বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি অতীত ও বর্তমান

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৫
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী যুব নেতাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ১৯৪৭-৭০ এর সংগ্রামের বিভিন্ন পর্বে বিদেশনীতি নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নির্ধারিত হয় আওয়ামী লীগে জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খুনী মোশতাক-মাহবুব আলম চাষী চক্র বিদেশনীতির ঐ নির্ধারিত বলয়ের বাইরে চলে যায়। চলে যেতে থাকে পাক-চীন-মার্কিন ঘরানার দিকে। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এবং তত্পূর্বে ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি (১৯৭০ নির্বাচন পরবর্তী) রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় নতজানু পররাষ্ট্র নীতির বিরোধী স্পষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর ঘটনার পর বিদেশনীতি বিপরীতমুখী রূপ নেয়। ১৫ আগস্টের কিলার চক্রের নির্মম কর্মকাণ্ডের পুরস্কারস্বরূপ তাদের অনেককে বিদেশি মিশনে চাকরি দিয়ে তাদের সে চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার মধ্যদিয়ে জঘন্যতম কাজ করা হয়। এদের কেউ কেউ এখনো জীবিত আছেন এবং নিয়মিত টকশোতে যোগ দেন। খুনী ডালিম, রশীদসহ তাদের সকল সহযোগীকে স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ দেশে রাষ্ট্রদূত পদমর্যাদা দেয়া হয়। পুনর্বাসন করা হয় ’৭১-এর ঘাতক দালালদের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে বসানো হয় কুখ্যাত রাজাকার প্রফেসর বারীকে। সুযোগ করে দেয়া হয় কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা মান্নানকে। পাকিস্তানকে খুশি করার জন্য কুখ্যাত গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়। পাস করা হয় Indemnity Ordinance. ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধের লক্ষ্যে। তত্কালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও অসম শর্তে বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আমলে গৃহীত অসম শর্তে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বন্ধ করারও ঘোষণা দেন। দাবি জানান— পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে নবসৃষ্ট বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের পাওনা ও দেনার হিসাব নিষ্পত্তির। বিশ্বব্যাংক ও সহযোগী সংস্থার পাকিস্তানের কাছে পাওনা টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ দিলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের মাধ্যমে সাফ জানিয়ে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ ঐসব বিষয়ক কোন চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয় এবং সুবিধাভোগীও নয়। সুতরাং ঐসব ঋণ পরিশোধ করতেও বাধ্য নয়। প্রমাণ দেয়া হয় মালয়েশিয়া ও জর্ডানের। বলা হয় সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করার পর মালয়েশিয়া কর্তৃক গৃহীত ঋণে অর্থায়িত সিঙ্গাপুরের প্রজেক্ট ঋণ মালয়েশিয়াকে ফেরত দিতে হয়েছে। একইভাবে বিশ্বব্যাংকের ঋণে প্রতিষ্ঠিত জর্ডানে পশ্চিম তীর ও গাজায় অবস্থিত প্রকল্প ঋণের টাকা জর্ডানকেই পরিশোধ করতে হয়েছে ইসরাইল দখলের পর। যা হোক, বাংলাদেশ তার মুদ্রানীতি ও Foreign Exchange নীতি, আমদানি-রপ্তানি নীতি, স্বাধীন সার্বভৌম সত্তার ভিত্তিতে পরিচালনার প্রত্যয় ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনেম্যারাকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সফরে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয় আত্মমর্যাদাশীল মুদ্রানীতি ও Exchange Rate Policy বিষয়ে। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা অবস্থায় হাজারো চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি সৌদি আরব, কমিউনিস্ট চীনসহ আরো অনেক দেশ। তারা স্বীকৃতি দিয়েছে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর। অনেক বিশেষজ্ঞের দাবি: এখনো ঐসব দেশ অনেকটাই বাংলাদেশ-বিরোধী মনোভাব নিয়ে বসে আছে। তাদের টাকা দিয়ে মৌলবাদের অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাত্ত্বিকভাবে NGO-র বিরোধিতা করলেও ব্যাঙের ছাতার মত ইসলামিক NGO গঠন করে Terrorist Financing করেছে এদের কেউ কেউ এই বাংলাদেশে। অনেকে আবার আজ এ দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু দেশ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে থাকলেও বর্তমানে এদের কেউ কেউ আবার যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে। শোনা যাচ্ছে কিছু দেশ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে টাকা-পয়সা খরচ করছে বাংলাদেশের উন্নয়ন অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে। উন্নয়ন সহযোগিতার অংক খতিয়ে দেখা যায়, জাপান বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতার শীর্ষে, তবে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে নাক গলায় না। অথচ, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়ন সহযোগিতা কম থাকলেও প্রতি কাজে নাক গলানোই তাদের যেন স্বভাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কম হলেও প্রতি কাজে মোড়লীভাব দেখানোর স্বভাব। অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সহযোগিতার পরিমাণ জাপানের কাছাকাছি হলেও তারা কিন্তু মোড়লীভাব অথবা নাক গলানোর চেষ্টা করে না। তাই এরা জঙ্গী অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। তাই বাংলাদেশের উচিত এসব দেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশীদার করা। বাঙালি জাতিসত্তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের বিদেশনীতি হওয়া উচিত নিজেদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। মনে পড়ে ভয়েস অব আমেরিকার এককালের সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর কথা। তিনি বলেছেন- বঙ্গবন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথে বৈঠকের সময় স্বভাবসিদ্ধভাবে পায়ের উপর পা তুলে তামাকের পাইপ হাতে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে কথা বলেন। তার মতে, এটা একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব। কারণ তিনি আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে। আমাদের নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ, আপনারা ঘরের সমস্যা নিয়ে বিদেশিদের দ্বারস্থ হবেন না। ঘরের সমস্যা নিজেরা ঘরে বসে সমাধান করুন। লেখক : এফসিএ, সহ-সভাপতি, অর্থনীতি সমিতি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন