তাহারাও হইবেন চিকিত্সক

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৩
আমাদের সকল কিছুর ভিতরে অতিমুনাফা প্রবণতা ঢুকিয়া পড়িয়াছে। বেশ কথা। বাণিজ্যের তরে টাকা বিনিয়োগ করিলে মুনাফা তো স্বাভাবিক লক্ষ্যই থাকিবে। কিন্তু এমন কিছু ক্ষেত্র রহিয়াছে, যাহার ভিতরে মুনাফার অন্ধভূত ঢুকিয়া পড়িলে মানব জীবনই বিপন্ন হইয়া পড়ে। আমাদের চিকিত্সক তৈরির বেসরকারি কারখানাগুলিতে আজ সম্ভবত সেই ভূত জাঁকিয়া বসিয়াছে বেশ শক্তপোক্তভাবে। সমপ্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশ হইয়াছে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির কিছু সাংঘাতিক বিপজ্জনক চিত্র। দেশে পাবলিক মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের যে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা হয়, তাহার ন্যূনতম কিছু নিয়ম কানুন রহিয়াছে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হইবার ক্ষেত্রেও। অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, মেডিক্যাল কলেজের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম নম্বর অর্জনকারী প্রায় ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থীকে চিকিত্সাশাস্ত্রে অধ্যয়নের সুযোগ করিয়া দিয়াছে দেশের ১৬টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। শুধু তাহাই নহে, মাত্র সাড়ে ১০ শতাংশের মতো নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীও ভর্তির সুযোগ পাইয়াছেন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিকট আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা এখনো সোনার হরিণ। আমাদের চিকিত্সক অপ্রতুল, হাসপাতাল ও তাহার অবকাঠামোও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। এই চিত্র রাতারাতি বদলাইবে না। বরং ক্রমশ তাহার যে উন্নতি ঘটিতেছে, তাহা অসত্য নহে। দেশে এক্ষণে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ৭৬। ইহার ভিতরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা সরকারি কলেজের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি! সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষে সাত হাজার শিক্ষার্থীর ভিতরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হইয়াছে প্রায় চার হাজার ৮০০ জন শিক্ষার্থী। অর্থাত্ চিকিত্সক তৈরির ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজগুলির ওপর আমাদের নির্ভরতা বাড়িতেছে দিন দিন। এই অর্থে বলা যায়, ভবিষ্যতে আমরা যাহাদের নিকট হইতে চিকিত্সাসেবা পাইব তাহাদের বেশির ভাগই হইবেন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হইতে পাস করা চিকিত্সক। কিন্তু যে শিক্ষার্থী শুধুমাত্র টাকার জোরে ন্যূনতম মেধা অর্জন না করিয়াও চিকিত্সার মতো অতি স্পর্শকাতর ও জটিল বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় অবতীর্ণ হইবেন, তাহাতে বিপদ শুধু আমাদের নহে, ওই সকল অমেধাবী চিকিত্সকদের পেশাজীবনেরও। এইখানে হয়তো বলা হইবে, চিকিত্সা শাস্ত্রের সুশৃঙ্খল ও ব্যবহারিক শিক্ষায় ফাঁকি দিয়া পাস করা যায় না। অর্থাত্ যাহারা পাস করিয়া বাহির হইবেন তাহাদের যোগ্যতা লইয়া প্রশ্ন উঠিবে না। কিন্তু প্রশ্ন হইল, যেই দেশে চিকিত্সা সেবাকে পরিণত করা হয় নির্মম ব্যবসায়, যেইখানে হামেশাই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয় ভর্তির ন্যূনতম নিয়ম নীতিকে, সেইখানে চিকিত্সক সার্টিফিকেট পাইতেও ভিন্ন পথ আবিষ্কার করা হইলে অবাক হইবার কিছু থাকিবে কি? যাহারা ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ টাকা ব্যয় করিয়া ভর্তি হইলেন এবং পরবর্তী পর্বতপ্রমাণ ব্যয়ভার বহন করিয়া শিক্ষাবর্ষ অতিক্রম করিতে থাকিবেন, তাহারা কি তাহাদের ভর্তির অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত পথ ধরিয়াই আগামী পথ খুঁজিবেন না? সেই অনিয়ম করিবার অভ্যাস কি গড়িয়া উঠিবে না জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে? বিপদ এইখানেও। ইহার পূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশ হইয়াছে আমাদের চিকিত্সাসেবা হইতে ‘সেবা’ শব্দটি পথ হারাইয়াছে। ইহা প্রকারান্তরে হইয়া গিয়াছে লাভজনক ব্যবসা মাত্র। তবে তাহাতে আপামর জনগোষ্ঠীর চিকিত্সা সেবায় ব্যয় বাড়িলে বা ব্যাহত হইলে ব্যবসায়ীদের কিই বা আসে যায়! চিকিত্সা সেবার্থে হাসপাতাল ও কলেজ প্রতিষ্ঠায় যেই সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অর্থলগ্নি করেন, তাহাদের মনে রাখা উচিত, ধন নয় মান নয়, তাহারা মানুষের জীবন লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছেন, ইহাতে অবহেলা ও অন্ধব্যবসা চলে না। সরকারের প্রকৃত ব্যবস্থাপনাও এই সকল অনিয়ম দূর করিতে পারে সহজেই, শুধু সদিচ্ছা দরকার।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন