সামুদ্রিক শেওলা থেকে যাত্রা শুরু করে—সেই কবে কোন্ প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানবঅস্তিত্বে বিবর্তিত হয়েছিল জীবসত্তা। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাদের বলা হয় হোমোসপিয়েন্স। ধর্মশাস্ত্রে যারা “অমৃতস্য পুত্রাঃ” ও “আশরাফুল-মাকলুকাত” বলে মহার্ঘ মর্যাদায় অভিদীপ্ত। সেই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আদিম পাথরের যুগ থেকে অনেক চড়াই-উত্রাই উিরয়ে আজ জড়বিজ্ঞানের বিশ্বায়নের যুগে উত্তীর্ণ। কিন্তু উত্তরণ বর্তমান জড়বিজ্ঞানে জড়জগতে যেমন হয়েছে অন্তর্জগতে তা হয়নি। যেমনটা হয়েছিল প্রাচীন ভারতের গৌরবোজ্জ্বল আরণ্যক ঋষিযুগে। সেই তুলনায় এই যান্ত্রিক যুগে অন্তর্জগতে বিবর্তন না হয়ে অপবর্তনই হয়েছে, উত্তরণ না হয়ে অবতরণই হয়েছে, প্রকৃত প্রগতি না হয়ে পুচ্ছ-প্রগতির (আদিমতার) দিকেই ধাবমান। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন—“এ যুগে মস্তিষ্কের চর্চা বাড়ছে কিন্তু হূদয়ের চর্চা কমছে।” আজ থেকে একশো বছরও নয়, পঞ্চাশ বছর পূর্বেও আমাদের ঠাকুরমা দিদিমার গরুর গাড়ির যুগে একান্নবর্তী পরিবারে যে নৈতিক মূল্যবোধ, যে শ্রদ্ধা ভক্তিপ্রেম, যে সরলতা পবিত্রতা ছিল, আজকের এই নভোযানের যুগে তা যেন রূপকথার মতই রূপক। নভোযানের যুগে জড়বিজ্ঞান বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে কিন্তু কেড়ে নিয়েছে গরুর গাড়ির যুগের সেই সুমধুর দাম্পত্য, সেই প্রাচ্য নারীর সুদুর্লভ সতীত্ব, কিংবদন্তী প্রাণঢালা পতিপ্রেম। আধুনিক কবির কবিতায়ও উঠে এসেছে বর্তমান সময়ের এই নিদারুণ নিঃস্বতা। কবি রফিক আজাদ প্রাচীন চিত্রকল্পে চিত্রায়ন করেছেন বর্তমান সংকটকে। বলেছেন—“এ যুগে বেহুলা নেই/ঘরে ঘরে শুধু লখিন্দর।”
যান্ত্রিক যুগে দাঁড়িয়ে বিশ্বকবি তাই প্রার্থনা করেছেন,— “দাও ফিরে সে অরণ্য”। বিশ্বকবির এই প্রার্থনায় সভ্যতার অন্তরাত্মার আকুল আর্তিই যেন প্রতিধ্বনিত।
আমাদের এই উপমহাদেশে দাম্পত্য তথা পারিবারিক জীবনে অবক্ষয় এলেও পাশ্চাত্যের মত অত ভয়ঙ্কর বিপন্নতা এখনো আসেনি। পাশ্চাত্যে জড়বিজ্ঞানের উন্নতির পাশাপাশি অবাধ অবৈধ জৈবিক ভোগলিপ্সাও বেড়ে চলছে চূড়ান্ত বিপদসীমা অতিক্রম করতে। বিবাহের বিশুদ্ধতা বর্জন করে চলছে লিভ টুগেদার। অবাধ অস্বাভাবিক যৌন-সংশ্রবের ফলে যৌবনেই যৌনজড়ত্ব ও মানসিক বিষাদে ছেয়ে ফেলছে ভূ-স্বর্গ আমেরিকা তথা সমগ্র পাশ্চাত্য। মানুষের সীমা লঙ্ঘনকারী অসংযমী চলনে এই উপগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বাসোপযোগী পরিবেশ।
আমেরিকার এক সাংবাদিক পুরুষোত্তম অনুকূলচন্দ্রকে বলেন—এই ধর্মই আপনাদের দেশকে ডোবাল। আমরা ধর্মের পিছনে সময় অপচয় না করে রাষ্ট্রকে উন্নত করার চেষ্টা করি। তাই জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সবদিক দিয়ে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ।
ঠাকুর মমতা-নিষ্যন্ধি চোখে তাকিয়ে তাকে বললেন—তোমাদের দেশের মস্তিষ্কবিকৃতি ও আত্মহত্যার পরিসংখ্যান কত?
সাংবাদিক জানালেন—এরপর ঠাকুর পার্শ্বের এক ভক্তের কাছে শুনলেন এদেশের মস্তিষ্ক বিকৃতি ও আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। দেখা গেল দুটোতে অনেক পার্থক্য। ঠাকুর তেমনি দরদীকণ্ঠে বলেন—রাষ্ট্রের এত উন্নতি, জড়বিজ্ঞানের এত উচ্চ শিখরে উঠা সবতো জীবনের জন্য অস্তিত্বের জন্য নাকি? তাই যদি হয় তাহলে তো তোমার পরিসংখ্যানই তোমার স্বয়ং-সম্পূর্ণতার বিরুদ্ধাচরণ করছে।
সাংবাদিক নীরব নিশ্চুপ। ঠাকুর বলেন—তুমি রাষ্ট্র স্টেটের কথা বলছিলে। স্টেট শব্দটা এসছে ‘স্ট্রে’ থেকে। ‘স্ট্রে’ মানে দাঁড়া অর্থাত্ আদর্শ। দেশ কথাটাও এসেছে আদেশ থেকে। আগে আদর্শ তারপর দেশ। লাভ আর লাইফ শব্দ দুটোও এসেছে একই রুট থেকে। লাভ না থাকলে লাইফও থাকে না। আর সেই লাভটা যত পরিপূর্ণ আদর্শে হয় ততই ভাল। সেই আদর্শ প্রিয়পরমকে কেন্দ্র করে বিশ্বের সবাইকে ভালবাসতে হয়। এভাবেই জীবন বাঁচে, বেড়ে চলে পরমানন্দে।
১৯৯০ এর জানুয়ারিতে মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয় এক আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলন। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল স্যাগানের নেতৃত্বে বিশ্বের অগ্রগণ্য ৩২ জন বিজ্ঞানী একটি ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করে বিশ্বরক্ষার আবেদন জানান বিশ্ববাসীর কাছে, বিশেষ করে বিশ্বের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের নিকট। বলেন—... “আমাদের দায়দায়িত্বের কথা মনে রেখে আমরা বিজ্ঞানীরা... আমাদের অনেকেই পরিবেশ সংকটের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল কাজ করছি... ধর্মসমাজের নিকট সানুনয়ে অনুরোধ করছি, তাঁরা যেন তাঁদের কথায় ও কাজে, যথোচিত সাহসের সঙ্গে পৃথিবীর পরিবেশকে রক্ষা করেন...।”
নোবেল বিজয়ীসহ বিশ্বের প্রধান বিজ্ঞানীরা বিশ্বের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কাছে সানুনয় অনুরোধ কেন করছেন? কারণ তাঁরা জানেন জড়বিজ্ঞান মানুষকে ভোগী করতে পারে কিন্তু সংযমী করতে পারে না। জড়বিজ্ঞানের দৌলতে মানুষ ঘরে বসে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কামিনীসহ অনেককিছুই ভোগ করতে পারে, বিশ্বকে ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণও ঘরে বসে করতে পারে, কিন্তু নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন নিজেই একথা স্বীকার করে গেছেন। বলেছেন—“বিজ্ঞান প্লুটোনিয়ামের প্রকৃতি পরিবর্তন করতে পারে কিন্তু মানব হূদয়ের অশুভ প্রবৃত্তির রূপান্তর ঘটাতে পারে না। “তাই উপনিষদের শাশ্বত সমাধান নান্যতঃ পন্থা বিদ্যায়তে অয়ম্”। সেই জ্যোতির্ময় মহান পুরুষের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ছাড়া কোন পথ নেই। কারণ অসংযত মনকে জয় করা বিশ্বকে জয় করার চেয়েও কঠিন। গুরু অ্যারিস্টেটলের নির্দেশে ভারতের ঋষিদের পদপ্রান্তে বসে এই মহাসত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন বিশ্ববিজয়ী গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডার। মহানবী (সঃ)-ও বহি:শত্রু বা বহির্বিশ্ব জয় করাকে শ্রেষ্ঠ জেহাদ বলেননি। নফ্স অর্থাত্ মনের অশুভ প্রবৃত্তি জয় করাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ জেহাদ বলেছেন। আর এই নফ্স অর্থাত্ অসংযত মনকে জয় করা একমাত্র ইষ্টানুরাগেই সম্ভব। বর্তমান যুগের ইষ্টহীন ভক্তি-প্রেমহীন গতি-বিধির দিকে চেয়ে অনুকূলচন্দ্র তারস্বরে বলেছেন—
“জ্ঞানের আলোয় হোসনা যতই/ঝকমকে আর আলোকিত
ইষ্টস্বার্থে যদিই না হয়/ সবকিছু তোর একীকৃত
এই যদি না হতে পারিস/ও কিছু নয় যাই না করিস
আলোর বিপুল ঝরার মত/ঝকঝকে তোর পতন তত।”
কাজেই মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে ইষ্টানুরাগ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সার্থক সমন্বয় অপরিহার্য। ধর্ম অর্থাত্ ইষ্টানুরাগ ভক্তি প্রেমকে প্রাণকেন্দ্র করেই বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে নিয়ে বিবর্তন বিবর্ধনের দিকে প্রাগ্রসর হতে হবে।
আজ পুরুষোত্তম শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্রের ১২৫তম আর্বিভাব তিথিতে শ্রদ্ধাঞ্জলিতে সিক্ত করি তাঁর চরণ।
লেখক : সাংবাদিক
mail:[email protected]
