এখন প্রয়োজন নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৯
বাংলাদেশ নিয়ে আমরা সবাই যে স্বপ্ন দেখি, তা পূরণের জন্য আমরা কি কোন সক্রিয় ভূমিকা রাখছি? বাংলাদেশ আজ কোথায় আছে আর কোথায় যেতে পারে তার মধ্যে এখনও বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। সত্যি কথা বলতে আমাদের সম্ভাবনার খুব ক্ষুদ্র একটি অংশই আমরা কাজে লাগাতে পারছি। যেমন আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ যুবসমাজের কথাই ধরা যাক। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অসংখ্য ছেলে-মেয়ে আজ বিপথগামী হয়ে পড়ছে। যারা দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে পারত, তারা সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও তারা ঘরে বেকার বসে থাকছে, কারণ চাকরির জন্য যে দক্ষতা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম তাদের সেই দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করেনি। এমনকি শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির পাওয়ার সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার আগে তাদের কর্মক্ষেত্রে কেমন যোগ্যতার প্রয়োজন তা নিয়ে কোন ধারণাই থাকে না। ফলে তাদের একমাত্র সম্বল বলতে থাকে কিছু সার্টিফিকেট। বর্তমানে প্রতিবছর ১৮ লাখ নতুন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, যেখানে শূন্য পদের সংখ্যা বড়জোর ২ লাখ। ফলাফল হিসেবে আমরা পাই ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, সমাজে নৈতিক অধঃপতন, হতাশাগ্রস্ত তরুণ সমাজ- এমন হাজারো সমস্যা, যা আমাদের মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নকে অসম্ভব করে তোলে। তবে সমস্যা যখন আছে, তার সমাধানও আছে। পুঁথিগত পড়াশোনা করে পাওয়া সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে না থেকে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিজেদের এমন দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে যে দক্ষতা কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষাজীবনে থাকতে থাকতেই বুঝতে হবে ভবিষ্যত্ কর্মজীবনে কী কী যোগ্যতার প্রয়োজন হবে। অবশ্যম্ভাবী বেকারত্বের হাত থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করার দু’টি উপায় রয়েছে। একটি হচ্ছে আরও চাকরি সৃষ্টি করা, অপরটি হচ্ছে উদ্যোক্তা তৈরি করা। কিন্তু চাকরি পেতে হলে যেমন নিজেকে আর দশজনের চেয়ে অধিকতর যোগ্য প্রমাণ করতে হবে, তেমনি উদ্যোক্তা হতে চাইলেও বুঝতে হবে কীভাবে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন সমস্যাকে সুযোগে পরিণত করতে হয়। আর এখানেই চলে আসে নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের বিষয়টি। অনেকে অনেকভাবে নেতৃত্বকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মতে, নেতৃত্বের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, নিজেকে জানা এবং দ্বিতীয়ত, নিজের চারপাশের পরিবেশ ও সেখানে কী ঘটে চলছে জেনে সেই প্রেক্ষাপটে সঠিক কাজটি করা। নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ নিজের যোগ্যতা যেমন বৃদ্ধি করতে শেখায়, তেমনি দলগতভাবে কাজ করা, প্রয়োজনের সময় এগিয়ে এসে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া এমন নানা গুণাবলীও অর্জন করতে সাহায্য করে। এই প্রশিক্ষণের ফলে একজন শিক্ষার্থী তার নিজের অবস্থান বুঝতে পারে এবং কীভাবে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে, তা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। সমস্যা চিহ্নিত করে তার উপযুক্ত সমাধান করতে পারে। নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ একজন শিক্ষার্থীকে আর দশজনের চেয়ে চিন্তা, চেতনা ও যোগ্যতায় আলাদা করে তোলে, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যত্ উন্নয়নের জন্য নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে। দেশ আমাদের সবার; তাই সমাজের অংশ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের নিজের অবস্থান থেকে কিছু দায়িত্ব পালন করার আছে। নেতৃত্বের এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা একজন তরুণকে দায়িত্বশীল নাগরিক হতে উদ্বুদ্ধ করে। নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ একদিকে যেমন আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করে, তেমনি চারপাশে কী ঘটছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির কী করণীয়, এ ব্যাপারেও সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। যুবসমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করার সময় এখনই। আমরা শিশুদের কী শিক্ষা দিচ্ছি, যুবসমাজের সামনে কী উদাহরণ রাখছি, এসব নিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। কোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আফসোস করাটা সমাধান নয়, বরং আগে থেকেই আমাদের ভেবে দেখতে হবে কীভাবে আমরা তরুণদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে পারি। জনগণের জন্য কাজ করা শুধু রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মচারী বা এনজিও কর্মীদের দায়িত্ব ভাবলে ভুল হবে। নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ তরুণদের মধ্যে সেই দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং তা কাজে লাগিয়ে সক্রিয়ভাবে সমাজ পরিবর্তনে অংশ নিতে দিক-নির্দেশনা দেয়। জাতিসংঘের এক সামপ্রতিক পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫২ ভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে এবং পরিসংখ্যানের দৃষ্টিতে ২৩ বছর বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বিশাল যুবসমাজের ভবিষ্যত্ কোন দিকে যাচ্ছে? সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে এরা বাংলাদেশকে যেমন উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি দিক-নির্দেশনার অভাবে এরা সমাজের জন্য বোঝা হয়েও দাঁড়াতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে আমরা আজ তাদের কীভাবে গড়ে তুলছি তার ওপর। আজ যারা স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তারাই বিশ বছর পর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অধিষ্ঠিত হবে, দেশ চালানোর দায়ভার তাদের কাঁধেই পড়বে। আমরা যদি বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একটি দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দেখতে চাই তবে এই তরুণ সমাজ বিপথে চলে যাবার আগেই তাদের পথ দেখাতে হবে, গড়ে তুলতে হবে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক ও নেতা হিসেবে। এই লক্ষ্যে গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সমাজের নানা শ্রেণী থেকে আসা তরুণদের একত্রিত করে তাদের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে একটি সমন্বিত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে। বিওয়াইএলসি-এর বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বাছাইকৃত ১০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আগামী ৫-৭ অক্টোবর বিওয়াইএলসি আয়োজন করবে “ইয়ুথ লিডারশিপ বুটক্যাম্প”, যেখানে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের নানা খুঁটিনাটি দিক জেনে নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনে অনেকদূর এগিয়ে যাবে, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র নিয়ে সঠিক ধারণা পাবে। এই বুটক্যাম্পে অংশ নিতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বিওয়াইএলসি-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করতে পারো (http://www.bylc.org/ bootcamp/)| আবেদন পাঠানোর শেষ তারিখ ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩। লেখক :দেশের প্রথম লিডারশিপ ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ, ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন