অতীত ব্যর্থতার জন্য জাতির নিকট ক্ষমা চাহিয়া অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন চিলির বিচারকগণ। আর যেই ব্যর্থতার জন্য তাহাদের এই ক্ষমাপ্রার্থনা তাহা কোনো সাধারণ বিষয় নহে। তাহারা বলিয়াছেন যে বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব হইল জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু অতীতে চিলির বিচারকগণ সেই দায়িত্ব হইতে দূরে সরিয়া গিয়াছিলেন। ইহার দায় স্বীকার করিয়া চিলির বিচারকদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি সংগঠন সত্তর হইতে আশির দশকে সামরিক শাসনামলে বিচারকদের নানা কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করিয়াছে। দেশটির সামরিক একনায়ক জেনারেল অগাস্টো পিনোশেটের ক্ষমতা দখলের ৪০তম বার্ষিকীর আগে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ম্যাজিস্ট্রেট নামের অই সংগঠনটি বলিয়াছে যে এখন সময় আসিয়াছে ভুক্তভোগী জনগণ ও সমাজের নিকট ক্ষমা চাহিবার। উল্লেখ্য যে, ১৯৭৩ হইতে ১৯৯০ পর্যন্ত স্থায়ী এই স্বৈরশাসনে তিন সহস্রাধিক মানুষ নিহত হইয়াছিল। নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হইয়াছিল আরও অসংখ্য মানুষ। কিন্তু প্রতিকারের কোনো পথ খোলা ছিল না। কারণ বলপূর্বক হরণ করা হইয়াছিল সর্বপ্রকার মৌলিক ও মানবিক অধিকার।
সত্তর ও আশির দশকে চিলিতে যাহা ঘটিয়াছে তাহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তত্কালে তৃতীয় বিশ্ব বলিয়া পরিচিত এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশেও একই ঘটনা ঘটিয়াছে। উদাহরণের সন্ধানে খুব বেশি দূরে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশসহ খোদ এই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নহে। এইসব দেশে উপর্যুপরি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটিয়াছে। ছুঁড়িয়া ফেলা হইয়াছে সংবিধান। পদদলিত করা হইয়াছে জনগণের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদিয়া ফিরিয়াছে। নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় বিচার বিভাগ ও প্রশাসনসহ যেইসব প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা হইয়াছে কেহই তাহাদের দায়িত্ব পালন করে নাই যথাযথভাবে। সংবিধান সামনে রাখিয়া যাহারা কর্তব্যে অবিচল থাকিবার শপথ গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহারা শুধু যে নীরবদর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছেন তাহাই নহে, স্বৈরশাসকদের অতি উত্সাহী মোসাহেব কিংবা ক্রীড়নকের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হইয়াছিলেন অনেকে। তবে এই ক্ষেত্রে যাহারা নিজেদের সুশীল সমাজের সদস্য বলিয়া দাবি করিয়া থাকেন— তাহারাও পিছাইয়া ছিলেন না।
সাধারণত বিচারকদের সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের হেফাজতকারী হিসাবে মনে করা হয়। সেই কারণেই সম্ভবত তাহাদের উপর সমাজের প্রত্যাশাও খানিকটা বেশি। চিলির বিচারকদের ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যেও প্রকারান্তরে সেই মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। বস্তুত সংবিধান ও মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার নহে। ইহা একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই এই দায়িত্বের সম-অংশীদার। অতএব, কোনো কারণে সংবিধান ও মৌলিক অধিকার বিপন্ন হইলে তাহা প্রতিরোধ করিবার দায়িত্ব কেহই এড়াইতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত অতি নগণ্যই বলা চলে। মূলত নাগরিকদের এই দুর্বলতাকে পুঁজি করিয়াই যে সামরিক-বেসামরিক একনায়করা বিশ্বের দেশে দেশে অবৈধভাবে ক্ষমতাদখল ও স্বৈরশাসন চালাইয়া যাইতেছে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। উন্নয়নশীল দেশগুলি যে এখনও সেই অশুভ ছায়া হইতে মুক্ত নহে— তাহার আলামতও আমাদের চোখের সামনেই আছে। চিলির বিচারকদের এই কারণে ধন্যবাদ জানাইতে হয় যে তাহারা যেই দৃষ্টান্তটি স্থাপন করিয়াছেন তাহা অনন্য শুধু নহে, অনুসরণযোগ্যও বটে।
