সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন মানিয়া নেওয়া যায় না

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৭
কয়েকদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা কোন রাখঢাক না করিয়া বলেন যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য সংখ্যালঘুরা ঝুঁকিতে রহিয়াছে। তাহাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হইবে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আমরা তাহার বক্তব্য ও উদ্বেগের সহিত সম্পূর্ণ একমত। ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমরা এ বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখিলেও গুরুত্বের কারণে আবারও এই বিষয়ে না লিখিয়া পারিতেছি না। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময় ও ইহার পর যতগুলি সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ও সংঘাত সৃষ্টি হইয়াছে এই উপমহাদেশে, তাহার প্রধানতম কারণ রাজনৈতিক, ধর্মীয় নহে। অসত্ রাজনৈতিক সুবিধাভোগী, লোভী ও চতুর লোকেরা বরাবরই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করিয়া আসিতেছে। বিশেষত সাধারণ নির্বাচন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার সময় তাহারা সুযোগসন্ধানী থাকে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ লইয়া চট্টগ্রামের রামু বৌদ্ধ মন্দিরে ন্যক্কারজনকভাবে হামলা করা হইয়াছে। সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, বরিশাল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর নগ্ন হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। ভাঙচুর চালানো হইয়াছে তাহাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে। এসব হামলার ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ইহার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক ও সচেতন নাগরিকদের সতর্ক থাকিতে হইবে। ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলিয়াছেন, ‘ আমি এ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ করিয়াছি। ইহা একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দেশ। এখানকার মানুষের মধ্যকার সমপ্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য।’ তাহার এই মূল্যায়ন যথার্থ। কেননা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আবহমানকাল হইতে সকলের সহিত শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করিয়া আসিতেছে। লক্ষণীয়, আমাদের সংবিধানে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটিই নাই। আছে ‘উপজাতি’ প্রসঙ্গ এবং নাগরিক হিসাবে সকলের সমান অধিকারের স্বীকৃতি। তাহার পরও যখন বিচ্ছিন্নভাবে কোন অঘটন ঘটে, তখন তাহার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করিয়া দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এই ব্যাপারে বর্তমান সরকার প্রধানের দৃঢ় মনোবল রহিয়াছে। কিন্তু সমস্যা হইল স্থানীয় নেতা বা পাতি নেতাদের নিয়া। তাহারা অনেক সময় এই ধরনের অপরাধ দেখিয়াও না দেখার ভান করিয়া থাকে বা কখনও কখনও থাকে তাহাদের নিজেদেরই সম্পৃক্ততা। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও পৃষ্ঠপোষকতা পাইয়া থাকে দুর্বৃত্তরা। এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার থাকে মৌন সমর্থন। দেখা যাইতেছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের বা বিভিন্ন দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হইলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হইতেছে। প্রধান নির্বাহীর চাইতে আর কাহারা প্রভাবশালী হইতে পারে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। যাহা হউক, আমাদের মনে রাখা উচিত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বা কোন প্রকার হামলা বিশ্ব সমপ্রদায় বরদাশত করিবেন না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, জাতিসংঘ সনদ ও ঘোষণার মাধ্যমে তাহাদেরকে সুরক্ষা দেওয়া হইয়াছে। যেমন-১৯৪৮, ১৯৬৬, ১৯৮৯ ও ১৯৯২ সালের জাতিসংঘের সনদ বা ঘোষণা। তাহাছাড়া বর্তমানে মিডিয়া ও তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী এমন একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা গ্রামে পরিণত হইয়াছে যে, তাহাদেরকে আর ফাঁকি দেওয়া যায় না। তাহারা আমাদের কর্মকাণ্ডের ওপর সহজেই সার্বক্ষণিক তীক্ষ্ন নজর রাখিতেছেন। সুতরাং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হইবে আর সরকার নির্বিকার থাকিবে, এই ধরনের ভুল করিবার কোন অবকাশ নাই। সর্বোপরি একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে এই ধরনের পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন