ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মর্মান্তিকভাবে নিহত হইয়াছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফুরকান উদ্দিন সেলিম। গুরুতরভাবে আহত হইয়াছেন বেশ কয়েকজন। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার ধোবাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নূতন ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রবেশ ও খাবার বিতরণকে কেন্দ্র করিয়া নিহত উপজেলা চেয়ারম্যানের সমর্থকদের সাথে গামারীতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক খানের সমর্থকদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আজিজুল হক খানের উপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এই হামলাকে কেন্দ্র করিয়া উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। চলে সংঘর্ষের প্রস্তুতি। সেই অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন অতিথি হিসাবে। ফলে উত্তেজনার আঁচ যেমন সকলেই পাইয়াছেন, তেমনি গুরুতর সংঘর্ষের আলামতও ছিল সুস্পষ্ট। সংঘর্ষ বাধিয়াছে বিকাল পাঁচটার দিকে। কিন্তু তাহার প্রস্তুতি চলিয়াছে কমপক্ষে তিন ঘন্টা যাবত্। এই সময়ে উভয়পক্ষই লোক জড়ো করিয়াছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে শত শত মানুষ। সর্বোপরি, সংঘর্ষটি যে আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত ছিল না প্রশাসন কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারিই তাহার সর্বাপেক্ষা বড়ো প্রমাণ। প্রশ্ন হইল, ১৪৪ ধারা জারির পরও প্রাণঘাতী এই সংঘর্ষ সম্ভব হইল কিভাবে? দীর্ঘ প্রস্তুতি লইয়া দুই পক্ষ যখন খুনোখুনিতে লিপ্ত হইয়াছে, প্রশাসন ও পুলিশ তখন কী করিয়াছে? ইহাও কি আমাদের বিশ্বাস করিতে হইবে যে, ১৪৪ ধারা বলবত্ করার অর্থ ও গুরুত্ব সম্পর্কে তাহারা অবহিত নহেন?
ইহা স্পষ্ট যে, ১৪৪ ধারা জারি করা হইলেও তাহা যথাযথভাবে কার্যকর বা বাস্তবায়ন করা হয় নাই। হইল না কেন? উত্তর যাহাদের দেওয়ার কথা, তাহারা এখন নানা অজুহাত দেখাইতেছেন। নিজ নিজ দায় ও দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করিতেছেন নানাভাবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, ১৪৪ ধারা কার্যকর করার জন্য— গুলি হইতে শুরু করিয়া মাইকিং পর্যন্ত— যাহা যাহা করা দরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ তিনি দিয়াছেন। জেলা পুলিশ সুপার বলিয়াছেন যে, সেই আদেশের কপি তিনি সময়মতো পান নাই। ফলে প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটিয়াছে। জেলা প্রশাসকের বক্তব্যও ভিন্ন নহে। তিনি জানাইয়াছেন যে সময়ের অভাবে ময়মনসিংহ হইতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ পৌঁছাইতে দেরি হইয়াছে। তাঁহার মতে, পুলিশের স্বল্পতার কারণেই সমস্যা হইয়াছে ১৪৪ ধারা বাস্তবায়নে। মোবাইল ও ইন্টারনেটসহ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তাহাদের এই অজুহাত কতোখানি গ্রহণযোগ্য—সেইটা তাহারাই ভালো বলিতে পারিবেন। সর্বোপরি, তাহাদের উপস্থিতিতেই সেইখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়া মারমুখী শত শত লোক জড়ো হইয়াছে উপজেলা সদরে। এমতাবস্থায়, যতো অজুহাতই দেখানো হউক না কেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে এই ঘটনার দায় এড়ানো সম্ভব নহে। একই সাথে প্রশাসনের যিনি প্রধান নির্বাহী এই ব্যর্থতার দায় তাহার উপরও বর্তায় বৈকি।
ইহা অনস্বীকার্য যে, প্রশাসন যদি যথাযথভাবে ১৪৪ ধারা কার্যকর করিত তাহা হইলে এই দুর্ভাগ্যজনক প্রাণহানি ও রক্তপাত যেমন এড়ানো যাইত, তেমনি ইহাকে কেন্দ্র করিয়া সমগ্র ধোবাউড়া উপজেলায় যে-আতঙ্কজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছে তাহাও পরিহার করা সম্ভব হইত। তবে শুধু প্রশাসনই যে তাহাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইয়াছে তাহাই নহে, জনগণও আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়াছে। দায়িত্বশীল নাগরিকমাত্রই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে এই কথা আরো বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে আইন না মানাটাই যেন রীতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যিনি যতো ক্ষমতাবান, আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির প্রতি তোয়াক্কা না করার প্রবণতা তাহার ততো বেশি। যতদিন এই আত্মঘাতী মানসিকতার পরিবর্তন না হইবে, ততদিন এই ধরনের হানাহানি হইতে পরিত্রাণের আশা সুদূরপরাহত।
