[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক সমঝোতা হচ্ছে!

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৮
গত ক’দিন পূর্বে পুরাতন একটি বই নতুন করে পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। বইটি একটি গল্প দিয়ে শুরু হয়েছে। গল্পটি পাঠকদেরকে সাথে নিয়ে উপভোগ করতে চাই। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড যদিও এটিকে গল্প আকারে লিখেননি আমি এটিকে গল্পই বলতে চাই। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনীতির চরিত্র এই গল্পটির মাধ্যমে চমত্কারভাবে অনুধাবন করা যায়। ‘কমপারেটিভ পলিটিক্স টুডে’ রাজনীতির পদ্ধতিগত বিশ্লেষণের একটি চমত্কার গ্রন্থ। এই গ্রন্থটির শুরুই এই গল্পটি দিয়ে। সারা পৃথিবীব্যাপী যেখানে রাজনীতির পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ আবশ্যক মনে করা হয় সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় দেখা যায় বিশ্লেষণের জন্য কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই কোনো রাজনৈতিক গবেষকেরও। সমগ্র পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, কৃষি, অর্থনীতিসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞের মতামত আবশ্যক হয়। সকলেই এই বিষয়গুলোতে কথা বলেন না। একজন সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞ পদার্থবিজ্ঞান বা একজন অর্থনীতির পণ্ডিত জীববিজ্ঞান নিয়ে কথা বলে না। কিন্তু রাজনীতির বিশ্লেষণ এতোই সহজ এবং পদ্ধতিহীন যে এক্ষেত্রে সকলেই বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখেন। আসলে কি তাই? এমনকি শিল্প বিপ্লবের পরে সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রার পেছনেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পদ্ধতিগত প্রয়োগকেই দাবি করা হয়। অর্থাত্ সবক্ষেত্রেই বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত প্রয়োগ আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্লেষণের ক্ষমতা যেন সকলেরই রয়েছে। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, অর্থনীতির পণ্ডিত, ইতিহাসের পণ্ডিত, আইন বিশেষজ্ঞ সকলেরই আলোচনার জায়গা রাজনীতি। আসলে কি তাই হওয়া উচিত? উন্নত বিশ্ব কি এভাবেই চলে? আমি যখন সিএনএন, বিবিসি বা আল জাজিরা দেখি সব মিডিয়াতেই দেখি কোনো বিশেষ মতামতের প্রয়োজন হলে ঐ বিষয়ে যিনি একাডেমিক বৈধতা অর্জন করেছেন তাকেই কথা বলতে দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদশের রাজনৈতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণের যত আসর রয়েছে সব আসরেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। অথচ রাজনৈতিক বিশ্লেষণেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনকারী ব্যক্তির অপরিহার্য্যতা বেশি। কারণ রাজনীতি মানব আচরণ নিয়ে কাজ করে। আর মানব আচরণ সবচেয়ে অস্থিতিশীল। এই জন্য আইনস্টাইন বলেছিলেন, পদার্থ বিদ্যার চেয়েও রাজনীতি বোঝা কঠিন। সম্মানিত পাঠকদের নিশ্চয়ই এতক্ষণে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। কারণ আমি শিরোনামে মনযোগ না দিয়ে এমনকি যে গল্পটি শুরু করেছিলাম সেই গল্পটিও আপনাদেরকে না বলে অন্যদিকে চলে গেছি। আসলে এর কারণও রয়েছে। কারণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতি পাঁচ বছর পর পর যে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায় তার পেছনে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অন্য বিষয়ের পণ্ডিতদের আনাগোনাই দায়ি (যাদের একাডেমিক বৈধতা নেই)। কারণ তাদের অনেকেই অনেক সময় বুঝে না বুঝে অথবা বেশি বুঝে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে এমন চিকিত্সা প্রদান করেন যা রাজনীতি, রাজনীতির সাথে জড়িত ব্যক্তিগণ এমনকি রাষ্ট্রকেও ভুল পথে পরিচালিত করে বা করতে পারে। যাহোক গল্পে ফিরে আসি। অ্যালমন্ড লিখেছেন, রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ তিন ধরনের হয়—এক ধরনের লোক আছেন যারা রাজনীতিকে খুব ভালবাসেন। অ্যালমন্ডের মতে যারা রাজনীতিকে ভালবাসেন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। তাদের নিকটই নির্বাচন সহিংস রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় জায়গা। দ্বিতীয় প্রকারের লোকজন হলো যারা রাজনীতি দ্বারা মুগ্ধ হন। তারা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলাফল নিয়ে ভাবেন। তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বেই চিন্তা করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের সুবিধা হবে না অসুবিধা হবে। তৃতীয় প্রকারের লোকজন হলেন যারা রাজনীতিকে ঘৃণা করেন। তাদের বক্তব্য হলো রাজনীতি সহিংসতার কারণ। তাই তারা রাজনীতিকে অপছন্দ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে এই তিন গোষ্ঠীর সম্পর্ক নিয়ে একটু পরেই আলোচনায় আসব। ২। বেশ কিছু দিন পূর্বে দৈনিক ইত্তেফাকেই একটি লেখার শিরোনাম করেছিলাম ‘সমঝোতা না সংঘাত’ সেই লেখায় বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাত দিয়েই শেষ হবে সেই ধরনের উপসংহার টেনেছিলাম। কিন্তু গত কিছু দিন যাবত্ বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এমন কতিপয় উপাদানের সম্মেলন ঘটেছে যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ দ্বিধান্বিত হচ্ছেন। এই উপাদানগুলো হচ্ছে দেশি-বিদেশি নানান অবস্থান থেকে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ। গত নির্বাচনের পূর্বে সামরিক বাহিনীর পিঠে চড়ে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল তার পূর্বে রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে তত্কালীন জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির প্রচার ছিল। আগামী নির্বাচনের এখনো ঢের বাকি। কিন্তু এবার জাতিসংঘ মহাসচিব ইতিমধ্যে ফোন করেই ফেলেছেন। চিঠি দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তার আগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতগণ সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। দু’দিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উইলিয়াম হানাও রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলেছেন এবং তিনি আসা করেছেন যে, সমঝোতা হবে। সিপিডির ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বাসায় দেশের প্রভাবশালী নাগরিক ও বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে দু’দফা আলোচনার কথা পত্রিকায় এসেছে। সেই বৈঠকে দেশের দু’জন প্রভাবশালী সম্পাদকও উপস্থিত ছিলেন মর্মে পত্রিকায় আভাস পাওয়া যায়। দেশের সিনিয়র নাগরিক ব্যারিস্টার রফিক উল হকও সমঝোতার এক ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো বিএনপিও ইতিমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে হাজির হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজনৈতিক সমঝোতার অনুমান করতে পারেন। ৩। রাজনীতি হলো ক্ষমতার জন্য লড়াই। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে এই লড়াইয়ের চিত্র এক নয়। যে দেশে রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয় সে সকল দেশে ক্ষমতার লড়াই সহিংস রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা যুক্তরাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু সরকারের পরিবর্তন। এর ফলে রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত সুবিধা লাভ বিঘ্নিত হয় না। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটররা ক্ষমতায় থাকার অর্থ এই নয় যে, রিপাবলিকানরা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতার পরিবর্তন একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্যও ভয়ের কারণ। ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে কেউ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে আবার কেউ সেই সুবিধা লাভ করবে। এমনকি এই পরিবর্তন কারোর জন্য জেল, জরিমানা এমনকি মৃত্যুও নিয়ে আসে। এই অবস্থায় কারোর ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকলে অথবা নতুন কারোর ক্ষমতায় আরোহণের ফলে অন্যের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের সম্ভাবনা থাকলে ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি সকল পক্ষের— উদ্যোগ সত্ত্বেও সমঝোতা কঠিন। আর এই জন্যই রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালমন্ডরা এই রাজনীতিকে এ্যাথলেটিক গেম বলেন। আমার মনে হয় তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি হলো সহিংস এ্যাথলেটিক গেম। কারণ বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদগণ রাজনীতিকে ভালবাসেন। তারা অনেকেই রাজনীতি করেন না, রাজনীতি দ্বারা মুগ্ধ হয়। তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার উঠিয়ে দিলে বা বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে নিজের পছন্দমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্ধারণ করতে গেলে জনগণের উপরে তার কী প্রভাব পড়বে সেই বিষয়ে ভাবেন না। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে গেলে নির্বাচন কমিশনার কর্তৃক সমস্যার আশঙ্কা সমঝোতাকে ইঙ্গিত করে না। যতদূর জানা গেছে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিন রূপরেখার কোথাও শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রাখা হয়নি। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর জন্য সমঝোতায় আসবে কিনা সে প্রশ্ন রয়ে গেলো। তাছাড়া, ক্ষমতা না পাওয়ার দোলাচলে বিএনপিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য সমঝোতায় আসবে সেটা বলাও এতো সোজা নয়। বাস্তবতা হলো ৯১ পরবর্তী সবগুলো রাজনৈতিক সমস্যা রাজপথে সমাধান হয়েছে। এবার যদি আলোচনার টেবিলে হয় তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক পথ এগিয়েছে অবশ্যই মানতে হবে। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তন যেখানে কারোর অস্তিত্ব ও কারোর অস্তিত্বহীনতাকে নিশ্চিত করে সেখানে আলোচনার টেবিলে সমঝোতা এতো সহজ নয়। তাছাড়া আসলে ইউরোপ, আমেরিকাও কি সমঝোতা চায়? তবে গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতা ও আইনি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় সুবিধা বন্টন নিশ্চিত করা আবশ্যক। তখন রাজনীতি সহিংস এ্যাথলেটিক গেম হবে না। লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন