বেঙ্গল মিশনের সদস্য হয়ে যুগোস্লাভিয়া থেকে ১৯২৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে অ্যাগনেস শিক্ষকতার দায়িত্ব নিয়ে কলকাতায় আসেন। তাঁর পুরো নাম অ্যাগনেস গোনঝে বাইয়াঝিউ। জন্ম ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট, দক্ষিণ যুগোস্লাভিয়ার স্কপিয়েত শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন বহু ভাষাবিদ নিকোলাস বাইয়াঝিউ, মায়ের নাম ড্রানা বাইয়াঝিউ।
অ্যাগনেস ভারতে রওনা দেয়ার সময় শুধু সুখময় জীবনই ফেলে এলেন না, নিজের পৈত্রিক নামটা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে এলেন। মিশনারি জীবন শুরু করার সময় মহামান্য পোপের অনুমতিক্রমে তিনি নতুন নাম গ্রহণ করেন ‘তেরেসা’ পরে যা সবার মুখে মুখে হয়েছে ‘মাদার তেরেসা’। তেরেসা প্রথমে শিক্ষকতা শুরু করেন এন্টালি সেন্ট মেরি স্কুলে। এই স্কুলে ১৮ বছর শিক্ষকতার পর তিনি বদলি হয়ে আসেন লরেটো স্কুলে। এখানে আসার পর তাঁর জীবনে আসে এক বিরাট পরিবর্তন। লরেটো স্কুলের পাশেই ছিল মতিঝিল বস্তি, যেখানে কয়েক হাজার ছিন্নমূল ও ক্ষুধার্ত মানুষ বসবাস করত। স্কুল ছুটির পর কিংবা টিফিনের ফাঁকে কলা, রুটি, বিস্কুট হাতে তিনি প্রায়ই ছুটে আসতেন এই বস্তিতে। তিনি এসব খাবার বস্তির কঙ্কালসার ও উলঙ্গ ছেলে-মেয়েদের হাতে তুলে দিতেন। খাবার পেয়ে তারা ভীষণ খুশি হতো। তেরেসাকে দেখেই তারা দৌড়ে এসে ঘিরে ধরত, তাঁকে মা মা বলে ডাকত। এভাবেই তিনি একদিন হয়ে গেলেন সবার মা। মতিঝিল বস্তির দুস্থ মানুষকে সাহায্য করার কাজটি যেন তাঁর কাছে নেশার মতো হয়ে গেল। আর্তমানবতার সেবা করার জন্যই যেন তাঁর জন্ম হয়েছে। আজীবন এটাই তিনি করতে চান। এরপর সত্যি সত্যি তিনি সম্পূর্ণভাবে মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করার সংকল্পে লরেটো স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিলেন।
সারা ভারতে অগণিত কুষ্ঠরোগী দেখে তেরেসার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ভাবেন, এদের জন্যও কিছু করা দরকার। অবশেষে ১৯৫৮ সালে টিটাগড় রেললাইনের ধারে প্রতিষ্ঠা করেন কুষ্ঠ আশ্রম ‘গান্ধিজী প্রেমনিবাস’। এছাড়া ‘পোপজন শান্তি পুরস্কার’ স্বরূপ তিনি যে টাকা পেয়েছিলেন তা দিয়ে আসানসোলের কাছে প্রতিষ্ঠা করেন কুষ্ঠ রোগীদের জন্য একটি শহর ‘শান্তিনগর’।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, তেরেসার সেবাকর্ম ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর সব মহাদেশে। লরেটো স্কুল ছেড়ে আসার সময় যাঁর হাতে ছিল মাত্র পাঁচ টাকা, সেই তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটি প্রতিদিনই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সেবাকাজের জন্য খরচ করে ১২ লাখ টাকা। লঙ্গরখানাগুলোতে প্রতিদিন আহার করে ৬০ হাজার নিরন্ন মানুষ। ১৯৯৬ সালের এক হিসাবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এ পর্যন্ত আশ্রয় পেয়েছে চৌদ্দ হাজার ছিন্নমূল মানুষ। চার হাজার শিশুর জন্য রয়েছে সত্তরটি অনাথ আশ্রম। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে ১৫০টি বিদ্যালয়। এছাড়া রয়েছে প্রায় ৭০০ ভ্রাম্যমাণ চিকিত্সা কেন্দ্র। বিশ্বব্যাপী সেবামূলক কাজের জন্য মাদার তেরেসা বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারত সরকার কর্তৃক ভারতরত্ন, দেশিকোত্তমসহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। মানবসেবার দৃঢ় মানসিকতা ও অদম্য মনোবল থাকলে রিক্ত হস্তেও যে বিশ্ব জয় করা যায়, মাদার তেরেসা তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের প্রতিও মাদার তেরেসার ছিল ভীষণ টান। তিনি তাঁর সেবাধর্ম পালন করতে বাংলাদেশে মোট দুবার এসেছিলেন।
আজ ৫ সেপ্টেম্বর মাদার তেরেসার ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৭ সালের আজকের এই দিনে বিশ্ববাসীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চিরবিদায়ের পথে যাত্রা করেন। মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে তাঁর প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : গবেষক
