণী, ধ্বংস হচ্ছে পরিবার। সন্তানের নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত বাবা-মা ও সমাজের দৃষ্টি রাখা দরকার। চলতি বছরের মার্চে নাটোরে মাদকাসক্ত ছেলের শাবলের আঘাতে বাবা, রাজধানীর পুরোনো ঢাকায় একজন জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতার বড় ছেলে মাদকাসক্ত ছোট ছেলের হাতে খুন হয়েছে। পুরোনো ঢাকায় নরেন্দ্রনাথ বসাক লেনে মাদকাক্ত ছেলের হাতে খুন হয়েছে তার বাবা। ২০১১ সালেও ঢাকায় ছেলের হাতে তার বাবা, ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছে বোন। মিরপুরে মাদকাসক্ত ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছে তার ছোটভাই। ঘটনাগুলো গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়ার ঘটনার অংশবিশেষ মাত্র। সকল ঘটনার পরিসংখ্যান হয়তো কোথাও নেই। তবে গত ১০ বছরে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি জ্যামিতিক হারকেও হার মানিয়েছে। গত ৭ মাসে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজারের উপরে। গত ১০ বছরে মাদক সংক্রান্ত মামলা বেড়েছে ৪ গুণ। সুতরাং বুঝা যায়, মাদক আক্রান্তের সংখ্যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে বসেছে। মাদক যেন মুড়ি-মুড়কির মতো বিকিকিনি হচ্ছে দেশে। পত্রিকার সূত্রমতে, দেশে বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। সরকার বলছে- ৫০ লাখ; কিন্তু বেসরকারি সূত্রমতে ৭০ লাখেরও বেশি। এদের অধিকাংশই যুবক-যুবতী ও তরুণ-তরুণী। মাদক গ্রহণকারীর ৮০ ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর। বিশ্বের নেশাগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। এর ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয়েছে শহর হতে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বিভিন্ন মাদকের মরণ নেশায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ৮-১০ বছরের শিশু হতে শুরু করে নারী এমনকি বৃদ্ধরাও। ২০০২ সালে দেশে মাদক অপরাধীর সংখ্যা ছিল ৬ শতাংশ। বর্তমানে তা ২০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার ফেনসিডিলের কারখানা। সংঘবদ্ধ চক্র মিয়ানমার হতে কক্সবাজার দিয়ে সারাদেশে সুকৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াবা। নতুন নেশা ইয়াবার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। বিশেষ করে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছেলেমেয়েরা। ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা কোনোটি দেশে উত্পাদিত না হলেও তা পাওয়া যাচ্ছে যত্রতত্র। সামাজিক সমস্যা ছাপিয়ে এটি যেন গত দু’দশকে পারিবারিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রায়ই চোখে পড়ে মাদকের করাল গ্রাস থেকে ফেরাতে না পেরে পরিবারের শান্তি রক্ষায় বাবা-মা তার সন্তানকে, সন্তান বাবাকে পুলিশে সোপর্দ করছেন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন জখমের ঘটনা অহরহ ঘটতে শুরু করেছে। এ সমস্যা কেবলমাত্র পারিবারিক বলে মনে করার কোন কারণ নেই। আলোচ্য ঘটনাগুলোও তা বলে না। মূল সমস্যা, সমাজ ও রাষ্ট্রের। দেশের উদীয়মান শ্রেণী যদি সমাজ বৈশিষ্ট্যের বিরূপতার শিকার হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। দেশকে রক্ষা করতে হলে সংশ্লিষ্টদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক:সাংবাদিক
