ক্ষতি সব আমার বন্ধু, লাভ ফিফটি-ফিফটি!

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩০
যেকোন প্রকল্প গ্রহণের আগে তা অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু viable তা appraisal করে দেখা উচিত। অন্য বিষয়গুলো ঠিক রেখে একটি প্রকল্পের শুধু স্থান পরিবর্তন করলে তুলনামূলক বিচারে ক্ষতির পরিমাণ যদি কম হয় তাহলে সেটিই করা উচিত। এক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করলেই শুধু মাথা থেকে ইগো ঝেড়ে ফেলা সম্ভব। সংকীর্ণ স্বার্থপরতা বাদ দেয়া সম্ভব। এখন যদি গ্রামের মোড়ল-মাতুব্বরের মতো দ্বায়িত্বশীলরা মনে করে, একবার যা বলে ফেলেছি, যে চুক্তি করে ফেলেছি তা করেই ছাড়ব, তানা হলে ইজ্জত থাকবে না, হেরে যাওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এরূপ একগুঁয়েমি মন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বড় বড় পদে আসা কতটা যৌক্তিক তা অবশ্য শান্ত চিত্তে বিবেচনার দাবি রাখে। আর যদি ভাবা হয়, বন্ধুত্ব রক্ষা করতে হলে নিজে অঙ্গহানি করে প্রমাণ দিতে হবে বিশ্বস্ততার- তাহলে এমন বন্ধুত্বের প্রয়োজন আছে কিনা তা নিয়ে নতুন করে গবেষণা করতে হবে। বলছিলাম রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, দ্বি-পাক্ষিক বিষয়ে পারস্পরিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকার, বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং সঞ্চালনের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক এবং এই ধারাবাহিকতায় ২০ এপ্রিল-১৩ বিদ্যুত্ ভবনে ভারতের সঙ্গে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট সম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি নামে একটি কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। তবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে, রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ভারত পারস্পরিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করার জন্য এমন চুক্তি করছে, না মাড়োয়ারিদের মতো বাণিজ্য করার জন্য চুক্তি করছে। চুক্তির বিষয়টি এবং অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের এনটিপিসি এবং বংলাদেশের পিডিবি যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। তবে এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির। পরিচালনার দ্বায়িত্ব ভারতের হাতে থাকার কারণে ইকুয়েপমেন্ট আমদানী, দাম নির্ধারণ, কোন দেশ থেকে আমদানী করা হবে- এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পক্ষের কোন মতামত থাকবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি ডলার। প্রকল্পের ব্যয়ের শতকরা ৭০ ভাগ বৈদেশিক ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাকি শতকরা ৩০ ভাগ অর্থের সংস্থান করবে পিডিবি ১৫ শতাংশ, ভারতীয় পক্ষ ১৫ শতাংশ। নিট যে লাভ হবে সেটা ভাগ করা হবে ৫০ শতাংশ হারে। উত্পাদিত বিদ্যুত্ ২৫ বছর কিনবে পিডিবি। সুতরাং মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থায়নের জন্য ৫০% মালিকানা দিয়ে ভারতের মতো একটি অবিশ্বাসী পক্ষকে ব্যবসায়িক পার্টনার করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া (৭০ শতাংশ ঋণ+১৫ শতাংশ নিজ অর্থ)= ৮৫ শতাংশের দায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে পার্টনার নেয়ার দরকারই বা কি? এছাড়া ঋণ কোন দেশ থেকে কত সুদের হারে নেয়া হবে তাও স্পষ্ট নয়। ঋণ নিয়ে পার্টনারশীপে বিদ্যুত্ কেন্দ্র করতে হলে পরিবেশ বান্ধব সৌর বিদ্যুত্ কেন্দ্র বা বায়ু শক্তির বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের মতো প্রকল্প কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না? এখন আসি বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়ে। দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। যেমন- যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে পাঁচ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ আট টাকা ৮৫ পয়সা। সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে- পিডিবি এখন থেকে আট টাকা ৮৫ পয়সা দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ কিনবে সেটা নিশ্চিত। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে মাওয়া, খুলনার লবণচরা এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পিডিবির সঙ্গে, সেখানে সরকার মাওয়া থেকে চার টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবণচরা থেকে তিন টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুত্ কিনবে। তাছাড়া ভারত থেকে যে বিদ্যুত্ আমদানি করা হচ্ছে তার দাম পড়বে কিলোওয়াট (ইউনিট) প্রতি ৪ টাকা। দেশি কোম্পানি ওরিয়ন গ্রুপ এবং ভারত অবশ্যই লাভ করেই বিদ্যুত্ বিক্রি করবে। তারা লাভ করেও সর্বোচ্চ ৪ টাকা দরে বিক্রি করবে। আর রামপাল থেকে কেনা হবে ৮.৮৫ টাকা দরে। অর্থাত্ এখানে ইউনিট প্রতি কিলোওয়াটে অতিরিক্ত লাভ হবে (৮.৮৫-৩.৮০)= ৫.০৫ টাকা। সুতরাং ১৩২০ মে:ও: অর্থাত্ (১৩২০–১০০০)= ১৩,২০,০০০ কি:ও: উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্ কেন্দ্রের বছরে লাভের পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। ফলে ভারতের বিনিয়োগকৃত ১৫% অর্থাত্ ২২.৫০ কোটি ডলার উঠতে খুব অল্প সময়ই লাগবে বলা যায়। এভাবে বাধ্যতামূলকভাবে দেশি কোম্পানির চেয়ে দ্বিগুণ মূল্যে বিদ্যুত্ কিনতে হবে বিদেশি অংশিদারিত্বের কোম্পানির কাছ থেকে। তাছাড়া দ্বিগুণ দামে বিদ্যুত্ কেনার পর ভোক্তা পর্যায়ে কত দামে বিক্রি করা হবে তা এখনো ঠিক করা হয়নি। সরকার কি ভর্তুকি দিয়ে কম দামে এ বিদ্যুত্ বিক্রি করবে? যদি তাই হয় তাহলে “মরার উপর খাড়ার ঘা”-এর মতো অবস্থা হবে নয় কি? সুতরাং এ প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু যৌক্তিক তা এখনো ভেবে দেখা উচিত। প্রয়োজনে খুব দ্রুত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি করে প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। দেশীয় কোম্পানিকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সংরক্ষণ না করে , তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা না করে, তাদের কাছ থেকে কম দামে বিদ্যুত্ কিনে, প্রভু সূলভ আচরণকারী পার্টনারকে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান করতে হবে- এটা কেমনতর চুক্তি? নিজের ক্ষতি পাগলেও বোঝে, আমরা বুঝলাম না। হায় দুর্ভাগা জাতি! অধিকন্তু ভারতের সাথে যেকোন চুক্তিকে এদেশের জনগণ সন্দেহের চোখে দেখে। দেখার যুক্তিও আছে। কেননা ইতিপূর্বে ভারতের সাথে করা সকল চুক্তিই আমাদের স্বার্থের বিপক্ষে গেছে। যেমন ছিটমহলবাসীর সমস্যা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয় ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। এই চুক্তিতে ছিটমহলবাসীর সমস্যা দূরীকরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা সন্নিবেশিত ছিল। সেই চুক্তির আলোকে ভারত এখনো পর্যন্ত স্থল সীমান্ত চুক্তি করল না। তারা বেরুবাড়ি নিল, তিনবিঘা করিডোর আজও দিল না। এবার আসি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর চুক্তি অর্থাত্ যৌথ নদী কমিশনের চুক্তির কথায়। ১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে জেআরসির বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এসব সমঝোতা ও চুক্তি ভারতের স্বার্থকেই অধিকতর রক্ষা করেছে, তারপরও প্রতিশ্রুত হিস্যা বাংলাদেশ পাচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী বছরে অন্ততপক্ষে চারটি জেআরসি বৈঠক হওয়ার কথা। সে হিসাবে ৪০ বছরে বৈঠক হওয়ার কথা কমপক্ষে ১৬০টি; কিন্তু হয়েছে মাত্র ৩৭টি। ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সম্মত করতে ভারতের তাগিদে মাত্র দুই বছরেই জেআরসির বৈঠক হয়েছে ৭টি। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকেই এ কমিশনের বৈঠক বিষয়ে ভারত আর আগ্রহ দেখায়নি। প্রয়োজন ছিল বলেই প্রথম দুই বছরে ভারত তাগাদা দিয়ে সাতটি বৈঠক করিয়েছে। পরে ৩৭ বছরে সর্বসাকুল্যে বৈঠক হয়েছে মাত্র ৩০টি। এভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে অভিন্ন ৫৪টি নদীই আজ উজানের দেশ ভারত কর্তৃক হয় আক্রান্ত, নয় শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। পরিণতিতে বাংলাদেশে বিপুল পরিবেশগত সমস্যা এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ নিয়ে ভারতের কোনো বিকার নেই। পানি আগ্রাসনের পর এবার রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করে সুন্দরবনের উপর আগ্রাসন চালিয়ে বাংলাদেশকে মরুকরণ প্রক্রিয়ার দিকে দ্রুত ঠেলে দিয়ে ভারত কি আমাদেরকে পরনির্ভরশীল ফকিরের জাতি বানাতে চায়? ১৮৪৭ একর ধানি জমি অধিগ্রহণের ফলে আট হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে। রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ ৬শ জনের, ফলে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে জেলে, কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার প্রায় সাত হাজার ৫শ পরিবার। এছাড়া বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপিত হলে বছরে এর ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ৬২,৩৫৩ টন ধান, ৫,২১৮ মেট্রিক টন মাছ, ১,৪০,৪৬১ টন অন্যান্য শস্য এবং প্রকল্প এলাকায় ১,২৮৫ টন ধান, ৫৬,৯৪১ মেট্রিক টন মাছের উত্পাদন হারাতে হবে। হারাতে হবে বাড়ি প্রতি গড়ে ৩/৪টি গরু, ২/৩টি মহিষ, ৪টি ছাগল, ১টি ভেড়া, ৫টি হাঁস, ৬-৭টি করে মুরগি। ম্যানগ্রোভ বনের সাথে এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এলাকাটি স্বাদু ও লোনা পানির মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু বিপন্নতায় শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের নিকট থেকে অর্থ সহায়তা নিচ্ছে; কিন্তু রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বছরে নির্গত হবে ১ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াবে। উন্নত বিশ্ব কার্বণ নির্গমনের দায় হিসেবে বাংলাদেশকে অর্থ দিলেও রামপাল বিদ্যুত্ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার নিজেই বিপুল পরিমাণ কার্বণ নির্গমনের পথে এগোচ্ছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পরবর্তী সময়ে এ কারণে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত জলবায়ু তহবিলের উপর আঘাত আসতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য; কিন্তু লাভের ভাগ হবে ফিফটি-ফিফটি আর ক্ষতির ভাগ নেবে শুধু বাংলাদেশ। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, তুলনামূলক কম ক্ষতি সাপেক্ষে প্রকল্পের জায়গা নির্ধারণের বিষয়টি। তাছাড়া প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক সেটিও ভাবনায় নিতে হবে। সরকার যদি ভাবে, টাকাতো আসবে জনগণের ট্যাক্স থেকে। আমাদের নিজস্ব সম্পত্তি বিক্রি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে না। মাঝখান থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল থাকল। এক-পাক্ষিক সম্পর্ক ভাল রাখার এ মতবাদের ধারণা সরকারের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ শেষমেষ জনগণের সিদ্ধান্ত বড়ই কঠিন ও নির্মম হয়। লেখক: কলামিস্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন