দেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে সর্বত্র চলছে কেবলি বাকযুদ্ধ। বড় দুই দল বা জোটের নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে মিডিয়ায় অংশ নেয়া বেশির ভাগ সাংবাদিক, আলোচক, লেখকও হয় বাকযুদ্ধ, নতুবা কলম যুদ্ধে লিপ্ত আছেন। একজন একটি বলেছেন তো অন্য সবাই তা নিয়ে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন। মনে হচ্ছে বাঙালি বাকযুদ্ধ করতে বড় বেশি পছন্দ করে, তাতে কারো কারো হয়তো বেশি ‘কদর’ বাড়ে, ‘সুখ্যাতি’ ছড়িয়ে পড়ে। চায়ের দোকানেও সেই বাকযুদ্ধ এখন গিয়ে গড়িয়েছে। দু’-একটি টিভি চ্যানেল তেমন দৃশ্য (জানিন না এ্যারেঞ্জড কিনা) ধারণ করে ‘সাধারণ মানুষের অসাধারণ ভাবনা-চিন্তা’ বলে প্রচার করে থাকে। ব্যক্তিগতভাবে আমারও সৌভাগ্য হচ্ছে কিছু টিভি টকশোতে অংশ নেয়ার, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে নিজের মতামত উপস্থাপন করার। বলতে আমার কোনো সংকোচ নেই, রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগ কথাই বাদানুবাদ ও বাকযুদ্ধে যেমন পরিণত হচ্ছে, আলোচক-লেখকদেরও আলোচনা এবং লেখালেখিও বাকযুদ্ধের সীমানার বাইরে খুব বেশি যেতে পারছে না। এর কারণ হচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে মূল দলিল, তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি-তর্ক, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চেয়ে নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও দলীয় অবস্থানই প্রধান হয়ে দেখা যায়। দেশের সংবিধান, আইন-কানুন সমস্যা-সম্ভাবনার বিষয়সমূহ দায়িত্বশীলতার অবস্থান থেকে দেখার বা উপস্থাপনের নজির দুর্ভাগ্যজনক হলেও খুব একটা বেশি নয়। এখানেই মূল সমস্যা। এই সমস্যা রাজনীতিতে যেমন একাডেমিক এবং প্রচার মাধ্যমেও সমানভাবে বিরাজ করছে। সবাই আমরা সব বিষয়ে ‘বিশেষজ্ঞের’ মতো কথা বলেই চলছি, বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে চলছি।
টিভি টকশতো দুই দলেরই নয়, সুশীল সমাজেরও কেউ কেউ তেমন আচরণই করে থাকেন। ফলে বিষয়ের গভীরে যাওয়া বা জানার সুযোগ খুব একটা হয় না। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষের অবস্থান দেখেও মনে হয় তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তবতার চেয়ে নিজস্ব সুবিধা, বিশ্বাস ও অবস্থানই অনেকের কাছে মুখ্য। অথচ ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬-০৮ সময়ে যে ৪টি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল তাদের প্রকৃত অবস্থান নৈর্ব্যক্তিকভাবে খুব একটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয়েছে বলে মনে হয় না। অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা বিধান কে করতে পারে, কিভাবে করা যেতে পারে— সেদিকে কোনো মনোযোগ সামগ্রিকভাবে নেই। অথচ যে কোনো আলোচনার টেবিলে এ নিয়ে দু’টো পরস্পর বিরোধী পক্ষ হয়ে যান আলোচকগণ। বিরোধী পক্ষ হওয়ার ক্ষেত্রেও বাকযুদ্ধই দৃশ্যমান, তথ্য-উপাত্ত বা যুক্তি নয়। এ ধরনের বাস্তবতা সমাজের সর্বত্র এখন ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে যে সমস্যাটি গভীরতর হচ্ছে তাহলো, বাস্তবতাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা, ঘাটতি নিরসনে উদ্যোগী হওয়া, করণীয় নির্ধারণে সৃজনশীল হওয়া ইত্যাদি।
রাজনীতিতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হতেই পারে। তাতে যদি নতুন করে কোনো সংকট দেখা দেয়, তা যদি স্বীকার করা না হয়, তাহলে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে আঁকড়ে ধরে থাকা কোনো রাষ্ট্র বিজ্ঞানের আদর্শ পাঠ হতে পারে না। আমাদের সংবিধানে তত্ত্বাবধায় সরকার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির পর তিনটি নির্বাচন হয়েছে, ৪টি সরকার কার্যকর ছিল। এই সময়ে রাজনীতি, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা নিয়ে সংকটের তীব্রতা দেশটাকে কোথায় নিয়ে গেছে, কেন ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করার সঙ্গে বিপন্ন বোধ করে, বিরোধী দল হামলে পড়ে, উজ্জীবিত হয়ে যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি কার কাছে বেশি আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হয়, নিরপেক্ষতা কতোখানি তাতে ভূলুণ্ঠিত হয়— এর তীব্র প্রভাব গিয়ে নির্বাচনে যখন পড়ে তখন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মর্মবাণী আসলে নির্ভৃতেই কাঁদে। সে কারণেই ২০০৬ সালে বিএনপি সত্যিকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মতো ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। নিজস্ব রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আসলে বসিয়ে কার্যত ৪ দলীয় জোটের প্রেতাত্মাকেই রেখে দিয়েছিল।
২২ জানুয়ারিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার আয়োজন সম্পন্ন করেছিল— সেটি কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘শৌর্য বীর্যের’ উপস্থাপনা বহন করে? এখন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করছে, জনগণের মধ্যেও এমন প্রচারণাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার অন্তর্বর্তীকালীন যে সরকারের কথা একটু-আধটু বলছে তা এখনো কারো কাছে খুব একটা স্পষ্ট হয়নি। সংবিধানে এ সংক্রান্ত যেসব বিধান আছে তা নিয়ে সরকারের হোমওয়ার্ক আসলে কতোটা আছে তা জানা নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কেউ যখন এ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা বলেন তখন বাকযুদ্ধ নতুন করে রূপ নেয়। তা নিয়ে দেশ ক’দিন আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, সরকার বোধহয় নতুন করে কোনো ষড়যন্ত্র আঁটতে বসেছে— এমন বাক্য ছুঁড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা সন্দেহ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, নান বিভ্রান্তিও তাতে বেড়ে চলছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দান, মিডিয়ার প্রতিদিনের উপস্থাপনা নাগরিক সমাজের আলাপ-আলোচনায় কেবলি অর্থহীন তর্ক ও বাকযুদ্ধ চলছে। মনে হচ্ছে এটি চলতেই থাকবে। বিষয়টি যেহেতু সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবেই অনুমিত হচ্ছে তাই শঙ্কা, আশঙ্কা উত্কণ্ঠা-উদ্বেগ বল্গাহীনভাবে বেড়ে চলছে আগামী নির্বাচনকে নিয়ে। এখন বিরোধী দল থেকে বলা হচ্ছে, ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙ্গে দেয়া না হলে, তার আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে রেলপথ, রাজপথ অবরোধ করা হবে, তাতে সরকার পালাবার পথ খুঁজে পাবে না। কথাটি শোনার পর অনেকেই মনে করছেন যে, এটি বোধ হয় সম্ভব হবে। কেননা তখন সরকারের মেয়াদ শেষ।
সরকারকে তখন অবরোধ করে দেশ ছাড়া করা বোধ হয় সম্ভব। সামন্ত রাজতান্ত্রিক যুগের বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা থেকে এমনটি ভাবাই যেতে পারে। কিন্তু এখন তো সেই যুগ নেই যখন রাজাই সংবিধান। রাজাকে তাড়িয়ে দিলে সংবিধানও আস্তা কুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য। এখন গণতান্ত্রিক যুগ। সরকার আসে-যায়, সংবিধান থাকে। সরকারের আসা-যাওয়ার বিধানটি নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল করতে হয়, সরকারকে রাজতন্ত্রের যুগের দেশ ছাড়া করে তা করা সম্ভব নয় মোটেও। সেটি করতে গেলে রাষ্ট্র ক্ষমতার সংকট সমাধানে সাংবিধানিকভাবেই ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং শেখ হাসিনার সরকারকে ২৫ অক্টোবরের পর রাস্তাঘাট অবরোধ করিয়ে দেশ ছাড়া করতে গেলে যে সংকট তৈরি হবে সেটি বিএনপি বোঝে না তা বোধ হয় ভাবা ঠিক হবে না। এটিও আসলে বাকযুদ্ধ থেকেই করা হবে ভাবলে অত্যুক্তি করা হবে না।
তবে আসল বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের বাস্তবতাকে না দেখা, ব্যবহার করার বিষয়টিকে অবজ্ঞা করা, সেদিকে মনোযোগী না হওয়া। প্রশ্ন হচ্ছে, কী সে বাস্তবতা? উত্তরে বলতে হবে, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার কাজটি দলগুলো কোনোকালেই করতে চায়নি, এখনো চাচ্ছে না। বরং নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে নানা ধরনের নির্দয় মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে, এক্ষেত্রেও বাকযুদ্ধ যেমন চলছে, আবার নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টিরও কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব সমস্যার পরও বলতে দ্বিধা নেই দেশের সকল দলই জানে, নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন একটি ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা রয়েছে, আচরণবিধি রয়েছে, নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দলগুলোর নেতাকর্মীরাও এখন আগের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দেশের জনগণ নিজেদের ভোটকে পবিত্র আমানত হিসেবে মনে করছে। তাই জনগণের ভোট কেড়ে নেয়ার চেষ্টা কেউ করে রক্ষা পাওয়ার দিন নেই।
বাংলাদেশে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের এ ধরনের অগ্রগতি যতোটা ঘটেছে তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কোনো সরকারেরই নেই। ফলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে এখন যতো বাকযুদ্ধ শোনা যায়, যতো ধরনের আশঙ্কা, কারচুপির কথা শোনা যায় তা অনেকের অগ্রিম ভাবনামাত্র, বাস্তবে আদৌ তা ঘটা সম্ভব কিনা তা নিয়ে বিরোধী দল কতোটা সন্দেহ করে এ নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। কেননা তেমন কিছু করতে গেলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কোথায় নেমে পড়বে তা সকলেই বোঝে, তাতে বিএনপিই লাভ হবে। বিএনপি লাভবান হবে— এমন অবৈধ কাজ আওয়ামী লীগ করতে যাবে কেন? আওয়ামী লীগ মনে হয় না ততোটা বোকা। আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক ধারায় ফিরে আসতে চায় একটি সম্মানজনক জয়-পরাজয়ের অবস্থানকে নিশ্চিত করার জন্য। সেটা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য জয় বয়ে আনবে কিনা— বলা সম্ভব নয়, তবে বিএনপির জন্যও একই অবস্থাই সেটি ভবিষ্যতে তৈরি করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপি রাজনীতির এমন সম্ভাবনা কম বোঝে না। তবে বিএনপির জন্য তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি আপাতত রাজনীতির হাল ধরে রাখার বেশি কিছু নয়, সরকারে জন্যও অনেকটা তাই। তবে উভয়েই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হবে— এমনটিই মনে হচ্ছে। তখন পরিসমাপ্তি ঘটবে সকল বাকযুদ্ধের।
লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
