কয়লা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৫
একটি সুন্দর জীবনমান অর্জনে অবশ্যই একটি নির্ভরযোগ্য, অবিচ্ছিন্ন অব্যাহত বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নিরুত্সাহিত করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র প্রাধান্য পাচ্ছে। ইতিমধ্যেই আমাদের আবিষ্কৃত কয়লার পরিমাণ আড়াই হাজার মিলিয়ন মেট্রিক টন যা প্রায় ৬০ টিসিএফ গ্যাসের সমান। অথচ এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসের পরিমাণ ১০-১১ টিসিএফের মত। অর্থাত্ আমাদের মজুদ কয়লার পরিমাণ গ্যাসের প্রায় ৬ গুণ বেশি। কয়লা নীতি এবং উত্তোলন বিলম্বের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। পৃথিবীর সবদেশেই গ্যাস সংরক্ষণ করা হচ্ছে গৃহস্থালি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য। সার পরিবহন, শিল্প-কারখানার জন্য গ্যাস অপরিহার্য। পরিবহন জ্বালানির জন্য গ্যাসের কোন বিকল্প নেই। সার উত্পাদন, পরিবহন এবং শিল্পখাতের জন্য গ্যাস সংরক্ষিত রেখে বিদ্যুতের জন্য আমাদের কয়লা উত্তোলনে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। এমনকি যেসব দেশে কয়লা নেই সেসব দেশও অন্য দেশ থেকে কয়লা আমদানি করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র গড়ে তুলছে। যেমন- মালয়েশিয়া,অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত কয়লার উপর নির্ভর করে কুয়ালালামপুরের অদূরে আড়াই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। সারাবিশ্বে এখনও প্রায় ৭০ ভাগ বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে কয়লা থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯২ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৭৯ শতাংশ, চীনে ৭৮ শতাংশ, ভারতে ৬৯ শতাংশ, জার্মানীতে ৪৯ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে কয়লা থেকে। অন্যদিকে আমাদের কয়লা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন মাত্র ৪ শতাংশ। শত শত টিসিএফ গ্যাস দেশগুলো যন্ত্রের সংগে সংরক্ষিত রাখছে। আমাদের উত্তোলিত গ্যাসের ৫০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে বিদ্যুত্ উত্পাদনে যা আমাদেরকে একটি নিশ্চিত আত্মঘাতী পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীব জরুরি ভিত্তিতে কয়লানীতি প্রণয়ন করে বিদেশি বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে দেশি সংস্থা দ্বারা কয়লা উত্তোলন করে আগামী ৫০ বছর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত্ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। শক্তির নিরাপদ সরবরাহ ও বিতরণ প্রশ্নটি সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে রুগ্ন উত্পাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি এবং সম্ভব। অযোগ্য নেতৃত্ব, সীমাহীন কুক্ষিগতকরণ, দুর্নীতি ও লালসার পথ থেকে উত্তরণ সম্ভব। দেশের বাকি ৫৬ ভাগ জনগোষ্ঠিকে বিদ্যুত্ সুবিধার বাইরে রেখে রূপকল্প বা উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিষয়টি আমাদের সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনে ঘড়ির কাঁটার মত নিরলস কাজ করে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে এবং এটি খুবই সম্ভব। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত অর্থায়নে বড় বিনিয়োগটির জন্য কাজ করে যেতে হবে। আইজিসিসি : ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কমবাইন্ড সাইকেল (IGCC) কয়লা থেকে একটি বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রক্রিয়া যা কয়লাকে সিনথেটিক গ্যাস-এ (Syngas) রূপান্তরিত করে একটি গ্যাস টারবাইনকে শক্তি যোগায়। গ্যাস টারবাইন থেকে উত্পন্ন তাপ স্টীমকে শক্তি যুগিয়ে চালু করে স্টিম টারবাইন। স্টীম টারবাইন জেনারেটরের মাধ্যমে সঞ্চালন লাইনে সংযুক্ত থাকে। বিশ্বব্যাপী কয়লা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ব্যতিরেকে কয়লা জ্বালানো আজকের পৃথিবীর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ধরা হয় (Clean coal) পরিশোধিত কয়লা। এই প্রক্রিয়ায় কয়লা থেকে হাইড্রোজেন ও পানি এবং পরে অবশিষ্টসমূহকে ভূ-গর্ভস্থকরণ ও হাইড্রোজেনকে পুড়িয়ে ফেলা বুঝায়। পারমাণবিক শক্তির উত্পাদন খরচের সঙ্গে ক্লিন কোল প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের জন্য চলছে বিশ্বব্যাপী অবিরাম প্রচেষ্টা। কারণ কয়লা বিশ্বব্যাপী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহজপ্রাপ্য জীবাশ্ম জ্বালানি। সত্যিকার অর্থেই কয়লা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক তাপ শক্তি সংস্থার হিসেবে ২০২০ সাল নাগাদ এর ব্যবহার ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। যদিও শুধুমাত্র কয়লা থেকেই প্রতিবছর ভূ-মণ্ডলে প্রায় ১২ বিলিয়ন টন কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে। মোট ২৮ বিলিয়ন টন কার্বন- ডাই অক্সাইড নিঃসরণের সিংহভাগই নিঃসরিত হচ্ছে বিদ্যুত্ উত্পাদনে কয়লার ব্যবহারে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের এই উষ্ণতা কমাতে উন্নত দেশসমূহ মরিয়া হয়ে লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যার মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ কমিয়ে আনা যাতে কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ শূন্য মাত্রায় নামিয়ে আনা যায়। উন্নত দেশসমূহ পানি দ্বারা কয়লা ধৌতকরণ পদ্ধতি কিছু সময়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এতে ছাই এবং সালফার-ডাই অক্সাইড কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে নানা সমস্যার কারণে এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। নিঃসৃত বর্জ্য থেকে উত্পাদনমুখী কিছু করার চিন্তা-ভাবনা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশগুলো ১৯৯৯ সালে তাদের ব্যবহূত কয়লার বর্জ্য থেকে অর্ধেক পরিমাণ কাজে লাগানোর পরীক্ষা- নিরীক্ষায় সফল হয়েছে। উড়ন্ত ছাই এবং নিচের বর্জ্য নিয়ে তারা গৃহনির্মাণের জন্য সিমেন্টের বিকল্প তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। ‘প্রি-কমবাশন পদ্ধতিতে (IGCC) ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কমবাইন্ড সাইকেল’ প্রযুক্তির সঙ্গে একট সিফট রি-একটার সংযোগের মাধ্যমে কার্বন মনোক্সাইডকে পানিতে দ্রবীভূত করা হয়। পরে প্রবাহ গ্যাসকে হাইড্রোজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইডে রূপান্তর করে এর সাথে কিছু নাইট্রোজেন কমবাশনের পূর্বেই যেহেতু কার্বন-ডাই অক্সাইড, হাইড্রো সালফাইড ও অন্যান্য মৌল আলাদা হয়ে যায় এবং থাকে শুধু হাইড্রোজেন যা জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত হয়। ঘন-জমানো কার্বন-ডাই অক্সাইড পরে তলানি হিসেবে থেকে যায় যাকে ভূ-গর্ভস্থ করার প্রয়োজন হয়। পাইপ লাইনের মাধ্যমে সমুদ্র তলদেশের ১ কিলোমিটার গভীরে প্রোথিত করতে হয়। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর জন্যে ব্যাপারটি জরুরি কিন্তু আরো জরুরি বিষয় হচ্ছে পাইপ লাইনটির নিরাপত্তা। ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার লেক নাইওস-এ ১৭শ’ লোকের করুণ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ। ক্যামেরুনের লেক মনোনেও অনুরূপ একটি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। এত কিছু সমস্যা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার উত্পাদনের অর্ধেক বিদ্যুত্ কয়লা থেকেই উত্পাদন করছে। গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের অর্ধেকই হচ্ছে কয়লা জ্বালানি থেকে। কিয়োটো প্রটোকল এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়ার পরও কিন্তু থেমে নেই গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ। আমেরিকার ৪৯২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষেত্রে গড়ে ৬৬৭ মে.ওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হয় অর্থাত্ আমেরিকা একাই প্রায় ১ বিলিয়ন টন কয়লা জ্বালিয়ে ৩ বিলিয়ন টন গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী। কানাডায় তেল মজুদ থেকে কয়লার মজুদ ৩ গুণ বেশি। বেশিরভাগ তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো কানাডার পশ্চিম প্রান্তে। ফলে কয়লা ক্ষেত্রগুলো থেকে নিঃসৃত কার্বন-ডাই অক্সাইড বা ছাই পাইপ লাইনের মাধ্যমে সমুদ্রগর্ভে বা গ্যাস ও তেল ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজনানুযায়ী পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আলবার্টা রাজ্যটির অবস্থানগত কারণেই কার্বন-ডাই অক্সাইড পরিবহন বা ভূ-গর্ভস্থকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। চীন একাই আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সম্মিলিত কয়লা ব্যবহারের চেয়ে বেশি কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। যদিও মজুদ কয়লার ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান আমেরিকা ও রাশিয়ার পরে। আবার বিগত বছরগুলোতে একমাত্র চীনই কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণে, পুরোপুরি ‘হট স্টিম’ পদ্ধতি ব্যবহারে সর্বোত্কৃষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে উত্পাদন খরচ সর্বনিম্নে নিয়ে আসতে সফল হয়েছে। শতকরা ৬০ ভাগ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র আধুনিকায়নের পথে চীন। চীন আধুনিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন এবং শূন্য কার্বন (Zero emmission) নিঃসরণে ক্রমেই এগিয়ে। উইন্ড এনার্জি, আল্টা সুপার ক্রিটিকেল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ‘হট স্ট্রিম’ উত্পাদন ও ব্যবহারে উত্কর্ষতা অর্জন এবং সারাবিশ্বের পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্রের সমপরিমাণ কেন্দ্র নির্মাণে একাই সফলতা দেখাচ্ছে চীন। সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ গণচীন থেকে কারিগরি সহায়তা নিয়ে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, উইন্ড এনার্জি, পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে।  লেখক :গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন