দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে নাব্যতা সংকটে জনদুর্ভোগের চিত্র অনেক আগে থেকে শুরু হলেও আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পাচ্ছে। পদ্মা ও যমুনার পানি হ্রাসই জনদুর্ভোগের প্রধান কারণ। দৌলতদিয়া ঘাট ও আশপাশের এলাকায় এই ভরা বর্ষা মৌসুমে ডুবোচরের নাব্যতা সাড়ে ৭ ফুটে নেমে গেছে। অথচ ফুললোড নিয়ে একটি ফেরি চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৮ ফুট পানির প্রয়োজন হয়। ফেরি ডুবোচরে আটকে যাওয়ায় দু’পাড়ে হাজার হাজার বাস-ট্রাক চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ জরুরি খনন কাজের মাধ্যমে দ্রুত পলি অপসারণের চেষ্টা করেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে নাব্যতা সংকট দেশের শতাধিক নদীর একটি উদাহরণ মাত্র। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিআইডব্লিউটিএর তথ্যমতে, নাব্যতা সংকটের কারণে সচল নৌপথের মধ্যে ৮০ শতাংশেই যাত্রী ও মালপত্র পরিবহন রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। বিআইডব্লিউটিএর নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের জরিপের তথ্য অনুযায়ী নাব্যতার অভাবে চতুর্থ শ্রেণীর (নাব্যতা অনুযায়ী শ্রেণীবিন্যাস) ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ১৬টি রুটের ১ হাজার ৩৫৩ কিলোমিটার নৌপথ ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণীর ১ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ২২০ কিলোমিটার তৃতীয় শ্রেণীতে এবং তৃতীয় শ্রেণীর ৮০৭ কিলোমিটার নৌপথ চতুর্থ শ্রেণীর নৌপথে রূপান্তরিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে দেশে ছোট-বড় ২৩০টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫টির অবস্থা খুবই খারাপ। ইতিমধ্যে দেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে ১৭টি নদী। মৃতপ্রায় আরও ৮টি নদী। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে ৬৭, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১২ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৩২টি নদী ভয়াবহ হুমকির মুখে। রাজধানীর চারপাশে প্রবাহিত চারটি নদীও দখল, ভরাট আর দূষিত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মৃতপ্রায় নৌপথগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ও নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খনন কাজ চালিয়ে গেলেও সফলতা চোখে পড়ার মতো নয়। তা না হলে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের এমন শোচনীয় অবস্থা হতো না। মূলত উজানে বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার, ভরাট ও দখলদারিত্ব, ভাঙন, দূষিত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করা, তলদেশে পলি জমা, বর্ষা মৌসুমের প্রচণ্ড স্রোত, দেশের অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত নদী শাসন ও বাঁধ নির্মাণে নদীর গতি-প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় নদীর আজ নাব্যতা সংকট। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদ-নদীসহ দেশের সব নদী দিন দিন নাব্যতা হারাচ্ছে। শুকনো মৌসুমে নদীগুলোর পানি কমে এমন চেহারা দাঁড়ায় যে দেখলে নদী না বলে খাল বলে মনে হয়।
বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল ব্যবস্থার ওপর এখনও দেশের ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। নৌপথে এখনও চলাচল করে ৩০ শতাংশ যাত্রী। আর পরিবহন করা হয় ২০ শতাংশ পণ্য। আমাদের মনে রাখতে হবে নদী হলো একটি দেশের প্রাণপ্রবাহ। মানুষের রক্ত প্রবাহ না থাকলে যেমন বেঁচে থাকতে পারে না তেমনি নদীর প্রবাহ না থাকলে সে দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে টিকিয়ে রাখতে হবে নদীর অস্তিত্ব। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে কার্যকরি উদ্যোগ।
লেখক :চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন
