দেখতে দেখতে ছয়টি বছর পেরিয়ে গেল। ২০০৭ সালের নয় সেপ্টেম্বর। সকাল ৭টা হবে। সবাইকে কাঁদিয়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক চিরচেনা স্বদেশভূমির মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না-তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও কেশবপুরের মানুষের কাছে। নিয়তির অমোঘ নিয়মে চলে গেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সবই আছে আজও অনেকটা আগের মতোই। নেই শুধু তিনি। আর তাঁর হাতে গড়া কিছু মানুষের চরিত্র পাল্টেছে, স্বার্থের কারণে।
আজ তাঁর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর চলে যাওয়ার দিনে তাঁকে শ্রদ্ধাবনত-কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি। কেশবপুরের সন্তান হিসাবে এবং তাঁর রেখে যাওয়া বিশ্বাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার শপথে। কেশবপুরের চিরচেনা জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে সারাদেশকে পরম মমতায় কাঁদিয়ে চলে গেছেন চিরদিনের জন্য। কিন্তু জীবনে চলার পথে কঠিন সময়ের মুখোমুখি যখন হই তখন তাঁর রেখে যাওয়া পরামর্শগুলো চলার পথকে সহজ করে দেয়। স্বপ্নেও তাঁকে দেখি বড় বিপদে কিংবা সংকটে। স্বপ্নে দেখা লাল টগবকে চোখে সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন কী হয়েছে এগিয়ে যাও। দেখা যাবে। সাহস তখনই পাই-আবার পথ চলতে শুরু করি। সত্যিই সংকট একসময় কেটে যায়।
১৯৯৩ সাল থেকে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত আমি-আমার পরিবার তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে ছিলাম। আজও আছি। তাঁর যোগ্য সহধর্মিনী, ছেলে-মেয়ে সবাইকেই মনে রেখেছি আজও। তাই তাঁর চলে যাওয়াকে আজও মনে হয়, এ যেনো রক্তের কারো চলে যাওয়া। আমার সন্তান-স্ত্রীকে তিনি বড় ভালবাসতেন । যখনই সামনে পেতেন কাছে নিয়ে জড়িয়ে আদর করতেন। এ স্মৃতি ভুলবার নয়। তাঁর কথা মনে পড়ে প্রতিক্ষণে। কখনো আপন মনে, কখনো পরিবারের সঙ্গে আলাপচারিতায় জীবনের যতসব মধুর-বেদনার স্মৃতি সব যেনো উজাড় করে দিয়ে একটু হালকা হতে চাই কখনো কখনো।
মরহুম সাদেক সাহেব ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে সরকারের যুগ্ম সচিব থাকাকালে সরকারি বাসায় গেরিলা বাহিনীর অস্ত্র-গোলাবারুদ রাখা হতো। গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিলো মরহুম সাদেক সাহেবের বাসা। এজন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে নয় মাস ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ সেলে রেখেছিলো তাঁকে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কেশবপুরের ভৌগলিক অবস্থান থেকে প্রথম নৌকা প্রতীকের বিজয় ছিনিয়ে আনলেন। আবারও ২০০১ সালে। আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন। শিক্ষার গুণগত মানউন্নয়নই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন আনা ছিল তার বিশেষ অবদান। আজ বেশি মনে পড়ে তাঁর কথা। দেশের শিক্ষাবিদরা বলছেন শিক্ষায় পাসের হার বাড়ছে-কিন্তু মান কমে যাচ্ছে। এ কথা তিনি টের পেয়েছিলেন আরো এক যুগ আগে। আসলে যারা তাঁকে কাছ থেকে না দেখেছে তারা কখনোই জানবেন না যে তিনি কতটা দূরদর্শী ছিলেন।
বাঙালি-বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার সঙ্গে নিজের সময় উপযোগী সিদ্ধান্তকে সমগ্র বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে তাঁকে। যদিও দলীয় সংকীর্ণতার কারণে তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে নির্লজ্জভাবে একুশে পদক পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গতবার মরণোত্তর সে মর্যাদা তাঁকে দিয়েছেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কেশবপুরবাসীর হয়ে কৃতজ্ঞতা। তবে তিনি জীবনে এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেখে গেলে সেটা নিশ্চয় তাঁর মৃত্যুকে বাড়তি শান্তি দিতে পারতো। আসলে আমরা জীবদ্দশায় খুব কম লোককে সম্মান জানাতে পারি।
তাঁকে নিয়ে আমার স্মৃতি আমৃত্যু লিখেও শেষ হবে না। তাঁকে নিয়ে শুধু শুরু করা যায়-শেষ করা যায় না। এটিও বলবো দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতির, প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে আজকের সংগ্রামে তাঁর বড় প্রয়োজন ছিল। তাঁর রুচিবোধ, মানবিকতা, আচার-ব্যবহার রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, আইনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ এবং সর্বোপরি ধর্ম-বর্ণকে ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন মানুষ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানব সত্যকে তিনি শুধু বিশ্বাস করেননি। মানতেন সেভাবেই।
স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ ও স্মরণসভা: মরহুম সাদেকের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে এবারই প্রথমবারের মতো ঢাকার পিআইবিতে অনুষ্ঠিত হয় স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও সাদেক স্মরণসভা। আবু শরাফ সাদেক মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এ সভা। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, নূরুল ইসলাম অনু, সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সাইদুজ্জামান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দত হুসাইন, এ জেড ইসলাম, জিয়াউদ্দিন, সাবেক রাষ্ট্রদূত সেলিনা মহসীন, এ কে আজাদ চৌধুরী, আবুল হাসান চৌধুরী, এনাম আহমেদ চৌধুরী, ইসমত কাদির গামা, মীর কাশেম, যুগ্ম সচিব মশিয়ার রহমান, ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম, এ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি, ড. মো. হান্নান প্রমুখ তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন মরহুমার পত্নী ইসমাত আরা সাদেক।
লেখক :সাংবাদিক
[email protected]
