সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেন। আসাদ যে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়, বারাক ওবামার এমন অবস্থানের পর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে ব্রিটেনের সিদ্ধান্তটি আমেরিকার জন্য একটি শক্ত আঘাত বটে। যদিও ২০১১ সালের আগস্টে ওবামা স্পষ্টতই বলেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট আসাদকে সরে দাঁড়াতেই হবে, তবে এ কথার পাশাপাশি সেসময় তিনি সিরিয়ার একনায়কতন্ত্র তথা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন দিতেও খুব বেশি উত্সাহ দেখাননি। এর এক বছর পর ২০১২ সালের আগস্টে, আসাদ যখন তার ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার পাশাপাশি নৃশংসতা বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে দেশটিকে পুরোমাত্রায় গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছেন, তখন বারাক ওবামা ঘোষণা করেন— আসাদ যদি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেন তবে সেটা হবে তার সীমা লংঘনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ। এই ঔদ্ধত্যের চরম সীমা লংঘন করলে তার পরিণতি হবে মারাত্মক। এ কথার ঠিক এক বছর পরে ওবামা-কথিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেন আসাদ। ব্যবহার করেন প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্র। সিরিয়ার বিদ্রোহী এলাকায় এই রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়।
এমন ঘৃণ্য ও নির্লজ্জ আক্রমণের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট আসাদ তার বিদ্রোহীদের কাছে এই গূঢ় বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন যে—রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েও বিদ্রোহীদের ওপর তা প্রয়োগ করতে পারে আসাদ, এবং এর পরও বিদ্রোহীদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে পারবে না এই সময়ের অথর্ব আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়। একই সঙ্গে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সময়ক্ষণটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর সীমা লংঘনের যে ‘রেড লাইন’টি ওবামা একবছর পূর্বে ঘোষণা করেছিলেন, তার বর্ষপূর্তির কাছাকাছি সময়েই আসাদ সেই চূড়ান্ত সীমা লংঘন করেন ঔদ্ধত্যের সঙ্গে। ওবামার জন্য এটিও আঁঁতে ঘা লাগার মতো।
আসাদের ওপর ‘ব্যবস্থা’ নিতে ওবামা পড়েছেন উভয় সঙ্কটে। রাশিয়ার নিরন্তর বিরোধিতায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই ওবামা যদি সিরিয়ার ওপর কোনো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উদ্যোগী হন, তাহলে তিনিও তাঁর পূর্বসূরী জর্জ ডাব্লিউ বুশের আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন দোষের কাতারে অভিযুক্ত হবেন। বুশ একতরফাভাবে আগ্রাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে ওবামা নিজেও তার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। একইসঙ্গে, ওবামা যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি আসাদের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, তাহলে তিনি এই সমালোচনার শিকার হবেন যে, বৈশ্বিক প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তিমত্তার প্রশ্নে হেরে গেছে আমেরিকা।
ওবামার প্রশাসন জানাচ্ছে যে, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পর সিরিয়ায় কিছু একটা ব্যবস্থা নেওয়া ওবামার জন্য অনিবার্য হয়ে গেছে, কেননা আসাদের বিদ্রোহী শক্তি ও তাদের সমর্থকদের ভেতরে ইতোমধ্যেই আমেরিকার পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর সৃষ্টি হয়েছে গভীর প্রত্যাশা। এর ব্যত্যয় ঘটলে তার ফলাফল হবে অধিক হতাশার। ওবামা অভিযুক্ত হবেন প্রতিজ্ঞাভঙ্গের। তাই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই অসঙ্গত প্রতাশার উদ্দীপনা প্রশমিত করতে আসাদ সরকার ও তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ওবামা আগাম নোটিসে বলেছেন, সীমিত পরিসরে হলেও সমরাভিযান চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
অপরদিকে নির্বিশেষে যা ঘটছে তাকে দামেস্ক তাদের বিজয় বলেই ঘোষণা করছে। আমেরিকার নেতৃত্বে যদি সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো হয়, তাহালে আসাদ সরকার এই কথা বলে তাদের বিজয় দাবী করবে যে, তারা বিদেশী আগ্রাসন প্রতিহত করেছে এবং নস্যাত্ করতে পেরেছে পশ্চিমাদের পরিকল্পনা। আসাদের এই কথিত বিজয়ের প্রপাগান্ডা ছড়ানোর যন্ত্র ইতিমধ্যেই মঞ্চে আসীন হয়েছে। আরো খারাপ দিক হলো, যদি কোনো আক্রমণ না চালানো হয় তাহলে আসাদ সরকার তার শক্তিমত্তার দম্ভে ফেটে পড়বে এবং ঘোষণা করবে আমেরিকার কর্তৃত্বের অবসানের কথা। শাস্তি হিসেবে নিজের জনগণের ওপরই প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আসাদ সরকার বলা যায় প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রচারণাকৌশলে জয় অর্জন করছে।
ওবামা এখন একটি ফাঁদে পড়ে গেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন প্রধান নেতা হিসেবে বিরাজিত থাকার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হারানোর একটি জটিল সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের বিবৃতি অনুযায়ী পরিচালিত হতে না পেরে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন নিজের নেতৃত্বের যোগ্যতাকেই। কী অদ্ভুত এক বিব্রতকর অবস্থার ভেতরে ওবামা জড়িয়ে পড়েছেন যে, সিরিয়ার বিবাদ থেকে নিজেকে তিনি দূরে সরিয়ে রাখলে বিবাদ জিনিসটি তাঁর ঘাড়েই এসে পড়বে। বস্তুত, সিরিয়ার এই যুদ্ধ আগামী প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে ইসলামী মৌলবাদে, যা আরো বেশি প্রাণের ধ্বংসের কারণ হবে। এই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বলে দেয়, এসব ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিহত করতে স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রকে আরো সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে।
ভাষান্তর :অদ্বয় দত্ত
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল তহবিলের সিনিয়র ট্রান্সআটলান্টিক ফেলো
