ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগত্ আমাদের জীবনের সহিত দিন দিন একীভূত হইয়া পড়িতেছে। যাহার সংস্থান না থাকিলে জীবন থমকাইয়া যায়, সেই জীবিকারও বড় উত্স হইয়া উঠিতেছে এই ভার্চুয়াল জগত্। এই জগতে কাজ পাইবার একটাই শর্ত—মেধা। অর্থাত্ একটি স্বল্প সম্পদশালী ও স্বল্পোন্নত দেশের যদি থাকে বিপুল জনসংখ্যা এবং তাহাদের যদি ঠিকমতো গড়িয়া তুলিতে পারা যায়, তাহা হইলে তাহারাই সেই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ হইয়া উঠিবে। আমরা সেই নূতন যুগের দিকেই আগাইয়া চলিতেছি।
আমাদের মেধাবীরাও তাই অনেকে আজকাল বাছিয়া লইতেছে মুক্ত জীবনের মুক্ত পেশা বা ফ্রিল্যান্সিং । বিশ্বের ভার্চুয়াল শ্রমবাজার বিস্তৃত হইতেছে দ্রুত গতিতে। গত বত্সর অনলাইনের এই শ্রমবাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের মার্জিন ছাড়াইয়া গিয়াছে। আগামী বত্সর তাহা দ্বিগুণ হইবে। ঊর্ধ্বমুখী এই গ্রাফ বলিতেছে, পাঁচ বত্সর পর তাহা পাঁচ শত কোটি ডলারে পৌঁছাইবে। এই সকল আউটসোর্সিংয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশের তালিকায় রহিয়াছি আমরা। গতানুগতিক চাকুরীর বাহিরে নিজের পছন্দমাফিক কাজ করিবার এই মুক্ত পেশায় তাহারা মুক্ত হাওয়া পাইতেছেন। দেশের অর্থনীতির জন্যও তাহা অপরিসীম গুরুত্ব ও সম্ভাবনা রহিয়াছে। তাহার প্রকাশ ইতিমধ্যেই আমরা অল্পবিস্তর পাইতে শুরু করিয়াছি। সামপ্রতিক চিত্রে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই সকল নূতন নূতন দিগন্তের দিকেই ইঙ্গিত দিতেছে। কারিগরি ও ভাষাজ্ঞান কাজে লাগাইয়া মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনিতেছেন শিক্ষিত তরুণরা। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সার হিসাবে অনলাইন আউটসোর্সিং করিতেছেন। ইহার ভিতরে অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাঠ চুকাইয়া অনেকেই এই মুক্ত পেশা গ্রহণ করিতেছেন। চলতি বত্সরে এই ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের পরিমাণ দৈনিক দুই কোটি টাকা স্পর্শ করিবে বলিয়া ধারণা করিতেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতি মাসে কাজের ধরনভেদে ৩০ হাজার হইতে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করিতেছে আমাদের অনেক ফ্রিল্যান্সার। সীমিত পরিসরে স্বল্প সংখ্যক ফ্রিল্যান্সার যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আনিতেছেন—তাহা ঈর্ষণীয় নি:সন্দেহে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের ফ্রিল্যান্সাররা সুনাম অর্জন করিতেছেন।
পোশাক শিল্পে আমরা যেই কারণে বিশ্বের বড় বড় বাজারে প্রবেশ করিতে পারিয়াছি, আউটসোর্সিংয়ের কাজ পাইবার ক্ষেত্রেও সেই কারণটি জোরালো ভূমিকা পালন করিতেছে। অর্থাত্ তুলনামূলক সস্তা শ্রমমূল্য। আউটসোর্সিংয়ের কাজ পাইয়া দিবার অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান ওডেস্ক বলিতেছে, আমাদের সফলতার পিছনে রহিয়াছে সস্তা শ্রম ও ইংরেজিতে দক্ষতার বিষয়টি। ওডেস্কে আউটসোর্সিংয়ে শীর্ষ শহরগুলোর ভিতরে ভারতের চণ্ডিগড় ও মোহালির পরেই রহিয়াছে ঢাকা’র নাম। তাহার পরে আছে ফিলিপাইন। সমস্যা হইল আউটসোর্সিং এখনো অনেকটাই ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে ব্রডব্যান্ড সংযোগ কম এবং ইন্টারনেটের ধীরগতি থাকিবার কারণে এই ক্ষেত্রটি বিকশিত হইতে পারিতেছে না। এই মুক্তপেশার কোনো আকাশসীমা নাই। তাই, সরকারের আশু কর্তব্য ডিজিটাল বাংলাদেশের সত্যিকারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাইতে উচ্চগতির ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সুবিধা বৃদ্ধি করা। আর একটি বিষয় হইল, ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রসারের পাশাপাশি এক শ্রেণির লোক তরুণদের লইয়া প্রতারণামূলক কার্যক্রমের চেষ্টা করিয়া থাকে। নামে-বেনামে এবং নামসর্বস্ব প্রায় অর্ধ শতাধিক ভুয়া ওয়েবসাইট চালু করিয়া এই প্রতারকরা আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে প্রতারণার কাজ চালাইতেছেন। এই প্রতারণার বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও প্রকৃত আউটসোর্সিংয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যাইতে পারে।
এই বিশ্বের যাবতীয় ব্যবস্থাপনার বিবর্তন ঘটিতেছে খুব দ্রুত, সেইখানে ভবিষ্যতে মানবশক্তিই হইয়া উঠিবে অর্থনীতির প্রধান ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে একমাত্র চালিকা শক্তি। ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, আউটসোর্সিংয়ে আমাদের যতটুকু সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটিবার জন্য অবকাঠামোগত বিস্তর অসুবিধা রহিয়াছে। অথচ আমাদের রহিয়াছে মেধাবী এক বিপুল জনগোষ্ঠী। সুতরাং আমাদের এই বিপুল সম্ভাবনার একটি উর্বর খাতকে সমৃদ্ধ করিতে কার্যকর সকল পদক্ষেপ সব অর্থেই মঙ্গলজনক।
