[ প্র তি ক্রি য়া ]

‘এই লজ্জা কোথায় রাখি’

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৮
গত ৩০ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা ‘এই লজ্জা কোথায় রাখি’ নিবন্ধটি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন নিয়ে তিনি নিবন্ধ লিখেছেন। শুধু অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন, তিনি যে কোনো প্রান্তের, যে কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন। এই স্বাধীনতা বা অধিকার সবারই রয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পুরো ঘটনা না জেনে’ ওই বিষয় নিয়ে নিবন্ধ লেখা তাঁর মতো বিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে উচিত নয়, এটা বুঝতে না পারা আমাদের অবাক ও বিস্মিত করেছে। এরফলে তাঁর নিবন্ধটি তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ হয়নি এবং এতে পাঠক বিভ্রান্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিশেষ প্রিয়ভাজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে নিবন্ধটি একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে। এটা দু:খজনক এবং লজ্জারও ঘটনা বৈকি। নিবন্ধটি একপেশে লিখতে গিয়ে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসম্মান করেছেন। এটা এক ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে দেশবাসী সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি মনে করেন। ধারণা করি, তিনি নিজেও সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি এবং জাতির বিবেক বলে মনে করেন। এই মানের একজন ব্যক্তি হয়ে কীভাবে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে অশিষ্ট মন্তব্য করা কতোটা সমীচীন তা আলোচনার দাবি রাখে। নিবন্ধের শুরুতে তিনি বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর এবং শিক্ষকদের ভিতর কী সমস্যা তা জানার চেষ্টা করেও তিনি বুঝতে পারেননি। সুতরাং এ কথাতো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে বলা বা লেখা দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে না। ভাইস-চ্যান্সেলরকে দিনের পর দিন আটকে রাখাকে তিনি খুব বড় অন্যায় কাজ বলেছেন। তাঁর এ ধরনের বক্তব্যে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কেননা নিকট অতীতে শাবিতে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে এ ধরনের কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যে কারো অব্যাহত অন্যায়, অনিয়ম প্রতিরোধ করার জন্য মাঝে-মধ্যে কঠিন কর্মসূচি দেয়ার বিকল্প থাকে না। উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনের অব্যাহত অন্যায়, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচানোর স্বার্থে অবরোধ কর্মসূচির বিকল্প ছিলো না। আর এটি প্রথম নজির নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ ধরনের কর্মসূচি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টির ভেতরে প্রবেশ করলে তিনি এ মন্তব্য করতেন না। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল আন্দোলনরত শিক্ষকদের বাসায় ফিরে তাদের কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের সাথে ভাইস-চ্যান্সেলরকে আটকে রাখার যে গল্প করার কথা বলেছেন, তা অনভিপ্রেত ও দু:খজনক। একজন ব্যক্তি কতোটা স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারী, নিগ্রহকারী, মিথ্যাবাদী, অপরের ক্ষতিকারী হলে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনের চরম পন্থা হিসেবে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়-এটা অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল অনুধাবন করেননি। আমরা মনে করি এই অনুধাবনের ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্যগত দিক থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হেয় করার জন্য তিনি এ গল্পের সংলাপ রচনা করেছেন। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যাপারে যে উচ্চ অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তাতে কারো দ্বিমত নেই। তিনি নিজেও এ সম্মানের অধিকারী। কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে এসব বিশেষণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। একজন ভাইস-চ্যান্সেলর অবশ্যই সবচেয়ে বড় মুক্তিবুদ্ধিতে বিশ্বাসী এবং জাতির বিবেক হওয়ারই কথা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন তা হতে পারেননি। ভিন্নমত সহ্য করতে পারেন না বলেই ড. আনোয়ার হোসেন বিরোধী মতের বা উপাচার্য বিরোধী গ্রুপের শিক্ষকদের বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ বলে গালি দেন। ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকদের মারার উদ্দেশ্যে তাঁর অনুগত ছাত্রদের লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রস্তত হতে বলেন। ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছনার বিচার করতে সাহস পান না। ভাইস-চ্যান্সেলর ড. আনোয়ার হোসেনের অন্যায় রুখবার জন্য তাঁর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনকে তিনি প্রগতিশীল ও ন্যায় বলতে নারাজ। নিশ্চয় তিনি এটা বলতে পারেন। একটি বিষয়ে সকলে একমত না হওয়া আধুনিক গণতন্ত্রের বহি:প্রকাশ। আমরা এ ধরনের মতামতকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতৃবৃন্দকে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বাসায় ডেকে নিয়ে বৈঠক করার বিষয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, মাঝে-মধ্যে ন্যায়সঙ্গত কোনো আন্দোলনের পরিসমাপ্তি দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটেছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকার আন্দোলনরত শিক্ষকদের বাসায় ডেকে নিয়ে উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছেন এবং তা তদন্ত করে দেখার ইচ্ছে ব্যক্ত করার মধ্যদিয়ে সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত কাজ করেছেন। এখানে ভিন্নমত পোষণ করার অর্থই হলো সবকিছু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা ভোগ করার মানসিকতা, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ভাইস-চ্যান্সেলর ড. আনোয়ার হোসেনকে অবরোধ করার বিষয়টি উল্লেখ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটা উদাহরণ তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন। এখানে আমরা উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনের বেশ কয়েকটি নতুন কীর্তির কথা তুলে ধরতে পারি যার মাধ্যমে তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন ভিন্নমত বা উপাচার্য বিরোধী হলে তাকে অশিষ্ট গালাগাল দেয়ার নজির স্থাপন করেছেন। এরআগে কোনো উপাচার্য এ ধরনের গালাগাল করেননি। ড. আনোয়ার হোসেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগে যিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন, এখন তিনি বাংলাদেশ কর্মকমিশনের সম্মানিত সদস্য। ওই উপাচার্যের অনুসারীরা বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ওই উপাচার্যকে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডীনকে ‘বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ’ বলে গালি দেন। অধ্যাপক ড. খবীর উদ্দিন শিক্ষক রাজনীতিতে শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর এ গালি দেয়ার রেকর্ড আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। পদত্যাগের এই দাবিটিকে ড. আনোয়ার হোসেন ‘কিছু সংখ্যক শিক্ষকের দাবি’ উল্লেখ করে জাতির কাছে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এ রকম মিথ্যাচার কোনো উপাচার্য করেননি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ শতাধিক শিক্ষক রয়েছেন। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি এবং ক্যাম্পাসে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় গৃহীত হয়েছে। শিক্ষক সমিতির চলমান আন্দোলনকালে বিভিন্ন পদ-পদবীর আশায় শিক্ষকদের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ অর্থাত্ ২১জন শিক্ষক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের পক্ষাবলম্বন করে শিক্ষক সমিতির আন্দোলন প্রসঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করছেন। উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের দাবির চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪শ শিক্ষক নাম ও পরিচয়সহ স্বাক্ষর করেছেন। অথচ এটাকে ড. আনোয়ার হোসেন গুটিকয়েক শিক্ষক, কিছু সংখ্যক শিক্ষকের আন্দোলন বলে প্রচার করে সরকার ও জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। যেমন বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল নিজেও। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, অফিসার, কর্মচারী উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন কর্তৃক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। বিগত উপাচার্য ড. শরীফ এনামুল কবিরের সময়ে গঠিত মেয়াদ উত্তীর্ণ সিনেট ভোটে জয়লাভের মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য বর্তমান প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক এম এ মতিনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত শিক্ষক পরিষদের আন্দোলন ঠেকাতে হাইকোর্টে রিট করে ক্যাম্পাসে জলকামান এনে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের আয়োজন করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. আনোয়ার হোসেন প্রথম রাজনৈতিক উপাচার্য যার রয়েছে অনেক অভিযোগ। পেশাজীবী সংগঠন শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষকের গণতান্ত্রিক অধিকার। মুক্তবুদ্ধিচর্চার উচ্চ বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের দৃষ্টান্ত আর কখনও দেখা যায়নি। ভেবে দেখুন ড. আনোয়ার কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে। কৃত রিট হয়রানিমূলক। নজিরবিহীন এ অপতত্পরতা কী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সহ্য করতেন। আমাদের মনে হয়, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সব জেনেও জানবেন না। বুঝেও বুঝবেন না। যে জেগে থাকে, তাকে জাগানো যায় না। মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে ড. আনোয়ার হোসেনের একটা পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এবং নিবন্ধে এটা ফুটেও উঠেছে। কথায় আছে ‘কাছের লোকের দোষ-ত্রুটি খুঁজতে নেই’। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে ড. আনোয়ারের নেতিবাচক দিক পৌঁছবে না, এটাই স্বাভাবিক। লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সদস্য, কার্যনির্বাহী পরিষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি e-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন