যুদ্ধ বিগ্রহ, সংঘর্ষ, রক্তপাত, জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন, লুটপাট, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনা মানুষের কাম্য না হলেও এর থেকে আজও রেহাই মেলেনি মানব জাতির। বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতি মানব সভ্যতাকে যে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিস্ফোরণ ঘটেছে-যা কিনা মানবজাতির গর্ব। গত শতাব্দীতে মানুষ চন্দ্র পৃষ্ঠে অবতরণ করেছে, বর্তমানে মঙ্গল গ্রহে অভিযান অব্যাহত রেখেছে; চিকিত্সা শাস্ত্রের নব নব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার সভ্যতাকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এসব মহান অর্জন সত্ত্বেও, নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ, সংঘর্ষ, রক্তপাত, নির্যাতন, নিষ্পেষণ থেকে মানব জাতি আজও মুক্তি পায়নি। এ যেন মানুষের নিয়তি। কিন্তু একথাও ঠিক যে, মানুষ নিজেই তাঁর ভাগ্যের নিয়ন্তা। অতএব ভাল, মন্দ, উন্নতি, অবনতি, হানাহানি, কাটাকাটি, সংঘর্ষ, রক্তপাত সবই মানুষেরই সৃষ্টি।
আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক কারণে এ সব বৃদ্ধি পেয়েছে। দেখা গেছে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল নিয়ে কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্যে শাসক এলিট শ্রেণি জনগণের বিরুদ্ধে হীন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারী, একনায়কতান্ত্রিক শাসকেরা তাদের শাসন কায়েম রাখার এবং দীর্ঘায়িত করার জন্য প্রতিবাদী জনতার বিরুদ্ধে কখনো কখনো অঘোষিত যুদ্ধ রচনা করেছে; নির্মম নির্যাতন ও দমননীতির আশ্রয় নিয়েছে। দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও রক্তপাত এতে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিকট অতীতে প্যালেষ্টাইন, ইরাক ও লিবিয়ায় ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে এবং বর্তমানে মিসর ও সিরিয়ায় অনেকটা গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, প্রতিনিয়তই ঘটছে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা। অশান্ত মিসর ও সিরিয়ার ভবিষ্যত্ নিয়ে বিশ্ববাসী আজ উদ্বিগ্ন। প্রায়ই প্রতিদিনই ঘটছে রক্তপাতের ঘটনা।
সে প্রাচীনকালে মিসরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল সভ্যতা যা Ancient Egyptian Civilization হিসাবে পরিচিত ছিল। এ সভ্যতাকে RiverValley Civilization বা নদী উপত্যকা সভ্যতাও বলা হয়। কারণ তখন নীল নদের পানির প্লাবনে এর দু’কূল প্লাবিত হতো এবং এ প্লাবনে ভূমিতে প্রচুর পলি জমেছিল। এতে জমির উর্বরা শক্তি বেড়ে যায় এবং তাতে সহজেই বিপুল ফসল ফলানো সম্ভব হয়। প্রাচীন মিসর পরিণত হয় বিশাল শস্য ভাণ্ডারে। এভাবে উদ্বৃত্ত সম্পদ (surplus resources) তৈরি হয় এবং তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে সভ্যতা। কে না জানে মিসরের পিরামিডের কথা, মিসরীয় সভ্যতার অবদানের কথা। কিন্তু নীল নদের উপত্যকায় একদিন যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সে জনপদ আজ রক্তে রঞ্জিত। এতো রক্তপাত যে কোন মানুষকে ব্যথিত না করে পারে না। নানা উত্থান পতনের মধ্যদিয়ে মিসর আজকের এ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সে ইতিহাস আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। এখানে শুধু আমি বর্তমানের সংকট আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি।
হোসনী মোবারকের পতনের পর মিসরে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে এবং শান্তি কায়েম হবে এটাই ছিল মিসরীয় জনগণের এবং বিশ্বের শান্তি প্রিয় মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে প্রত্যাশা পূরণতো হয়নি, দেখা দিয়েছে নতুন সংকট এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। মোহাম্মদ মুরসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্যদিয়ে মিসরে ইতিবাচক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু অল্পদিনের মাথায় মিসরের সামরিক শক্তি কর্তৃক মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং সামরিক সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠা করার ফলে মিসরের নব-অগ্রযাত্রা শুধু বাধাগ্রস্তই হয়নি, শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
মিসরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকেরা ইতিমধ্যে মিসর জুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। মুরসির পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকার ফলে অবস্থার আরো ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী জোট আন্দোলন অব্যাহত রাখার সঙ্কল্প ব্যক্ত করেছে। কায়রো জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশ অব্যাহত আছে। মুরসি সমর্থকদের ফাতাহ মসজিদ থেকে পুলিশ সরিয়ে দিয়েছে। মসজিদে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন মুরসি সমর্থক নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। মসজিদ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় ব্রাদারহুডের ২৫০ নেতাকর্মীকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব নেতাকর্মী ফাতাহ মসজিদের মিনার থেকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়াসহ অন্যান্য স্থানে কারফিউ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছে। ফলে মিসরীয় রাজনীতিতে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং মিসর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে। অনেকের মতে বিচক্ষণ ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অভাব মিসরের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। সামরিক সরকার বা গণতান্ত্রিক বহুদলীয় জাতীয় সরকার গঠন করলেই মিসরের সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ মুরসিপন্থিরা লড়াইয়ের পথটা বেছে নিয়েছে।
নিকট অতীতে মিসরে যখন হোসনী মোবারক বিরোধী গণআন্দোলন তুঙ্গে ওঠে তখন যুক্তরাষ্ট্র হোসনী মোবারককে দৃশ্যত ত্যাগ করে এবং গণআন্দোলনের প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন প্রদান করে। মোবারকের পতনের পর মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তাও সমর্থন করে। ব্রাদারহুড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয় বলে প্রতীয়মাণ হয়। কিন্তু এরই মধ্যে সংখ্যালঘু খ্রীস্টানরা সরকার বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এর ফলে ব্রাদারহুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমঝোতা ভেঙে যায়। সেনাবাহিনী যখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং প্রেসিডেন্ট মুরসিকে গ্রেপ্তার করে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে সমর্থন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে একদিকে গণহত্যার নিন্দা করছে এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তিকে মদদ দিচ্ছে। এদিকে আবার সামরিক সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রচ্ছন্ন সমালোচনা করছে। ‘আপাত বৈরিতার ভানের আড়ালে মূলত উভয়পক্ষ স্ব স্ব স্বার্থের পক্ষে কুশলী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। নিরাপত্তা পরিষদ বা জাতিসংঘ মহাসচিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের আর এক প্রতিভূ। তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে।’
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক মিসরের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যক্কারজনক সামরিক স্বৈরতন্ত্র। এ সামরিকতন্ত্র অনাগতকালের জন্য অব্যাহত থাকবে বলেই অনেকেরই ধারণা। ইসরাইলকে প্রতিহত করার সাহস ও শক্তি এদের নেই। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষের উপর তারা এখন হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য মিসরীয় সেনাবাহিনী প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স। অতএব মিসরের জনগণকেই এ সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে এবং জনগণই এক নতুন গণতান্ত্রিক মিসর নির্মাণ করবে।
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলে আসছে প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে। সিরিয়ায় বাশার সরকার বিরোধী একটি রাজনৈতিক মোর্চা তথা প্রবাসী সরকার এবং বিদ্রোহী সেনাবাহিনী গঠনের পর থেকেই এ যুদ্ধের সূত্রপাত। যুদ্ধ সিরিয়ার শহর, নগর ও অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। সিরিয়া ছিল খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন সিরিয়াকে খাদ্য আমদানি করতে হয়। বেকার সমস্যা যেখানে যুদ্ধের আগে তেমন একটা ছিল না, এখন তা শতকরা ৬০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। ‘যেখানে যুদ্ধের আগে তেল উত্পাদিত হতো দৈনিক তিন লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল, এখন উত্পাদিত হয় সেখানে মাত্র ২০ হাজার ব্যারেল। শুধু তেল উত্পাদনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ বিলিয়ন ডলারে। সিরিয়ার মুদ্রার (পাউন্ড) ব্যাপক দরপতন হয়েছে। আগে এক ডলার পাওয়া যেতো সিরীয় ৪৭ মুদ্রায়, এখন পাওয়া যাচ্ছে ২৫০ মুদ্রায়। জনসংখ্যার ৭৯ শতাংশ গরিব হয়ে গেছে যুদ্ধের কারণে। অথচ যুদ্ধের আগে গরিব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এক শতংশেরও কম ছিল। স্বাস্থ্যসেবা পরিপূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। দেশের ৭৫টি হাসপাতালের মধ্যে এখন চলছে মাত্র ৩০টি। এক সময় সরকার জ্বালানি তেলে ও খাদ্যে সাবসিডি দিতো, যার পরিমাণ ছিল বছরে ছয় মিলিয়ন ইউরো, এখন তা শূন্যের কোটায়। যুদ্ধের আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার, এখন তা এক রকম শূন্য।’
এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে সিরিয়াও আজ পশ্চিমা শক্তির রোষানলে পতিত হয়েছে। সাদ্দামের ইরাক, গাদ্দাফির লিবিয়া কিংবা হোসনি মোবারকের মিসর যে কাতারে; বাশার আল আসাদের সিরিয়াকে সে কাতারে ফেলা যায় না। সাদ্দাম, গাদ্দাফি এবং মোবারক শুধু দীর্ঘদিন যাবত্ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেনি, এরা কালক্রমে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তাদের স্ব স্ব দেশের অর্থনীতিতে ধস নামে। সাধারণ মানুষ দারুণ অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরমে উঠে। বিরোধীদের উপর চলে অমানবিক শোষণ, নির্যাতন। এ সুযোগ গ্রহণ করে সাদ্দাম বিরোধী ও গাদ্দাফি বিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ তাদের মিত্ররা। সাদ্দাম ও গাদ্দাফির করুণ পরিণতি ছিল ইতিহাসের এক অনিবার্যতা। কিন্তু বাশার আল আসাদ অত্যাচারী শাসক ছিলেন— এমন কথা বলা যায় না। তাছাড়া সিরিয়ার অর্থনীতি ছিল শক্তিশালী। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্যে বাশার আল আসাদ সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু সে দেশের জঙ্গিগোষ্ঠীর বিদ্রোহ, সশস্ত্র প্রতিরোধ দেশটির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়।
সিরিয়াতে আজ যা হচ্ছে তা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। একটি বড় জঙ্গি জনগোষ্ঠী বাশার আল আসাদ সরকারের বিরোধী শক্তি। আরব শাসকগণ, তুর্কী এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র ইউরোপ রয়েছে তাদের পক্ষে আর অন্যদিকে রয়েছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তার মিত্র রাশিয়া, ইরান ও চীন। ক্ষমতার দিক থেকে কেউ কারোর চেয়ে কম নয়। সিরিয়া আজ রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত। মূলত আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব, পাপেট আরব বিশ্ব ও জঙ্গিরাই এজন্য দায়ী। সিরিয়ায় মার্কিন হামলা কতটা সফল হবে তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর। কিন্তু সেদিক থেকে বাশার আল-আসাদ সরকারের কোন দুর্বলতা নেই। আরব দেশগুলোর মধ্যে সিরিয়াই একমাত্র ইরান, রাশিয়া ও চীনের বিশ্বস্ত মিত্র। তাই ইরান ও রাশিয়া কিছুতেই হারাতে চায় না এই মিত্রকে। ইরান বেশ কঠোরভাবেই সিরিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং অনেকটা জোর দিয়েই বলেছে যে, যেকোন মূল্যে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঠেকাবে। সিরিয়ায় যে ধরনের হামলা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে যে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সম্ভবত এই হামলায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে। তবে গত সপ্তাহে বৃটিশ পার্লামেন্ট সিরিয়া আক্রমণের অনুমোদন দেয়নি। তাই যুক্তরাজ্য আপাতত সিরিয়া আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে বলে মনে হয়। সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উচ্চমাত্রার বলে ভাবা হয়। সোভিয়েত আমলে রাশিয়ার সরবরাহকৃত কিছু আধুনিক অস্ত্র-সামগ্রী এবং চীনের সরবরাহকৃত বেশ কিছু অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থাও মোতায়েন আছে দেশটিতে।
যুক্তরাষ্ট্র সীমিত আকারে সিরিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমেরিকা কর্তৃক সিরিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি আজ জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমগ্র আরব বিশ্ব এবং বিশেষ করে ইরানের উপর মার্কিন কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে সিরিয়া। আর তাই হয়তো আমেরিকা চাচ্ছে সবার আগে সিরিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে। কিন্তু আমেরিকার জনগণ সিরিয়া আক্রমণ সমর্থন করেন বলে মনে হয় না। তারা মনে করেন আমেরিকা ইরাক যুদ্ধের মত আরেকটি যুদ্ধে জড়ানো ঠিক হবে না। ছুতা নাতা ধরে সিরিয়া আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে শুভ হবে না। বিশ্ব বিবেককে উপেক্ষা করে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে ওবামার যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া আক্রমণ করলে একদিন তাকে এর মাশুল দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদী মানুষেরা রাস্তায় নেমে আসবে— যা ওবামা প্রশাসনের জন্য শুভ হবে না।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ১৯৯৬ সালে আমাদের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান যোগ করা হয় এবং সে অনুযায়ী ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল শুরু হয়। এটাই গণতান্ত্রিক রীতি। ২০০৭ সালে এক এগারোর পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যে সরকার ক্ষমতা দখল করে তা প্রকৃতপক্ষে সংবিধান সম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তাদের শাসনকাল প্রায় পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখতে গেলে দেখা যাবে সরকার এ সময়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত বর্তমান সরকার জনগণের কোন সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে সরকার নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।
এ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর খানেক পর থেকেই শেয়ার বাজারে ধস নামে। শেয়ার বাজার কেলেংকারির মাধ্যামে দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে তারা বার বার রাস্তায় নেমেছে, পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছে, রাস্তায় শুয়ে থেকেছে, আত্মহত্যা করেছে। টেলিভিশনে দেখেছি তাদের কান্না, তাদের আর্তনাদ, তাদের অসহায় চিত্কার। কিন্তু এ চিত্কার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্ণ-কুহরে প্রবেশ করেছে বলে মনে হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা শেয়ার বাজার থেকে লুট করেছে যার বেশির ভাগ বিদেশে পাচার হয়েছে। লুটেরারা, আত্মসাত্কারীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বার বার বিচারের দাবি উঠলেও কিছুই করেনি সরকার। জনগণ এসব কথা ভুলে যায়নি। পদ্মা সেতুর কেলেঙ্কারির ঘটনা দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ঘুষ কেলেঙ্কারির ফলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পটি থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে। দুর্নীতিবাজ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এ সবকিছুই জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক, ভূমিহীন, ক্ষেত-মজুর হয়ে ওঠে দিশেহারা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় খাদ্যে বিষ মেশানোর প্রক্রিয়া। ফরমালিনসহ অন্যান্য বিষাক্ত ক্যামিকেল মিশিয়ে মুনাফা লোভীরা মুনাফার পাহাড় গড়তে থাকে; আর অসহায় দেশবাসী রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বের অন্য কোন দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। অথচ দেশের ‘মহাজোটের গণতান্ত্রিক সরকার’ এ সব বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্বিকার। বর্তমান শাসনামলে দুর্নীতি এ যাবত্ কালের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এ আমলে দুর্নীতির সর্বশেষ ঘটনা হলমার্ক জালিয়াতি। সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকেই চার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। অত্যাচার, অনাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষণ বঞ্চনার ফলে সরকার আজ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মনে রাখা দরকার যে ক্ষমতার উত্স জনগণ; বন্দুকের নল বা অন্যকিছু নয়। যারা এ সত্য উপলব্ধি করেন তারাই জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, আর যারা এতে বিশ্বাস করেন না তারা জনগণের রায়ের তোয়াক্কা করেন না। কোন প্রকারে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন। এভাবে অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা শাসকচক্রকে সম্পূর্ণরূপে অসাধু এবং নীতিহীন করে তোলে। Absolute power corrupts absolutely. দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানে বাংলাদেশের ভাগ্যে তাই ঘটেছে।
আগামী ডিসেম্বর/জানুয়ারি মাসে বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল শেষ হতে যাচ্ছে। শুনা যাচ্ছে আগামী জানুয়ারি (২০১৪) মাসে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সরকারি দল নির্বাচন প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ঘোষণা এসেছে বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীগণ স্বপদে বহাল থাকবেন। সংসদও বাতিল করা হবে না। তাঁদেরও সদস্যপদ বহাল থাকবে। তাদের সমমনা এবং তাদের গৃহপালিতরা নির্বাচনে অংশ নিবেন। এভাবে নির্বাচনের নীল নক্শা তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের প্রহসনের নির্বাচনের ফলাফল আগেই নির্ধারিত থাকে। সঙ্গত কারণে প্রধান বিরোধী জোট নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ধরনের নির্বাচন যে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। অতীতের মত এবারও জনগণ চায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ অবাধ ও সুষুম নির্বাচন। সরকারের পরিকল্পনায় তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে যা হবার তাই হবে। জনগণ এ ধরনের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান এবং প্রতিরোধ করবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ এক সংঘাতের সৃষ্টি হবে। এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে। তবে শান্তিপূর্ণভাবে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের জন্যে ব্যবস্থা নিলে এবং সকল দল ও জোটের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা গেলে এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই বর্তমান সংকটের নিরসন হতে পারে ।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী
