সিরিয়ায় সামরিক হামলায় কেন বেপরোয়া মনোভাব

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:০৯
সিরিয়ার উপরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্রদের হামলা বলিতে গেলে একেবারে যখন-তখনের ব্যাপার হইয়া উঠিয়াছে। মার্কিন জনমত হামলার বিরুদ্ধে, ফ্রান্সের জনগণও হামলার বিরুদ্ধে, হামলার প্রস্তাব ভোটে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে। তবুও হামলার ঝুঁকি থাকিয়াই যাইতেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ আসলে কি চাহিতেছে? বুশ-ব্লেয়ার যাহা করিয়াছিলেন ওবামা-ক্যামেরন মিলিয়া তাহা করিবার একটি চেষ্টা শুরু করিয়াছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্যদের সমর্থন না পাইয়া কিছুটা হুঁশ হইয়াছে ক্যামেরনের। তিনি দৃশ্যত পিছু হটিয়াছেন। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের হুমকি-ধামকি অব্যাহত রহিয়াছে। কিন্তু কেন? যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্ররা গত সপ্তাহে সিরিয়াতে বেসামরিক জনগণের উপরে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার হইবার দাবি তুলিয়াছে এবং এহেন জঘন্য কার্যের জন্য ক্ষমতাসীন বাসার আল আসাদের বাহিনীকে দায়ী করিয়াছে। পক্ষান্তরে, সিরিয়াতে সরকারি বাহিনী কোন ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহূত করে নাই বলিয়া দাবি করিতেছে আসাদ সরকার। আসাদ সরকার বরং গত মে মাসের একটি হামলাতে সরকার-বিরোধীরা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করিয়াছে বলিয়া দাবি করিতেছে। দেখা যাইতেছে যে, রাসায়নিক অস্ত্র আদৌ ব্যবহার হইয়াছে কিনা এবং ব্যবহার হইয়া থাকিলে কাহারা ব্যবহার করিয়াছে তাহা লইয়া চটজলদি উপসংহারে পৌঁছানো কোনভাবেই সম্ভব নহে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এই কাজটিই করিতেছে। মার্কিন প্রশাসন এই দাবিও করিতেছে যে, তাহাদের হাতে রাসায়নিক হামলা ও আসাদ বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রহিয়াছে। এই সমস্ত কথাবার্তার মধ্যে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষেরা ২০০৩ সালে ইরাক হামলার পূর্ববর্তী দিনগুলিতে প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাহার দোসরদের মিথ্যা প্রমাণ-পত্র লইয়া দৌড়ঝাঁপের চিত্রই দেখিতে পাইতেছে। জাতিসংঘের একটি অস্ত্র পরিদর্শক দল শনিবার সিরিয়াতে পরিদর্শন কার্য শেষ করিয়াছেন। তাহারা হামলাস্থল হইতে আক্রান্তদের রক্ত, টিস্যুর নমুনা, মাটি, আক্রান্তদের পরিধেয় বস্ত্র, রকেটের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করিয়াছেন। সংগৃহীত নমুনাগুলি ইউরোপের, যথাসম্ভব সুইডেন বা ফিনল্যান্ডের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া দুই সপ্তাহের মাথাতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার অথবা ব্যবহার না হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাইবে। তবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার হইলেও কাহারা ব্যবহার করিয়াছে সে ব্যাপারে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে কাজে লাগিবে না তাহা বলাই বাহুল্য। মোটকথা সময় লাগিবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দেখাই যাইতেছে যে, ধৈর্যহীন হইয়া পড়িয়াছে। কোন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘে যে ধরনের নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে যাইতে হয় সে ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন এতটুকু অবগত আছে বলিয়াও মনে হইতেছে না। আগামী সপ্তাহে সেইন্ট পিটার্সবার্গে উন্নত দেশগুলির গ্রুপ জি ২০ সম্মেলন শুরু হইবে। এই সম্মেলনটি সিরিয়া বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যবহার করা যাইতে পারে। কিন্তু এই সুযোগটি ব্যবহারের ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রকে এতটুকু আগ্রহী বলিয়া মনে হইতেছে না। বরং আসাদ বাহিনীই যে রাসায়নিক হামলা চালাইয়াছে এই ব্যাপারটিই প্রচণ্ড প্রতাপে প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিতেছে তাহারা। পশ্চিমা দুনিয়ার মূলধারা মিডিয়াগুলির কম-বেশি প্রত্যেকে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যকেই অধিক গুরুত্ব প্রদান করিতেছে। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা লিবিয়াতে হামলার ভুল হইতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এতটুকু শিক্ষা লইয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে না। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে একটি মাত্র পক্ষের ভুলের মাশুল সারা বিশ্বকে বারংবার কেন গুনিয়া যাইতে হইবে? একমেরু বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ‘বিশ্ব পুলিশ’ হিসাবে অধিষ্ঠিত করিতেছে। কিন্তু ইহার কোন প্রয়োজনীয়তা নাই; আর এহেন ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবার জন্য যে গ্রহণযোগ্যতা থাকা দরকার তাহা দেশটির একেবারেই নাই। আসাদ বাহিনী নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যাহা করিতেছে তাহা কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি আল-কায়েদার মত প্রতিষ্ঠানের সমর্থনপুষ্ট হইয়া সিরিয়ার সরকারবিরোধীরা যাহা করিতেছে তাহা সমর্থন করা যায়কি? সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর উপরে হামলা চালানো হইলে মার্কিনীরা আল-কায়েদাকে পাশে পাইবে! বিশ্ববাসী এই চিত্র দেখিবার জন্য প্রস্তুত আছে কি?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন