আলোকপাত

সুন্দর সমাজ নির্মাণে—

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪০
মানুষের জীবনকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য। জীবনের প্রথম ভাগ শৈশব এবং শেষ ভাগ বৃদ্ধ। শৈশব এবং বৃদ্ধ অবস্থায় আমরা অনেক কিছুর মধ্যে মিল খুঁজে পাই। জীবনের এই দুটি ভাগে দেখতে পাই মানুষ অন্যের উপর নির্ভরশীল। তার প্রথম কারণ শিশুর অবুঝ মন, সে নিজে চলাফেরা করতে পারে না। শিশুর একটা নিজস্ব পরিমণ্ডল থাকে। সে চোখ মেলে মাকে সব সময় কাছে পায়। তাছাড়া বাড়ীর পরিজনদের স্নেহের পরশে নিজেকে খুঁজে পায়। অপরিচিত লোক দেখলে সে কাঁদে, ভয় পায়। কিন্তু অল্পক্ষণ মেলামেশা করার পর সে ভয় কেটে যায়। শিশু খুব ভাল বিচারক। সে খুব তাড়াতাড়ি বুঝে উঠতে পারে কে তাকে ভালবাসে। সে হাসি, কান্না, মান-অভিমান তার প্রিয়জনের সামনে তুলে ধরে। ঠিক সেইভাবে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সবাই তার প্রিয় মানুষদের ভালবাসা পাবার জন্য আকুল থাকে। কারণ বৃদ্ধাবস্থায় শরীর দুর্বল হয়। সেই সঙ্গে মনটাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এটা প্রকৃতির নিয়ম। আমরা মানুষ হিসাবে শিশু এবং বৃদ্ধদের প্রতি কি নিষ্ঠাবান, যত্নশীল? অনেক মা-বাবা আমার লেখা পড়ে বলবেন, প্রতিটি মা-বাবা তার সন্তানের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল, নিষ্ঠাবান। এটা আবার বলতে হয় নাকি? তবে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা কেন? শিশুর কথায় ফিরে যাই, বৃদ্ধদের কথায় পরে আসছি। আজকাল হাই সোসাইটির শিশুদের মানুষ করার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। দিন-রাত মা-বাবা বাইরের জগত্ নিয়ে ব্যস্ত আর শিশুটি কাজের লোকের কাছে বড় হয়। কারণ বাড়ীতে সেকেলের মতো বৃদ্ধদের থাকা চলবে না। বাড়তি বোঝা বলে তাদের সরিয়ে রাখা হয়। পরিবার বিভাজনের ফলে শিশুটি ছোট থেকে এক অভিন্ন মনোভাব পোষণ করে বড় হয়। সে যে বাড়ীতে থাকে সেখানে প্রচুর কাজের লোক থাকে। কিন্তু আপনজনের বড় অভাব। শিশু ঘুম ভেঙে মা-বাবাকে পায় না। সে ঘুমানোর পরেই তারা আসে। যদিও কোনও সময় মা-বাবাকে পায় তখনও তারা বিরক্তি বোধ করেন। মা কাজের লোককে শাসিয়ে বলবে, দেখতে পাও না সারাদিন খাটুনি করে তোমাদের সাহেব ও আমি এসেছি, এখন তাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখ, বাড়ির সামনে লনে নিয়ে যাও। শিশু তার মাকে চায়। সে পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজনের বুকে ঘুমাতে চায়। সে শিশু বুঝে না এখন বিশ্বায়নের যুগ। হাই সোসাইটির জ্বরে কাবু মধ্যবিত্ত পরিবার। সকাল থেকে রাত অবধি রুটিন মাফিক চলতে হবে শিশুকে। নিয়মের এ দিক-ও দিকে হলে যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার হওয়া যাবে না। সবাইকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, নইলে স্টেটাস থাকে না। আজকাল প্রকৃতিগত মানুষের বড় প্রয়োজন। ক’ মাস আগে ঢাকা থেকে সিলেট আসার আগে আখাউড়া স্টেশনে বেশ কিছু সময় থাকতে হয়েছিল। দু’ চোখ ভরে দেখেছি নগরির সভ্যতার নগ্নতার ভয়াবহতা। নোংরা শরীর, জামা-কাপড় শতছিদ্র, একটু খাবার পাওয়ার জন্য প্রতিটি যাত্রীর পিছু ছুটছে শিশুরা। এক কাপ চা হাতে বিস্কুটের প্যাকেট খুলতে দুটি শিশু, একটি ছেলে, একটি মেয়ে হাত বাড়ায়। আমি বিস্কুট দিতে হাত পেতে নিল। সে এক পরম তৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে দিল। মনে হল সমস্ত দিগন্তটাই আলোময়। এই শিশুদের দিকে তাকিয়ে মনে হল কবির সেই বিখ্যাত কবিতার লাইনটি—ক্ষুধার রাজ্যে কবিতা গদ্যময়/ পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। স্বভাবতই প্রশ্ন, আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত্, তবে সেই কোন ভবিষ্যতের পথে আমরা হাঁটছি। যে দেশের শিশুদের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছু নেই, সে দেশের ভবিষ্যত্ মহা অন্ধকারে আবৃত নয়? সেই অন্ধকার থেকে সৃষ্টি হয় চুরি, খুন, রাহাজানি আর কত শত অপরাধ। এর জন্য দায়ী কে? সরকারের নিরন্তর প্রয়াস শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, শিশু সুরক্ষা আইন, শিশুশ্রম কি ব্যর্থ নয়? যাদের শিশুরা শিক্ষার আলো পায়, তাদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ। খোলা আকাশের নীচে থই থই পানিতে কাদায় কিংবা আমগাছের উপরে খেলার সুযোগ পায় না। কারণ আমরা অপ্রাকৃতিক সবকিছুকে বেশি ভালবাসি। কম্পিউটার গেইম, ইন্টারনেট, ফেসবুক সব সাহেবী খেলা। সাহেবি খেলায় মানসিক বিকাশ সম্ভব হলেও শারীরিক বিকাশ ঘটে না। সব কিছুর প্রেক্ষাপটে দুঃখজনক ঘটনা হল, বয়োজ্যেষ্ঠদের অবহেলা। এই অবহেলার জন্যই সমাজে অবক্ষয়। লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন