অপুষ্টি ও সচেতনতা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৪
বাংলাদেশের প্রায় চার ভাগের একভাগ মানুষ অপুষ্টির শিকার। সেই হিসাবে দেশে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্য প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। অপুষ্টির দিক হইতে বিশ্বের ঝুঁঁকিপূর্ণ ৩৬টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রহিয়াছে এবং ফি বত্সর এইদেশে অপুষ্টিতে মারা যাইতেছে অর্ধ লক্ষের বেশি শিশু। সমপ্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত পুষ্টিবিষয়ক একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের সেমিনারে এই সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে উঠিয়া আসিয়াছে। জানা গিয়াছে, দেশে এক্ষণে ৫১ শতাংশ শিশু অপুষ্টির কারণে রক্তস্বল্পতায় ভুগিতেছে, আর মায়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ শতাংশ। অপুষ্টির কারণে বাংলাদেশে ৩৬ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক হইতে অনেক কম ওজন লইয়া জন্মগ্রহণ করে আর ৪১ শতাংশ শিশু বাড়িয়া ওঠে বিকলাঙ্গ হইয়া। কথা হইল, আমাদের জনসংখ্যার বৃহত্তর একটি অংশ ব্যাপকহারে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রহিয়াছে বহু কাল ধরিয়া। বলা যায়, এক্ষণে যদি ইহার পরিমাণ হয় মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ, কয়েক দশক পূর্বেও এই হার ছিল তিন গুণের অধিক। অর্থাত্ আমরা ক্রমশ অপুষ্টির হার সহনীয় পর্যায়ে লইয়া আসিতেছি। তাহার পরও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের অবস্থার উন্নতি লইয়া আত্মসুখের সুযোগ নাই। অপুষ্টির তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির ভিতরে বাংলাদেশ এখনও উচ্চ ঝুঁঁকিতে রহিয়াছে। এমনকি অপুষ্টির জন্য কুখ্যাত সাব-সাহারা অঞ্চল হইতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা বেশ খারাপ। অর্থাত্ বিশাল একটি জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র অপুষ্টির কারণে ভবিষ্যত্ জনশক্তি না হইয়া পরিণত হইবে দেশের আপদ হিসাবে। তাহাদের কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তর করিতে সঠিক উদ্যোগ লইবার ব্যর্থতা আমাদের অবহেলার স্মারক হিসাবেই গণ্য হইবে। কেননা, বর্তমানে যেই হারে দেশের অপুষ্টিজনিত শীর্ণ ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম পুষ্টির আওতায় আনা হইতেছে, সঠিক উদ্যোগ ও সচেতনতায় তাহা ত্বরান্বিত করা খুব কঠিন নহে। এককালে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যানে আমাদের দেশ ছিল বিশ্বে অন্যতম শীর্ষপর্যায়ে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়া শুধুমাত্র সচেতনতার কারণে ফি বত্সর লাখ লাখ শিশুর মৃত্যু ঘটিত। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার ও তত্সংক্রান্ত কার্যকর ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই জাতীয় মৃত্যুর হার তাত্পর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পাইয়াছে। অপুষ্টি দূর করিতেও সচেতনা ও কিছু বিশেষ প্রচারণা আবশ্যক। উদাহরণ দিয়া বলা যায়, আমরা উদর পূর্তি করিতে যাহা খাই, তাহার ভিতরে সিংহভাগ জায়গা দখল করিয়া থাকে শুধুমাত্র ভাত, কিংবা রুটি— যাহা কার্বহাইড্রেড মাত্র। তাহার পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি বা শস্যদানামিশ্রিত তুলনামূলক সুষম খাদ্যগুণের গুরুত্ব আমাদের গরিব জনগোষ্ঠীর কাছে অধরা থাকে শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে। যেমন—মাত্র ১০০ গ্রাম ‘সজনে পাতা’য় সাতটি কমলা, চার গ্লাস দুধ, চারটি গাজর, তিনটি কলা ও দুই কাপ দই-এর সমতুল্য পুষ্টিমান রহিয়াছে। এই ধরনের সহজলভ্য ও পুষ্টিযুক্ত সস্তা খাদ্যের উদাহরণ অনেক রহিয়াছে। এই বিষয়ে গরিব জনগোষ্ঠীর ভিতরে সচেতনতার অভাব রহিয়াছে পুরোমাত্রায়। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ীমূল্যের পুষ্টি প্যাকেট বিতরণের বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যাইতে পারে। আয়রন বড়ি, খাবার স্যালাইন ও জিঙ্ক বড়িসহ পুষ্টিহীনতা কাটাইতে উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলি লইয়া আরও ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। ইহার সুফলতা ছড়াইয়া দিতে হইবে অসচেতন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভিতরে। স্মর্তব্য, অপুষ্টির কারণে শিশুদের দৈহিক ও বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ব্যাঘাত ঘটে মারাত্মকভাবে। ন্যূনতম ক্রয়ক্ষমতা রহিয়াছে এমন জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ অপুষ্টির শিকার হয় পুষ্টি সচেতনতা ও পুষ্টি জ্ঞানের অভাবে। অর্থাত্ অপুষ্টির কারণ একপেশে দারিদ্র্য নহে, তাহার সহিত ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রহিয়াছে অজ্ঞানতা। এই অজ্ঞানতা দূর করিবার উপায়ও বাহির করা হউক সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে। প্রাপ্ত তথ্যউপাত্ত মতে, অপুষ্টি দূরীকরণের খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করিলে তাহা হইতে পরোক্ষভাবে রিটার্ন আসিতে পারে ৩০ বিলিয়ন ডলারের অধিক। তাহা ছাড়া সার্বিকভাবে দেশের অপুষ্টি নির্মূল করিতে পারিলেও জাতীয় আয় দুই হইতে তিন শতাংশ বৃদ্ধি সম্ভব। অর্থাত্ ইহার সহিত জড়িত রহিয়াছে আমাদের জনশক্তির উন্নতি, আর জনশক্তির সহিত সম্পৃক্ত আমাদের সার্বিক অর্থনীতি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন