ভোট সম্ভবত সকল হিসাবের ঊর্ধ্বে। তাই একটি অঞ্চল পৌরসভায় উন্নীত হইবে কিনা, তাহাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় ভোটের অঙ্কের স্বার্থে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে, তাহাতে নূতন পৌরসভাগুলি যেন নামসর্বস্বরূপে প্রকট হইয়াছে। ইহা অনভিপ্রেত, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন অনুযায়ী একটি অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্ব, স্থানীয় আয়ের উত্স, অকৃষি পেশার শতকরা হার এবং এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করিয়া সরকার কোনো পল্লী এলাকাকে শহরাঞ্চল বা পৌরএলাকা ঘোষণা করিবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়াছে যে, বিগত দশ বত্সরে দেশের ৮৬টি পৌরসভা গঠন করা হইয়াছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায়। ফলে ওই সকল পৌরসভা এক্ষণে নাগরিকদের দুর্ভোগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পৌরসভা গঠনের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিলেও সুযোগ-সুবিধার কোনো হেরফের হয় নাই। তাহা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রহিয়া গিয়াছে। পয়:নিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নাই বেশিরভাগ পৌরসভাতেই। সড়ক বাতি কোন ভিনগ্রহের প্রদীপ যেন! এমনকি অনেক জায়গায় পৌর ভবনও নাই। তাহার পরও তাহারা ‘পৌরসভা’ বটে।
দেশে এক্ষণে মোট পৌরসভার সংখ্যা ৩২১টি। ইহার ভিতরে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা না করিয়া গত এক দশকে দুই সরকারের জামানায় যথাক্রমে ৬৫ ও ২১টি পৌরসভা গঠন করা হইয়াছে। জানা গিয়াছে, অতীতে শুধু ভোটের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য পৌরসভা গঠন করা হইয়াছে। বর্তমানেও সেই ধারা যতোটা সম্ভব আইনের ভিতরে থাকিয়া চালু রহিয়াছে। তবে শুধু এই ৮৬টি পৌরসভাই নহে, ছয় বত্সর পূর্বের সর্বশেষ জরিপে দেশে নাগরিক সেবাহীন পৌরসভা চিহ্নিত করা হইয়াছে ১৭৬টি। যেহেতু বেশিরভাগ পৌরসভা গঠন করিতে হয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে, তাই পরবর্তীতে তাহার ভিতরে দায়সারা বিষয়টি প্রকট হইয়া ওঠে। অথচ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার মতো সামর্থ্য না থাকিলে কোনো এলাকায় পৌরসভা গঠন করা এক অর্থে বলা যায় নিয়মনীতির প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখানো। নিয়ম অনুযায়ী ঘোষিত শহর এলাকায় তিন-চতুর্থাংশ ব্যক্তিকে অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকিতে হইবে, মোট ভূমির শতকরা ৩৩ ভাগ অকৃষি শ্রেণির হইবে, প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব দেড় হাজারের কম নহে এবং মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার হইতে হইবে। ইহাছাড়া যে এলাকা লইয়া পৌরসভাটি গঠন করা হইবে সে এলাকার মধ্যে পৌরসভা গঠনের অব্যবহিত পূর্বের তিন বছরের রাজস্ব আয় হইতে হইবে ২০ লাখ টাকা। সমস্যা হইল, কোনো এলাকার স্থানীয় আয়ের উত্স, অকৃষি পেশার শতকরা হার এবং এলাকাটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব যদি সম্ভাবনাময় না হয়, তাহা হইলে ওই এলাকা পৌরসভায় উন্নীত হইলেও তাহার নিজস্ব রাজস্ব বলিতে কিছু থাকিবে না। ইহার বিপরীতে শর্ত মানিয়া পৌরসভা গঠন করিলে তাহার বিকশিত হইবার ক্ষেত্র থাকে, সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাইবার সুযোগও থাকে। অন্যথায়, অপ্রয়োজনে শুধু ভোটের অঙ্ক মিলাইতে পৌরসভা গঠন করিলে তাহা শুধু সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল হইয়া পড়ে। এইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান চলিতে পারে না। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।
এই সকল পৌরসভা নামধারী এলাকাসমূহের সরকারি বরাদ্দ লইয়াও আমরা বিভিন্ন অনিয়ম দেখিতে পাই। নির্বাচিত মেয়র সরকারি দলের সমর্থক হইলে বরাদ্দের অর্থ বৃদ্ধি পায়, অন্যথায় ওই পৌরসভার ভাগ্যে বরাদ্দের সিকে ছেঁড়ে না। দু:খের বিষয় হইল মেয়র মহোদয়দের সরকারি বরাদ্দের দিকে যতোটা না নজর, তাহা হইতে অধিক কম নজর নিজস্ব রাজস্বখাত সৃষ্টি করিতে এবং স্বাবলম্বী হইতে। নিজ নিজ এলাকার প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌরবাসীর যথার্থ সেবা দিতে আন্তরিক হইলে একটি অনুন্নত এলাকাও হয়তো পৌরসভার সত্যিকারের তকমা পাইতে পারে। বুঝিতে হইবে, কোনো এলাকাকে পৌরসভার উন্নীত করা হয় শুধু ভোটের হিসাব মিলাইতে নহে, নিজেদের আখের গোছাইতেও নহে, তাহা আপামর জনগণের জীবনযাপনের উত্তরণ ও উন্নয়নের জন্য।
