স্মরণ

শামছুল হক :রাজনৈতিক অঙ্গনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
‘বঙ্গরত্ন’ শামছুল হক উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নাম ও একটি ইতিহাস। সামান্য কৃষক পরিবারে ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মাতুলালয়ে দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন গ্রামে তার জন্ম। পৈত্রিক নিবাস টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠাইন টেউরিয়া গ্রামে। শৈশবে তিনি যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন এক সুদর্শন বালক। কিশোর বয়সেই অর্থাত্ নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন শামছুল হক রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রথম পদার্পণ করেন। ১৯৩৮ সালে শামছুল হক প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। শামছুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৪০ সালে লাহোর কনভেনশনে যোগদান করেন এবং State বিতর্কে State’s এর পক্ষে মত প্রকাশ করে জিন্নার বিরাগভাজন হন। ঐ সময়েই কলকাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে শামছুল হকের পরিচয় ঘটে। শামছুল হকের বিখ্যাত বই বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম শেখ মুজিবুর রহমানকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে শেখ মুজিব শামছুল হকের সাথে রাজনীতি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ১৯৪১ সালে টাঙ্গাইলের মাইঠাইনে শামছুল হকের নিজ বাড়িতে চলে আসেন শেখ মুজিব। শামছুল হককে সঙ্গে নিয়ে সেখানে একটি কর্ম-মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয়বার শেখ মুজিব দক্ষিণ টাঙ্গাইলের কর্মীদের সামনে টেউরিয়া মাঠে বক্তৃতা করেন। ১৯৪৫ সালে তৃতীয়বার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সামনে এলাসিন মাঠে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবেই দু’জনের রাজনৈতিক পথচলা। ১৯৪৬ সালে শামছুল হক পাঞ্জাব রায়ট বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং এজন্য জিন্নাহ তাকে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অর্গানাইজার খেতাবে ভূষিত করেন। এভাবেই শামছুল হক নিজেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির ছাত্রনেতা হিসেবে জাতীয় নেতাদের নজরে আসেন। রাষ্ট্রভাষার বাংলা বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শামছুল হক, শেখ মুজিব, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৮-এর ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভ ভরা রেসকোর্স ময়দানের ভাসনে শামছুল হকের no no চিত্কার আজো ভুলতে পারেননি জীবিত অনেক ভাষা সৈনিক। ১৯৪৯ সালের ২২ জুন এক বৈঠকে বসেন শামছুল হক, মাওলানা ভাসানী, বগুড়ার মোহা্মমদ আলী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, আতাউর রহমানসহ অনেক নেতৃবৃন্দ। ঐ বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় বড় মাপের একটি রাজনৈতিক দল গঠনের। ২৩ জুন ১৯৪৯ সালে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামছুল হক, যুগ্ম সম্পাদক (১) খন্দকার মোস্তাক আহম্মেদ, যুগ্ম সম্পাদক (২) শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী মুসলিম লীগের মূল দাবি নামে প্রথম মেনিফেস্টো রচনা করেন শামছুল হক। ১৯৫৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শামছুল হকের দলে যোগদান করেন। তখন থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগের নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামছুল হক হঠাত্ একদিন অন্তর্ধানে চলে যান। তার নিখোঁজ হওয়ার ৪২ বছর পর উদঘাটিত হয় তার নিখোঁজ রহস্য এবং কবরের সন্ধান। ১৯৬৪ সালে সেপ্টেম্বর মাসে জনাব শামছুল হক শেষবারের মত বাড়িতে আসেন। এক মাল্লা বিশিষ্ট জাবরার চরের নৌকায় বাড়ি থেকে চলে যান। মাওলানা মহিউদ্দিন কলকাতায় তাকে দেখতে পান। মাওলানা মহিউদ্দিন ঢাকায় ফেরার পথে শামছুল হক তার সঙ্গী হন। সিরাজগঞ্জ স্টেশনে শামছুল হক নেমে যান। স্থানীয় জনগণকে তিনি ডেকে বলতেন আমি শামছুল হক নতুন পার্টি করব খোলাফায়ে রাশেদীনের মত দেশ চালাবো, আমাকে চাঁদা দাও। যমুনা নদীর তীরে মাঝি-মাল্লাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলতেন “ঐ মাঝি নৌকা ভিড়াও জান না আমি শামছুল হক বলছি”। দিনের পর দিন এভাবে তিনি অসুস্থ অবস্থায় যোগারচর অঞ্চলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। মুমূর্ষু অবস্থা হলে এলাকাবাসী তাকে কংগ্রেস নেতা মহির উদ্দিন আনসারীর বাড়িতে পৌঁছে দেন। ৭ দিন অসুস্থ থাকার পর ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সন (গবেষণালব্ধ) শনিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর লিখিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইতে আওয়ামী লীগ সৃষ্টির পেছনে শামছুল হক কী ধরনের অবদান রেখেছেন, কি ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার সমস্ত বর্ণনা দিয়েছেন। জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের প্রতিটি কাউন্সিলেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন জননেতা শামছুল হককে। শামছুল হকের ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার পরিবারের দাবি টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ধলেশ্বরী নদীর ওপর যে সেতুটি নির্মিত হয়েছে এবং উক্ত সেতু উদ্বোধন হবে সেই সেতুটির নামকরণ যেন করা হয় “শামছুল হক সেতু”। লেখক :মরহুম জননেতা শামছুল হকের দৌহিত্র, তরুণ রাজনীতিক