বাঘাযতীনের আসল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তবে তাঁর নামের আগে ‘বাঘা’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে মজার এক গল্প। ছোটবেলা থেকেই যতীন ছিলেন গোঁয়ার প্রকৃতির। একবার জঙ্গল থেকে একটি বাঘ হঠাত্ গ্রামে ঢুকে যতীনকে আক্রমণ করে। যতীনের হাতে ছিল তখন সামান্য একটি চাকু তাই দিয়ে সে বাঘটিকে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে নিজেও ক্ষতবিক্ষত হলেন। তবুও যতীন ছাড়বার পাত্র নয়, ঐ ছুরি দিয়েই বাঘের জীবনলীলা সাঙ্গ করে দিয়েছিলেন। তাঁর এই দুঃসাহসিক ভূমিকার জন্য সেদিন থেকেই তাঁর নামের আগে ‘বাঘা’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। তিনি যতীন থেকে হয়ে গেলেন ‘বাঘাযতীন’।
বাঘাযতীনের জন্ম ১৮৮০ সালের ০৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কয়াগ্রামে। তাঁর পিতার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম শরত্শশী দেবী। খুব ছোটবেলায় পিতৃহারা বাঘাযতীনের জীবনে মা-ই ছিল সব। সত্যি কথা বলতে কি, দেশের জন্য জীবনকে উত্সর্গ করবার মত মহত্ অনুপ্রেরণা যতীন একদিন তাঁর মার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। তাইতো ১৮৯৮ সালে প্রবেশিকা পাস করে কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পড়াশুনা আর বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। অল্প কিছুকালের মধ্যে যতীন অনুশীলন সমিতির সদস্য হয়ে বৈপ্লবিক আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। শুরু হয় তাঁর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম।
পুলিশের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকায় বাঘাযতীনের নাম সর্বপ্রথম যুক্ত হয় ‘হাওড়া ষড়যন্ত্র’ মামলার মাধ্যমে। এই মামলায় এক বছর জেলে থাকার পর তথ্য প্রমাণের অভাবে বাঘাযতীন মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে জেল থেকে বের হয়ে প্রথমেই শুনলেন আলীপুর বোমা মামলার রায়। এই রায়ে বহু বিপ্লবীর জেল হয়ে যায়। এবার প্রতিহিংসায় গর্জে উঠলেন বাঘাযতীন। তিনি দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তাঁর একটাই স্বপ্ন ভারতবর্ষের মাটি থেকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। ফলে দুঃসময়ে বাঘাযতীন বিপ্লবীদলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি দেশের সবগুলো গুপ্ত সমিতিকে একত্রিত করে একটি বৃহত্ বৈপ্লবিক সংগঠনের রূপদানের প্রয়াস পান। এবার তিনি আন্তর্জাতিক সাহায্যের পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রথম সহযোগিতা পান চীনের মহান জাতীয়তাবাদী নেতা সানইয়ত্ সেনের কাছ থেকে। এরপর বাঘাযতীন মানবেন্দ্রনাথ রায় ওরফে এম.এন রায় এবং জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জার্মান সরকারের সহায়তা কামনা করলে ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের জন্য জার্মান সরকার জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও নগদ বেশকিছু অর্থ পাঠায়।
নির্দিষ্ট দিনে অর্থাত্ ১৯১৫ সালের ০৯ সেপ্টেম্বরে অস্ত্রবোঝাই জাহাজ গ্রহণ করতে বাঘাযতীন যখন চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন, নীরেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিষচন্দ্র নামের চার বিপ্লবীকে সঙ্গে নিয়ে বালেশ্বরে অপেক্ষমাণ তখন তাঁরা ভীষণ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। কাছে একটি খাবারের দোকান দেখে বাঘাযতীন সঙ্গীদের নিয়ে সেখানেই খেতে বসেন। এরা যে বিপ্লবী এটা কিছুটা অনুমান করে দোকানী খবরটা স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট কয়েকজন পুলিশ নিয়ে তাদের ঘিরে ফেললে শুরু হয়ে যায় দু’পক্ষের মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ। বিপ্লবীদের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণে পুলিশবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এটাই বালেশ্বরের যুদ্ধ বলে খ্যাত।
পুলিশের পিছু হটার সুযোগে বিপ্লবীরা গ্রাম ছাড়িয়ে নদী পার হয়ে অনেক দূরে চলে এসে একটি উইঢিবির পাশে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাঁরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি চিন্তামনি সাহু নামে এক ছদ্মবেশী বাঙালি দারোগা তাঁদের অনুসরণ করছিল। খবর পেয়ে বালেশ্বরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কমিশনার টেগার্ট এবং আর্মি অফিসার লেফটেন্যান্ট ব্রাদারফোর্ডের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ পুলিশ পুনরায় বিপ্লবীদের ঘিরে ফেলে। নেমকহারাম বৃটিশের পদলেহী সেই ছদ্মবেশী দারগা এবার হাতের ইশারায় উইঢিবিটি দেখিয়ে দেন। সেটা লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যরা গুলি করতে শুরু করে। কাছে আসতেই বাঘাযতীন ‘ফায়ার’ বলে চিত্কার দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক সাথে গর্জে উঠলো পাঁচটি পিস্তল। তুমুল যুদ্ধে বৃটিশবাহিনীর বহু পুলিশ সেদিন নিহত হয়।
বিপ্লবীদের মধ্যে প্রথম চিত্তপ্রিয় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। জ্যোতিষও মারাত্মক আহত হন। তিন ঘন্টা অসম যুদ্ধের পর যখন গুলি শেষ তখন বাঘাযতীনও গুলিবিদ্ধ ঐ অবস্থায় তিনি “The entire responsibility is mine” বলে চিত্কার দিতে থাকেন। উদ্দেশ্য একটাই সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে সঙ্গীদের অন্তত ফাঁসির হাত থেকে বাঁচানো। মুমূর্ষু বাঘাযতীনকে বালেশ্বর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর একদিন পর ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আজকের এই দিনে স্বাধীন মাতৃভূমির স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলার মহানবিপ্লবী বাঘাযতীনের জীবন প্রদীপ চিরদিনের জন্য নিভে যায়।
লেখক :গবেষক
