আপনদর্পণ

নব প্রত্যাশার দিগন্ত

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৫৫
“মাগো আমায় ছুটি দিতে বলো সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা এখন আমি তোমার ঘরে বসে করবো শুধু পড়া পড়া খেলা” ছেলেবেলায় শতবার পড়া এই কবিতাটি মনে পড়লো হঠাত্। তাকিয়ে দেখলাম আমার ন’বছরের নাতি আলভি ও তেরো বছরের নাতনী সারিনার দিকে। তাদের পাশে আরো অনেক শিশু-কিশোরের ভিড়। এদের জীবনে এই কবিতাটি কতোদূর সত্য ভাবছি আমি। ওদের জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা স্কুলের নানা ধরনের কঠিন কঠিন সাবজেক্ট ও কঠিনতর পাঠ্যসূচি। সকালে উঠে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে হয় স্কুলবাস ধরতে, বাড়ি ফিরতে বিশাল যানজটের যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে প্রায় অপরাহ্ন হয়ে যায়। তারপর সামান্য কিছু আহার, সামান্য কিছু বিশ্রাম অথবা টিভি সিরিয়াল, কম্পিউটার গেম্স, মোবাইল ফোনের আকর্ষণ। খেলতে খেলতেই যেন জীবন কাটছে তাদের, মায়ের ঘরে বসে ভোরবেলা লেখাপড়া করার সে সুযোগ কোথায়, তারা যে প্রচণ্ড স্ট্রেইসে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিশুদের মনের সুকুমার বৃত্তি জাগরিত হয় গাছের সবুজে, পাখির গানে, গল্প-কবিতা বইয়ের ঝকঝকে পাতায়। বছরে দু’বার গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, গ্রাম্য শিশুদের সরল জীবন, সহজ খেলা, গল্প-আনন্দ যেন সঞ্জীবনী সুধা, যার পরশ এদের জীবনে নেই। তারা সারাক্ষণ দেখছে পাশের বাড়ির গগনচুম্বী এ্যাপার্টমেন্ট, শুনছে ইট ভাঙার শব্দ, লোহার রডের বিকট আওয়াজ, ট্রাকের দুঃসহ শব্দ, লোডশেডিং-এ জেনারেটরের ভয়ানক আওয়াজে রাতের ঘুম হারাম, বুলডোজার দিয়ে দেয়াল ভাঙার কর্কশ শব্দ। এদেরকে আপনি কিভাবে ফিরিয়ে আনবেন কল্পলোকের রূপকথার জগতে। অনায়াসেই তাই তারা ডুব দিতে চায় ডিশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে। শত শত চ্যানেল, ভায়োলেন্স, ক্রাইম, ফাইটিং, ডান্সিং, টপটেন, এগুলোই যেন তাদের বেঁচে থাকার আনন্দ। আমাদের সামনে নতুন দিগন্ত সবসময়ই হাতছানি দেয়। সুপরিকল্পিতভাবে আমরা গ্রহণ করতে পারি কর্মসূচি। সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন দুস্থজনের জন্য কাজ করছেন, কিশোর সংগঠনগুলো মানসিক বিকাশে অগ্রণী হয়ে আসছেন, নানা ধরনের খেলাধুলায়, সাঁতার কাটায়, এ্যারোবিকসে শিশুদের আগ্রহ বৃদ্ধি করছেন— এর সবই শুভ লক্ষণ। হাল ছেড়ে দেয়ার দলে আমরা নই, তাই শত কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনে দোলা দেয় দেশের চিন্তা, দশের চিন্তা নিজের চিন্তার আগে। অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন সর্বাগ্রে প্রয়োজন। রমজানে যে ভিখারীর দল ভিড় জমান রাজধানীতে, এখন তারা ফিরে গেছেন নিজ নিজ গ্রামে। সেখানে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে নিজের অন্ন নিজেই রোজগার করছেন। অপমান নয়, মান ফিরে পেয়েছেন তারা। সেসব গ্রামে-গঞ্জে, হাটে ছোট ছোট আকারে কিছু উপার্জনের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। একা যা পারা যায় না, দশজন হলে তা হয়ে পড়ে সহজ। আমি তো নিজের জন্য চাচ্ছি না, অন্য কারো জন্য আপনার কাছে কিছু সাহায্যের প্রত্যাশা করে হাত বাড়ালে আমার মান যাবে না। ‘দরিদ্রকে দান করা তোমার একটি কর্তব্য, সেই দান ধনীর কাছ থেকে নিয়ে ফিরিয়ে দাও দরিদ্রকে’- (আল হাদিস) প্রতিদিন যদি কুরআন শরিফের একটি পাতা অর্থসহ পাঠ করি, হাদিস শরিফের দুটো বাণী হূদয় দিয়ে গ্রহণ করি এবং তার প্রয়োগ হয় জীবনে তা হলেই তো ঘটে যায় চরম প্রাপ্তি। আমাদের জন্য পথের নির্দেশক পবিত্র গ্রন্থ, হেরা পর্বতের গুহায় নাজিল হওয়া আল্-কুরআন, জীবনের আলো। সেই আলোতে পথের অন্ধকার দূর হয়ে যাবে, দূর হয়ে যাবে হূদয়ের অন্ধকার। আমরা রচনা করতে পারবো সত্, সুস্থ, সুন্দর সমাজ। আলোয় আলোয় আলোকিত সেই পথে আমরাই হবো অগ্রপথিক। লেখক :শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন