বর্তমানে বিশ্বের সর্বক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন। বাংলাদেশে যার শুরু স্বাধীনতার পরে পরে অর্থাত্ ১৯৭২ সালে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুই হয়েছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ছিল গরীব এবং বঞ্চিত। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তানই হচ্ছে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কিন্তু স্বাধীনতা প্রাপ্তির দীর্ঘ ৪২ বছর পরেও দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ তার খাদ্য ক্রয় করতে পারে না, অবশ্য খাদ্যাভাবে মানুষ মারা যাওয়ার সংবাদও পাওয়া যায় না। সারাবিশ্বের নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি অভুক্ত মানুষের প্রতি। দরিদ্র মানুষের সমস্যার মূলের কথা কেউ বলেন না বা বলতে চান না। জানি না এর কারণ কী। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া দারিদ্র্যের বিষচক্র থেকে মুক্তির অন্য কোন উপায় আছে বলে আমার জানা নেই। আর ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির একমাত্র উপায় জ্ঞান অর্জন যা শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। শিক্ষার শুরু প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। অবশ্য তারও আগে এক প্রধান সহায়তা, উপযুক্ত ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় আবশ্যক খাদ্য যা প্রয়োজন প্রসূতি মায়ের জন্যে, মায়ের পেটে শিশুর উপস্থিতির সাথে সাথে ।
দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় কর্ম সৃষ্টির ক্ষেত্র হচ্ছে শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস কারখানা। এই সেক্টরে কর্মরত আছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, যার অধিকাংশ মহিলা। দেশের উপযুক্ত পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টির জন্যে মহিলাদের স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তার গুরুত্ব অনেক বেশি। বর্তমান বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতির মতে- মানুষের কর্মক্ষমতার বিচার করে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়। আমাদের মহিলাদের এই বিরাট অংশের আয়-উপার্জন কম সন্দেহ নেই। ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেয়া হচ্ছে কি না সে আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। উপার্জন বৃদ্ধির রাস্তা বা পন্থা নিয়ে আমার আলোচনা। এখানে উল্লেখ্য, আমাদের গার্মেন্টস খাতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনার পর অনেক দেশে অনেকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে আমাদের শ্রমিক এবং গার্মেন্টস খাত। এখানে বলে রাখা ভাল, আমাদের অর্থনীতি এখন এতটাই আমদানিনির্ভর, মাঝে-মধ্যে কাঁচামরিচও আমদানি করতে হয়। আদা, পেঁয়াজ, রসুন অনেক আগে থেকেই নিয়মিত আমদানি হচ্ছে। সিংগাপুরের মত আমরাও খাবার পানি আমদানি করে থাকি। ভাগ্য ভাল তা সাধারণের জন্যে নয়। এসব কারণে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বড় বেশি প্রয়োজন। আমাদের গার্মেন্টস প্রধানত রপ্তানি হয় আমেরিকা এবং ইউরোপে। সেসব দেশে চলছে তুমুল আলোচনা। সহসা যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত হবে সে দেশের শ্রমিক সম্মেলন। সেখানে গিয়েছেন আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর থেকে একজন শ্রমিক নেতা। বিবিসির সংবাদ মারফত জানা গেল সেখানে আলোচনার একটি বিষয় হবে আমাদের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং আর্থিক সুবিধা। এই সেপ্টেম্বর মাসের ১১-১২ তারিখ জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে আরও একটি সভা। এসব সভার প্রধান আলোচক হবে আমাদের গার্মেন্টস আমদানিকারকরা। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থে যেমন গার্মেন্টসের রপ্তানি বজায় রাখতে হবে তেমনি শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আসে বিদেশে কর্মরত ৮৬ লাখ শ্রমিকের আয় থেকে। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ, এদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ৩ লাখ দক্ষ বিদেশি কাজ করছে। তার মধ্যে আবার ১ লাখ বেআইনীভাবে কাজ করেন। তাঁদের আয়ের একটা বড় অংশ তাঁদের দেশে চলে যায়। আমার বিশ্বাস- দক্ষ এই ৩ লাখের আয় আমাদের অদক্ষ ৮৬ লাখের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে খুব একটা বেশি কম নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা। বিগত কিছুদিন যাবত্ মনে হয় প্রতিযোগিতা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব সমস্যা। বিশ্ব মন্দার সময় পশ্চিমা দেশের অর্থনীতি টালমাটাল ছিল, বিশ্ব বাণিজ্যের মুরুব্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেখতে হয়েছিল অনেক কঠিন অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র। তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল “মা-এর কোলে”। এবং তা সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঠিক তদারকিতে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে যদি ৬ কোটি মানুষও মানবেতর জীবন যাপন করে তাহলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হবে “সে আশায় গুড়ে বালি”। দীর্ঘ ২২ বছরের মাথায় বার্ষিক জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ রাখতে হচ্ছে ঋণ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের জন্যে। কর্জ করে কর্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বলা হয় বাংলাদেশের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও কম। উন্নয়ন বাজেটের জন্যে নির্ভর করতে হয় ঋণ, অনুদানসহ বাহ্যিক অর্থের উপর। মন্দ লোকের ভাষায়- সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের একটি সিংহভাগ চলে যায় সরকারি দলের কিছু নেতার পকেটে। ফলে দেশের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, জনগণের ভাগ্যে ঋণের বোঝাও বৃদ্ধি পাচ্ছে জ্যামিতিকহারে। শিক্ষাখাতের উন্নয়ন বাজেটের টাকায়ও যদি একই হারে দুর্নীতির চিত্র বর্তমান থাকে তাহলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়া দূরে থাক, শুধু আরও সমস্যাই বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা। সরকারের দাবি- বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ অর্থাত্ ১ কোটি ৯৩ লাখ ছেলে-মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুল আছে ৮০ হাজারের কিছু বেশি। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল আছে মাত্র ২০ হাজারের মত। সরকারের দাবি- প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার পাসের হার ৯৪%। এই পাসের হার বিবেচনায় প্রতিবছর ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা ৩৫-৩৮ লাখ ছেলে-মেয়ের । জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষার পাসের হার স্বাভাবিক বিবেচনায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কোন অবস্থায় ২৫ লাখের কম হবে না অদূর ভবিষ্যতে। আমাদের সে প্রস্তুতি কী আছে? এই অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, আনুপাতিকহারে শিক্ষক নিয়োগসহ সকল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আনুপাতিক বাস্তবায়ন দরকার। বর্তমান ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অধীনে মাত্র ১২-১৩ লাখ ছেলে-মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে। দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে আমাদের শ্রমবাজারে প্রতিবছর যে ২৫ লাখের মত যুবক প্রবেশ করে তাদের একটি বড় অংশের ক্রয়ক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না থাকায় মজুরি আদায়ে তারা পরাজিত সৈনিক। এদেরই একটি অংশ শ্রমিকের চাকরি নিয়ে বিদেশ যায়। আবার এদের আর একটি অংশ লেখাপড়ার ভিসা নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা যায়। তাদের একটি বড় অংশ হয় ফেরি বা হকারি ব্যবসায় নিয়োজিত অথবা মানবেতর জীবন যাপন করছে দিনের পর দিন। সর্বশেষ উদাহরণ আমাদের সামনে মালয়েশিয়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক, যারা মালয়েশিয়া সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ।
একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত সে দেশের মানব সম্পদ। মানব সম্পদ উন্নয়নের পূর্বশর্ত মহিলাদের সার্বিক মঙ্গল সাধন। মানব সম্পদের প্রাথমিক স্তর শুরু হয় মাতৃগর্ভে। উন্নয়নের সকল প্রচেষ্টা হতে হবে সর্বপ্রথম মহিলাদের সার্বিক পরিসেবায়। মা-এর স্বাস্থ্য ভাল না হলে গর্ভের সন্তানের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি আশা করা যায় না। মহিলাদের অবশ্যই উপযুক্ত বয়সে বিয়ে হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। বিবাহিত মহিলার স্বাস্থ্য সেবা যেমন নিশ্চিত করতে হবে তেমনি সন্তান জন্ম নিয়ন্ত্রণও করতে হবে। সন্তানের আগমনের সাথে সাথে তারও স্বাস্থ্য সেবা এবং উপযুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকল স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষায় ফলাফলে প্রভূত উন্নতি করতে হবে। প্রাইমারী শিক্ষকদের অর্থনৈতিক চাহিদা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মিটাতে হবে। ১৫ বছরের একটি কমপ্রিহেনসিভ পরিকল্পনা গ্রহণে যত দেরি হবে দেশের ভাগ্য ততদিন এমন থাকবে যেমনটা রয়েছে বর্তমানে। দেশের জনগণের আশা একটি সুন্দর সমাজের যা একটি দেশদরদী সরকারের পক্ষেই নিশ্চিত করা সম্ভব, যাদের কথা এবং কাজে মিল পাওয়া যাবে। স্বাধীনতার সুফল আসবে দেশের সকল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমেই। আমার দেশের যুবতী “ফেলানি” হবে, ৪০ হাজার টাকা খরচ করে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়া যাবে যুবকেরা, রোমের রাস্তায় অবৈধভাবে হকারি করে দিনাতিপাত করবে আমাদের দেশের মানুষ এটা মেনে নেয়া যায় না। সব সমস্যার সমাধানের জন্যে প্রয়োজন দেশের সকল মানুষকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ১৫ বছর মেয়াদী কমপ্রিহেনসিভ মহাপরিকল্পনা এবং তার শতভাগ বাস্তবায়ন। কারণ একমাত্র শিক্ষাই দিতে পারে দরিদ্র্রের সকল সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। দরিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্যে একবার খাওয়ার ব্যবস্থা বা একটি কাপড় যথেষ্ট নয়।
লেখক : এফসিএ
akc¦akc-bd.com
