দারিদ্র্য হয়তো কাব্যকথায় কাউকে মহান বানাইতে পারে, শেষার্থে তাহা মানুষের মানসিকশক্তি নি:শেষিত করে নির্মমভাবে। তাহা এতটাই শেষ করিয়া দেয় যে, তাহার পক্ষে জীবনের বহুমাত্রিক দিক লইয়া চিন্তা করিবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিও আর অবশিষ্ট থাকে না। ইহা সম্পূর্ণত অনুমাননির্ভর কথা নহে, এমনটি জানাইয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, প্রিন্সটন ও ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তর আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দ। তাহাদের ধারাবাহিক কয়েকটি গবেষণার ফলাফল এই চিত্রই প্রকাশ করিয়াছে। গবেষকরা দেখিতে পাইয়াছেন, দারিদ্র্যের চক্রে পড়িয়া মানুষ যে মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়, তাহা মোকাবিলা করিতে তাহার বুদ্ধাঙ্কের প্রায় সবটুকুই খরচ হইয়া যায়। ফলে সহজেই তাহারা কাজকর্মে ভুল করিয়া থাকে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও ভুল হয় অহরহ। ইহাতে তাহাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা আরও বৃদ্ধি পায়। অর্থাত্ গবেষকরা মনে করিতেছেন, দুয়ারে দারিদ্র্য আসন পাতিলে তাহাতে শুধু অর্থের অভাবই দৃশ্যমান হয় না, বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যও ক্ষীণ হইয়া যায়।
ইহা স্পষ্ট যে, জীবনীশক্তি নি:শেষিত করিতে দারিদ্র্য এক ভয়ানক চক্রব্যূহ হইয়া ওঠে, যাহা হইতে বের হইবার বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য হ্রাস পায় ক্রমশ। কিছু দিন পূর্বে ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিক রাহুল গান্ধী বলিয়াছেন—দারিদ্র্য একটি মানসিক পরিস্থিতি। তিনি মনে করেন, আত্মবিশ্বাস থাকিলেই দারিদ্র্য জয় করা সম্ভব। কিন্তু শুধু আত্মবিশ্বাসে কি সত্যিই জয় করা সম্ভব দারিদ্র্যকে? দারিদ্র্য তো আত্মবিশ্বাসকেও নি:শেষিত করিয়া দেয়। প্লেটো হইতে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত জ্ঞানীরা যুগে যুগে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের আটকে পড়ার কারণ খুঁজিয়াছেন। দারিদ্র্যের বিষচক্রটিও স্পষ্ট। পিতা-মাতা যে শিশুকে অর্থের অভাবে স্কুলে পাঠাইতে পারেন না, তাহাকে শৈশবেই রোজগারের ব্যবস্থা দেখিতে হয় বৈকি। শিক্ষার সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইবার ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরেও একজন মানুষ তাহার অতি সীমিত যোগ্যতার ক্ষেত্র হইতে নামমাত্র রোজগার করিতেও ব্যর্থ হয় অনেক সময়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁহার শিশুরাও শিক্ষার সুযোগ হইতে বঞ্চিত থাকে। তাহা ছাড়া, শৈশবে ন্যূনতম পুষ্টির নিরন্তর ঘাটতি নিশ্চিতভাবেই শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। ফলে পরবর্তীকালে তাহার স্বাভাবিক বুদ্ধিবিকাশের ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত ঘটিতে দেখা যায়। জন্মের পর হইতে একটি দরিদ্র শিশু ইহাই শুধু শেখে— কীভাবে কোনোভাবে বাঁচিয়া থাকা যায় পেটেভাতে খাইয়া। একটি ইতর প্রাণীর মস্তিষ্ক যেমন সারা জীবনই ব্যয় হয় এই বেলা কি করিয়া খাইয়া বাঁচিবে, সেই চিন্তায়—দরিদ্র জনগোষ্ঠীও সেই ইতর প্রাণীর চিন্তার চক্রে আটকাইয়া যায়, তাহাদের জীবন হইয়া যায় মানব-ইতর। মানসিক শক্তি বিকাশের পথ রুদ্ধ হয় সব কিছু মিলিয়া। একমাত্র শিক্ষার আলোই তাহাদের এই চক্র হইতে উত্তরণ ঘটাইতে পারে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে সেই শিক্ষা ক্রয় করিবার সামর্থ্য থাকে না বিধায় রাষ্ট্র চেষ্টা করে যতদূর সম্ভব বিনামূল্যে শিক্ষার আলো প্রসারিত করতে। শুধু তাহাই নহে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ পাইলেই তাহা লুফিয়া লয় না। সেই মানসিক বিচার্যের ক্ষমতাও তাহাদের অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী হয়। তাই তাহাদের প্রলুব্ধ করিতে হয় অল্পবিস্তর খাদ্য বা অর্থগত সুবিধা দিয়া।
আপাতভাবে প্রতীয়মান হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠী শান্তিতে থাকে না। আবার ইহাও সত্য যে, তাহারা হয়ত বড় কোনো অশান্তিতেও থাকে, কারণ তাহার সংকুচিত বুদ্ধাঙ্ক বড় অশান্তির চূড়া স্পর্শও করিতে পারে না। বিপরীতে, যাহারা বিত্ত বৈভবের ভিতরে জীবন পার করেন, তাহাদের মানসিক শক্তি যতই থাকুক না কেন, বহুমাত্রিক জীবনের সহিত বহুমাত্রিক মানসিক চাপের পর্বতপেষণও অবধারিত থাকে।
