প্রকৃত ইমেজে বিস্মৃত স্বদেশ জেগে উঠুক বিশ্বে

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৪
বাইরের দেশের মানুষের কাছে আমাদের ইমেজটা আসলে কি ধরনের? বাংলাদেশ বলতে তারা কি বোঝেন? এ জাতীয় ধারণা বা মতামত এখন যে কোন দেশ বা জাতির জন্য জরুরি। একটা সময় ছিল যখন মানুষ নিজস্ব ভূখণ্ড বা দেশ সীমার বাইরে খুব বেশি জানতো না। এই অজানা বা না জানতে পারার কারণ ছিল যোগাযোগহীনতা, সমুদ্রপথে একেক দেশের দূরত্ব ছিল মাস বা তার চেয়েও অধিক, কালক্রমে আকাশ যোগাযোগে সে দূরত্ব হ্রাস পেলেও তার চিন্তার জগত্ এতোটা দেখতে পেতো না। অদর্শনে বা দেখতে না পাওয়ার কারণে মানুষ বাস্তবতার পরিবর্তে কল্পনার জগতেই বিচরণ করতো। এমনো দেখা যায় ইউরোপ আমেরিকার বিশিষ্ট জন এমন কি রাষ্ট্র চালনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এক ধরনের ভ্রান্তি-বিলাসে ভুগতেন। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতেন সভাসদ বা উপদেশকের দল। তখনকার সিআইএ, কেজিবি বা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টগুলো ছিল একপেশে, অনুমাননির্ভর আর সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালে সিআইএ’র নথিপত্র প্রকাশের নামে দেশের একটি প্রিন্ট মিডিয়া একদিকে দালালী, অন্যদিকে স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐ রিপোর্টগুলো খতিয়ে দেখলেও এটা স্পষ্ট হয়ে পড়বে, আমেরিকার মত শক্তিধর দেশের হাতেও একাত্তরে পর্যাপ্ত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না। ভারতবর্ষ বিষয়ে তাদের ধারণা ছিল অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াসা। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর সে ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হলে আমেরিকা চটে যায়। তখনো তারা আমাদের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। এ কথা বলা যেতেই পারে, এখনকার মত অবাধ তথ্য প্রবাহ আর খোলা দুনিয়া থাকলে হয়তো সে জাতীয় বৈরিতা বা শত্রুতাও হতো না। তাই বলছিলাম দুনিয়ায় এখন কোন কিছুই গোপন নেই। এই অগোপনীয়তা রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে বিপাকে ফেললেও জনগণ কিন্তু মজা পাচ্ছে, এনজয় করছে। সত্যি বলতে কি আগের দুনিয়ায় যে ভয়, লজ্জা বা অকারণ শ্রদ্ধার চাপ ছিল এখন আর তা নেই। এই না থাকার ফলে একদিকে যেমন ভীতি ও উদ্বেগ কমেছে অন্যদিকে জানার জানালা দিয়ে ঢুকছে নানা ধরনের ভীতিকর উপদ্রব। যে উপদ্রবের বলী আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের তরুণ-তরুণীরা। সাম্প্রতিককালে ঐশীকে নিয়ে কথাবার্তা, হৈ চৈ আর গুজবের অন্ত নেই। অতি উত্সাহীরা এজন্য বাংলা সিনেমা, হিন্দি সিনেমা, সিরিয়ালগুলোকে দায়ী করতেও দ্বিধা করেননি। দেখে অবাক হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হিন্দি মুভি বা সিরিয়াল বন্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। এ কথা বলি না, তাঁর ধারণা বা অনুমান ভ্রান্ত। কিন্তু তা যদি হয়েও থাকে তবে তা একশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। তার চেয়ে বেশি দায়ী মাদক, নেশা, নীল পর্দার জগত্, অবাধ ও খুলে যাওয়া দুয়ারে দেখা পৃথিবীর নগ্নতা। আমরা আমাদের তারুণ্যকে এটা শেখাই না। গ্রহণ-বর্জনে উদার সমাজ ব্যবস্থায় নগ্নতা ততটা আকর্ষণীয় নয়। যে সমাজে মানুষ যত শুচিবাই মুক্ত তার গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতাও তত বেশি। আমাদের সমাজকে প্রাগৈতিহাসিক আর সে কালের বানিয়ে তারুণ্যকে কম্পিউটার নির্ভর খোলা দুনিয়ায় ঠেলে দেয়াতেই আজ সামাজিক সমস্যা ভিন্ন আকার ধারণ করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক উত্পাত। রাজনৈতিক উত্পাত ও অস্থিরতা তারুণ্যকে কতটা উদভ্রান্ত-বিভ্রান্ত বা মারমুখী করতে পারে তা আমাদের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আজকের রাজনীতি যেহেতু অনেক কিছু গোপন রাখতে পারে না, তার উগ্র-কুিসত ভয়াল চেহারা যেহেতু উলঙ্গ হয়ে বেরিয়ে আসে আমরা কি তাকেও দায়ী করবো না? এই সেদিন প্রকাশ্য রাজপথে বিশ্বজিেক খুন হতে দেখেছে তারুণ্য। সে ভিডিও, সে ছবি বারংবার দেখানো হয়েছে মিডিয়ায়। কেন আমরা বলছি না রক্তাক্ত করার প্লটটা সেভাবেও মাথায় ঢুকতে পারে তরুণীর। সাংবাদিক দম্পতির খুনের রহস্য এখনো অজানা। কিনারা হয়নি গুম, হত্যা বা জখমের, ক্রশ ফায়ারের। যে যখন ক্ষমতায় রাজনীতি তখন তার প্ররোচনা বা উস্কানিতে অন্ধ। সে অন্ধত্ব যখন খুন ও খুনীকে প্রশ্রয় দেয়; তারুণ্য ভাবতেই পারে, আমি করলে দোষ কোথায়? তারা এটাও ভেবে নিতে পারে, এরপরও কিছু হবে না। এদেশে খুনের বিচার হয় না। এই যে অপবিশ্বাস আর ড্রাগের স্রোত একে পশ্চিমা উন্মাদনা বা পুঁজিবাদের চাপিয়ে দেয়া বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না। যদি তা হয়ও এর মোকাবেলা জরুরি। আমরা ভাবি ধর্মীয় নৈতিকতায় এ জাতীয় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। ধর্মের নামে যে উন্মাদনা বা রক্তপাত তাতে তো সে আশাও ফিকে হতে বসেছে। সে জন্যেই বলছিলাম, আমাদের জাতীয় চরিত্র, মানসিকতা আর ইমেজ ঠিক না হলে অচিরেই আরো এক কালো অভিধা বা জঘন্য বিশেষণ যোগ হতে পারে। খুলে যাওয়া দুনিয়ায় বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোন দেশ নয়। তার সব কিছুই এখন প্রকাশ্য, গত কয়েক মাস এত রক্তপাত, উত্তেজনা, খুনোখুনি আর শেষ অবধি সন্তানের হাতে মাতা-পিতার লাশ হয়ে যাওয়ায় দুনিয়া হতভম্ব। খুব যে গর্ব করে আমরা গাই ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি’ সে গানটিও কিন্তু উল্টো অর্থ নিয়ে দাঁড়াবে বিশ্ববাসীর সামনে। তখন আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম পড়বে আরো এক সন্দেহের গ্যাঁড়াকলে। নাফিস যা করতে পারেনি খুনী ইমেজের ভুল ব্যাখ্যা তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করবে। এই তারুণ্যকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিতে হবে। বাঁচাতে হবে। রাজনীতিকে সামাল দিতে হবে। দেশ ও জাতির শুদ্ধ পরিশ্রমী ইমেজ তুলে ধরতে হবে। এই যে এত ‘হবে’ ‘হবে’ করার দায় কার? কারো কি সময় আছে আদৌ? কি যে হবে আমাদের। (সিডনি থেকে)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন