নদী দেশের প্রাণ। নদী-নালা বিহীন দেশ মানে মরুভূমি। জীববৈচিত্র্য, বৃক্ষ তরুলতা বিহীন দেশ। আমাদের দেশ নদী-নালায় ভরপুর ছিল, নদী-নালা ছিল জালের মত। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো এখন মরতে বসেছে। যত্নবান না হওয়ায় নদী ভরাট হয়েছে। নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে। এবার তেমন বৃষ্টি না হওয়ায় দেশে বন্যা হয়নি। শুরু হয়েছে নাব্যতা সংকট। নদীতে তলানী পড়ার প্রেক্ষিতে নৌচলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে দেশ ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাবে। নৌ-চলাচল চালু রাখতে হলে নদী ড্রেজিং এর বিকল্প নেই। নদী ড্রেজিং হয় না বলেই এমন অবস্থা হয়েছে, চর পড়ছে।
বাংলাদেশে নদ-নদী ভরাটের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। নদী আর জমির উচ্চতা প্রায় এক লেভেলে চলে আসছে। নদীতে তলানী পড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে, নৌ-চলাচলের জন্য ক্ষীণধারাটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে মত্স্য সম্পদ টিকে থাকার জায়গা কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশটি মরুভূমিতে পরিণত হবে। দেশের মানুষ হবে সহায়-সম্বলহীন, নিঃস্ব। ঘটবে পরিবেশ বিপর্যয়। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নদীর নাব্যতা রক্ষায় গুরুত্ব দেয়া। নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করে পরিপূর্ণ ধারণক্ষমতায় ফিরিয়ে নেয়া। এই কাজটির জন্য নদী ড্রেজিং হল অন্যতম পথ। নদী ড্রেজিং কাজটি শুরু করার জন্য বর্তমান সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় আমরা খুবই আশান্বিত হয়েছিলাম, কিন্তু জোরালো কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নদী যখন প্রবল স্রোতস্বিনী থাকে এটাই যথার্থ সময়।
নদী ড্রেজিং এর জন্য নিতে হবে দীর্ঘ মেয়াদী মহাপরিকল্পনা। ভরা বর্ষায় নদী ড্রেজিং আর শুষ্ক মৌসুমে নদী ড্রেজিং কাজ হবে ভিন্ন প্রকৃতির। এখন নদীতে প্রবল স্রোত, বর্ষাকালে স্রোতস্বিনী নদীর চরের বালি ঘেটে দেয়া বা ড্রেজিং পাম্প এর মাধ্যমে ড্রেজিং বালি স্রোতে ছেড়ে দিতে দিতে এগুতে থাকলে অনায়াসে চর অপসারিত হবে। তবে এর আগে নদীর পুরাতন নকশা অনুযায়ী নদীর এলাকা নির্ধারণ কাজটি হবে অন্যতম কাজ। একথা ঠিক যে, চর অপসারণ কাজটি স্রোতহীন সময়ে করা সম্ভব নয়। স্রোতহীন শুষ্ক মৌসুমে নদীর দু’তীর ভরাট করে নদীর প্রস্থ কমিয়ে নদীকে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে দীর্ঘকাল যাবত্ ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের পৈত্রিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। সেই সাথে নদীর তীর রক্ষায় নিতে হবে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। নদীর বাঁক কেটে সোজা করলে নদী শাসনের মত ঝামেলার কাজটিও কমে যাবে। এ কারণে স্রোত থাকা অবস্থায় এখনই প্রধান নদীগুলোর ভাটি অংশ থেকে নদী ড্রেজিং কাজটি শুরু করা দরকার। অর্থাত্ পদ্মার ফরিদপুর অংশ, যমুনার আরিচা অংশ এবং মেঘনার দাউদকান্দি অংশ থেকে নদী ড্রেজিং কাজটি শুরু করা যায়। একই প্রক্রিয়ায় নদী ড্রেজিং কাজটি ধাপে ধাপে সকল নদীতে সম্পন্ন করতে হবে। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে নদীর মাঝামাঝি অংশের ড্রেজিং বালি বা ঘেটে দেয়া বালি স্রোতের টানে যেয়ে বঙ্গোপসাগরে বিশাল ভূখণ্ড জাগিয়ে তুলবে। এই প্রক্রিয়ায় নদী ড্রেজিং এর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। বাঁক কর্তন করে সোজা করে দিতে হবে। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর মূল অংশকে অটুট রেখে বাকি দু’কুল ভরাট কার্য সমাধা করতে হবে। আমরা সবাই অবগত যে দীর্ঘকালের ব্যবধানে ৫-৬ কিলোমিটার প্রস্থ যমুনা নদী বর্তমানে অনেক স্থানে ১২-১৩ কিলোমিটারেরও অধিক প্রস্থ হয়েছে। এ অবস্থা প্রায় সকল নদীর। স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা ও মানুষের বাড়ীঘর ভেঙ্গে এমনটা হয়েছে। নদী ড্রেজিং বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রক্রিয়ায় বাড়ী-ঘর, জমিজমা হারানো মানুষদের সম্পত্তি ফেরত দেয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা (ব্রহ্মপুত্র), কর্ণফুলী, তিস্তা। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি এসেছে ভারত থেকে আর বাকি ৩টি এসেছে মায়ানমার থেকে। তথ্যমতে, বাংলাদেশে নদ-নদী ও উল্লেখযোগ্য খালের সংখ্যা প্রায় ৭০০টির মত। ইতোমধ্যে অনেক নদ-নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে, ধীরে ধীরে সবগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মধ্যে পড়েছে। নদী ড্রেজিং বিহীন অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সকল নদ-নদীই নিঃশেষ হবে। তাই যাতায়াতের জন্য নৌপথকে প্রাধান্য দেয়া হবে অন্যতম কাজ। বাংলাদেশে জালের মত ছড়িয়ে ছিল নদী-নালা, খাল-বিল । এদের রক্ষায় আমরা যথার্থ দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। এখন নদ-নদী, খাল-বিলের গভীরতা বৃদ্ধির বিষয়ে শুধু পরিকল্পনা নিলেই চলবে না, বাস্তবায়নে কঠোরতা অবলম্বন দরকার। আর খাল-বিল, নদী-নালার গভীরতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়নে যাবে সরকার। তখন সরকারের এ যথার্থ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। প্রকল্পটি যথাযথ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অপচয় ও গোজামিল রোধে কঠোরতা অবলম্বন দরকার হবে। তা না হলে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে ব্যয়ের এই বিরাট বোঝা সমস্যা সমাধানে কোন ফল বয়ে আনবে না।
তথ্য মতে, বর্ষাকালে নদী প্রবাহের ৭% দেশের বৃষ্টির পানি, সীমান্তের ওপার থেকে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসে ৫১%, গঙ্গার মাধ্যমে আসে ২৮%, মেঘনার মাধ্যমে আসে ১৪%। মোট কথা বর্ষাকালে মোট পানির ৯৩% আসে সীমান্তের ওপার থেকে। এই পানি নদ-নদীতে ঠাঁই পায় না বলে ফসলের জমি, বাড়ি ঘরে আঘাত হানে, সবকিছু ভাসিয়ে দেয়। দেশের নদ-নদীর নাব্যতা নেই বলে এমনটা হচ্ছে। আর এদের সাথে যুক্ত হয়েছে, নাব্যতা হারানো শত শত খাল-বিল। এই খাল-বিলগুলোও ভরাট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় হাকালুকি হাওর, চলনবিলের মত অসংখ্য বিল আমরা অযত্ন অবহেলায় নিঃশেষ করতে চলেছি। এ বিল দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করছি। হাওর, বাওড়গুলো প্রকৃতির সৃষ্টি। প্রকৃতিকে বাধা দেয়া অন্যায়। তাই প্রকৃতি অন্যায়ের শোধ নিচ্ছে। এর সাথে আরো যে বিষয়টি যুক্ত হচ্ছে নির্বিচারে পাহাড়, টিলা কর্তন, গাছ-পালা নিধন। ফলে পরিবেশের উপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। সব মিলিয়ে করুণ অবস্থায় নিপতিত আজ বাংলাদেশ। এ থেকে উত্তোরণের জন্য প্রয়োজন সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি। আর নিতে হবে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ।
বর্তমানে নদী ড্রেজিং বিষয়ে প্রথম কাজ হবে নদ-নদীর নকশা অনুযায়ী মূল জায়গা নির্ধারণ করা। গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া। নদীর দেশ বাংলাদেশে নৌপথকে প্রাধান্য দেয়া। কারণ নৌপথ অনেক আরামদায়ক। মালামাল পরিবহন ও ভ্রমণে খরচ অনেক কম, একথা আন্তর্জাতিকভাবে সত্য। দেশকে মরুভূমির হাত থেকে রক্ষায় নৌপথের উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। বিগত দিনে নৌপথকে অবহেলা করেছি বলে নদীতে চর পড়েছে, ভরাট হয়েছে। মত্স্য সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এদেশের ২-৪টা নদী ছাড়া সবগুলোই কোন কোন স্থানে শুকিয়ে যায়। মাছ থাকার জায়গা কোথায়? দেশকে রক্ষা করতে হলে পরিকল্পিত ড্রেজিং এর মাধ্যমে নৌপথকে রক্ষা করা প্রয়োজন। নদীতে পূর্বের ন্যায় লঞ্চ, স্টিমার, সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। মালামাল পরিবহনে সাশ্রয়ী পথটিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তবেই হবে নদ-নদীর সংস্কার কাজটি সহজতর। আরো যে কাজটি দরকার তা’হল নদীকে বিজ্ঞানভিত্তিক শাসন। নদীর গভীরতা বৃদ্ধির কাজটি গুরুত্বের সাথে হাতে নেয়া। দেশে যে স্বল্প সংখ্যক ড্রেজার রয়েছে এগুলোর মাধ্যমে অব্যাহত ড্রেজিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ড্রেজার সংগ্রহ করা। গ্রীষ্মকালেও নদী ড্রেজিং এর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
মনে রাখা দরকার শুধু নদী ড্রেজিং সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ নয়। দেশের খাল-বিলগুলো খননের দিকেও নজর দিতে হবে। কারণ দেশে পানি আসে পানি যায়, এই গতানুগতিক ধারা পরিবর্তন দরকার। দেশের স্বার্থে খাল-বিল, নদী-নালার এই সার্ফেস ওয়াটারকে পরিকল্পিত ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়া দরকার। এর জন্য তৈরি করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী স্লুইস গেট, রাবার ডেম। আরো যে কাজটি করা প্রয়োজন তা’হল নদীর বাঁক কেটে সোজা করা। এতে পানির প্রবাহে বাধা হ্রাস পাবে। নদী ভাঙ্গনে ক্ষতির পরিমাণ কমবে, নদীতে পানি থাকবে। দেশে মত্স্য সম্পদ বাড়ানো যাবে। ইরিগেশনের জন্য পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাবে। নৌচান চলাচল সহজ হবে।
লেখক :প্রকৌশলী, বিশিষ্ট সংগঠক
