যানজট নিয়ে মনে হয় নতুন করে কিছু বলার নেই। দেশের বড় বড় শহর বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজটের তীব্রতা প্রকট। এর কবলে পড়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের মূল্যবান সময় হারাচ্ছে । গাড়ি চলার জন্য যতটা জ্বালানির প্রয়োজন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জ্বালানি অকারণে পুড়ছে। বাতাসে কার্বনসহ ক্ষতিকর পদার্থ মিশে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। যানজটে আটকে পড়া এ্যাম্বুলেন্সে মুমূর্ষু রোগীর আর্তনাদ, অগ্নি নির্বাপন কিংবা অন্য কোন জরুরি কাজে নিয়োজিত গাড়ির করুণ হর্ণ কোন কিছুকেই পরোয়া করে না যানজট নামের এই দানবটা। সবার এখন একটাই জিজ্ঞাসা, এর কবল থেকে রক্ষার কি কোন উপায় নেই? আছে।
কোন কারণে যখন এক বা একাধিক গাড়ি রাস্তার উপর থেমে থাকে তখন যানজটের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে যানজট সৃষ্টির প্রধান কারণ হলো রাস্তার মোড়ে গাড়ি থামানো। প্রচলিত মোড় ব্যবস্থাপনায় একটি গাড়িকে চলার জন্য অন্য গাড়িকে থামিয়ে দেয়া হয়। ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। উদাহরণ স্বরূপ 1 নং চিত্র (Figure-1) এর কথা ধরা যাক। এখানে 1,2,3 ও 4 নং রাস্তা এসে একটি মোড়ে মিলিত হয়ে চৌরাস্তা গঠন করেছে। প্রতিটি রাস্তা বা রোড আবার লেন A ও লেন B তে বিভক্ত। লেন A দিয়ে গাড়ি মোড়ে প্রবেশ করে। আর লেন B দিয়ে মোড় ত্যাগ করে। এই মোড়ে মোট ৮টি লেন আছে। প্রতিটি লেন আবার একাধিক সাব লেনেও বিভক্ত থাকতে পারে। যখন 1 নং রাস্তার A লেন চালু থেকে বিভিন্ন রোডে গাড়ি প্রবেশ করে তখন অন্য তিনটি রাস্তা দিয়ে গাড়ি মোড়ে প্রবেশ করতে পারে না। তাদেরকে পুরোপুরি থেমে থাকতে হয়। একইভাবে যখন 2 নং রোড দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করে তখন 1,3 ও 4 নং রোড দিয়ে কোন গাড়ি মোড়ে প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ১টি রাস্তায় গাড়ি প্রবেশ করলে অন্য ৩টি রাস্তায় গাড়ি জমা হয়। অর্থাত্ ১ গুণ গাড়ি মোড় অতিক্রমের সুযোগ পেলে ৩ গুণ গাড়ি রাস্তায় জমা হয়। ফলে যানজট চক্রাকারে বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এর সমাধান হচ্ছে— ১। প্রচলিত বিপজ্জনক মোড় (Danger Cross) বন্ধ করতে হবে। এজন্য ১ নং চিত্রের (Figure-1) প্রচলিত মোড়কে ২ নং চিত্রের (Figure-2) মত মোড়ে রূপান্তরিত করতে হবে। ২। মোড় থেকে কিছু দূরে (১ কিমি, ১/২ কিমি বা অন্য কোন সুবিধাজনক দূরত্বে) একমুখি প্রশস্ত U টার্ন তৈরি করতে হবে। এই U টার্ন এর মধ্য দিয়ে গাড়ি শুধু লেন A থেকে B অথবা B থেকে A তে যেতে পারবে। উভয়টিতে যেতে পারবে না। কোন গাড়ি যদি ডানদিকে কিংবা বিপরীত দিকে ঘুরতে চায় তবে তাকে শুধুমাত্র U টার্ন এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিভাজক (Road Divider বা Island) বিশিষ্ট কোন দীর্ঘ রাস্তার মাঝে মাঝেও এই U টার্ন তৈরি করা যেতে পারে। ৩। দুইটি Runway (লেন) যখন একে অপরের সাথে মিলিত হয় তখন তারা পরস্পর সমান্তরাল ভাবে মিলিত হবে।
ধরা যাক একটি গাড়ি X. উহা 3 নং রোডের A লেন থেকে 4 নং রোডের B লেনে যেতে চায়। এক্ষেত্রে গাড়িটি 3A থেকে প্রথমে 2B লেনে প্রবেশ করবে। 2B লেনে 1A থেকেও গাড়ি আসবে। এখানে 3A ও 1A থেকে আগত গাড়িগুলো 2B তে পরস্পরের সাথে সমান্তরালভাবে মিলিত হবে বলে একের গতিবেগ অন্যের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না। এবার X গাড়িটি উহার সমান্তরালে চলমান অন্য গাড়ির সাথে গতিবেগের পার্থক্য তৈরি করবে। ধরা যাক অন্য গাড়িটির গতিবেগ ১৮ ফুট/ সেকেন্ড (প্রায় ২০ কি.মি./ঘণ্টা)। এখন X গাড়িটিকে কিছুক্ষণের জন্য এই গতিবেগের চেয়ে কম বা বেশি গতিতে চলতে হবে। ধরা যাক তার গতিবেগ ১৪ ফুট/ সেকেন্ড ( প্রায় ১৬ কিমি/ ঘণ্টা)। তাহলে X গাড়িটি ও অন্য গাড়িটির মধ্যে ১ সেকেন্ডে আপেক্ষিক দূরত্ব সৃষ্টি হবে ১৮-১৪= ৪ ফুট। ২ সেকেন্ডে আপেক্ষিক দূরত্ব সৃষ্টি হবে ৪২=৮ ফুট। ৩ সেকেন্ডে আপেক্ষিক দূরত্ব সৃষ্টি হবে ৪৩=১২ ফুট। একই ভাবে ৪,৫,৬,৭,৮,৯,১০,১১ ইত্যাদি সেকেন্ড পর আপেক্ষিক দূরত্ব সৃষ্টি হবে যথাক্রমে ১৬,২০,২৪,২৮,৩২,৩৬,৪০ ও ৪৪ ফুট। এখন দেখা যাচ্ছে ১১ সেকেন্ড পর গাড়িদ্বয়ের আপেক্ষিক দূরত্ব ৪৪ ফুট। এই ৪৪ ফুট থেকে অপর গাড়িটির দেহের দৈর্ঘ্য বাদ দিলে অবশিষ্ট দূরত্বই হবে X গাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গা। যেমন অপর গাড়িটির দৈর্ঘ্য ২০ ফুট হলে X গাড়িটির সামনে ফাঁকা জায়গা দাঁড়াবে ৪৪-২০ = ২৪ ফুট। এই ২৪ ফুট ফাঁকা জায়গার মধ্য দিয়ে X গাড়িটি উহার প্রয়োজনীয় সংকেত প্রদান পূর্বক চলমান অবস্থায় ক্রমশ ডান দিকে চাপতে থাকবে। এরপর সেটা সম্মুখের U টার্নের মধ্য দিয়ে গতিমুখ পরিবর্তন করে 2A লেনের ডান দিকে প্রবেশ করবে। অতঃপর সেটা পূর্বের মতো গতিবেগের পার্থক্য ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় সংকেত প্রদান পূর্বক ক্রমান্বয়ে বামদিকে চাপতে থাকবে। শেষে সামনের মোড়ে এসে সরাসরি 4B লেনে প্রবেশ করবে।
যানজট নিরসনের জন্য সাধারণত উড়াল সেতু, বিকল্প রাস্তা, পার্শ্ব রাস্তা, পাতাল পথ, মেট্রো রেলপথ ইত্যাদি তৈরি করা হয়। এসব তৈরি করতে বিপুল অংকের অর্থ, সময় ও ভূমি প্রয়োজন হয়। বিনিময়ে যানজট নিরসনে এগুলো কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে কিংবা আদৌ কোন ভূমিকা রাখতে পারছে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু আমার প্রস্তাবিত পদ্ধতি অনুসরণ করলে আশা করা যায়, নগণ্য যোগানের বিনিময়ে স্বল্প সময়ে রেল ক্রসিং পয়েন্ট ব্যতীত সম্পূর্ণ নগরী যানজট মুক্ত হবে। এক সেকেন্ডের জন্যও থামতে হবে না কোন গাড়িকে। তদুপরি নিম্নলিখিত আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে।
ক) জ্বালানি সাশ্রয় হবে খ) পরিবেশ দূষণ কমবে গ) সড়ক দুর্ঘটনা কমবে ঘ) রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ লাগবে না ঙ) যানবাহনে স্বস্তি ফিরে আসবে।
লেখক :প্রকৌশলী
