নবম জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশন

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৮
সকল সমালোচনা, জল্পনা-কল্পনা ও নৈরাশ্যব্যঞ্জক বক্তব্য-বিবৃতিকে পিছনে ফেলিয়া নবম জাতীয় সংসদও তাহার মেয়াদকাল পূর্ণ করিতে চলিয়াছে। এই মুহূর্তে ইহার চাইতে স্বস্তিকর খবর আর কী হইতে পারে! লক্ষণীয় যে, একইভাবে পূর্ববর্তী ৭ম ও ৮ম জাতীয় সংসদও মেয়াদ পূর্ণ করিয়াছিল। সেইদিক হইতে বর্তমান সংসদের অবস্থান তৃতীয়। দৃশ্য-অদৃশ্য নানা প্রতিবন্ধকতায় আকীর্ণ বাংলাদেশের মতো নবীন গণতন্ত্রের জন্য এই অর্জন মোটেও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম সংসদ বসিয়াছিল ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল। সেই সংসদের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র আড়াই বত্সর। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক স্বৈরশাসনের অদৃশ্য ছায়ার নীচে যাত্রা শুরু করা পরবর্তী তিনটি জাতীয় সংসদের একটিও মেয়াদ পূর্ণ করিতে পারে নাই। তন্মধ্যে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ সর্বোচ্চ ২ বত্সর ১১ মাস স্থায়ী হইয়াছিল। আর এই ক্ষেত্রে মাত্র ১২ দিন স্থায়ী ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদকে বাদ দিলে ১ বত্সর ৫ মাস স্থায়ী তৃতীয় জাতীয় সংসদের অবস্থানই ছিল সর্বনিম্নে। অতএব, নব্বইয়ে স্বৈরশাসনের পতনের পর সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও— আমাদের গণতন্ত্রের পালে যে ইতিবাচক হাওয়া লাগিয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কারণ এই সময়ে মেয়াদ পূর্ণ করিতে না পারা একমাত্র সংসদটিও ৪ বত্সর ৮ মাস স্থায়ী হইয়াছিল। আজ যেই অধিবেশন বসিতেছে তাহাই সম্ভবত নবম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন। পরবর্তী নির্বাচন কিভাবে কাহার অধীনে অনুষ্ঠিত হইবে তাহা লইয়া বেশ কিছুদিন যাবত্ চলিয়া আসা টানাপোড়েন এখনও অব্যাহত আছে। আছে কিছু উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাও। ফলে কেহ কেহ এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করিয়াছেন যে সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান হইবে। হইলে ভালো। আবার না হইলেও যে মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যাইবে এমন মনে করিবারও কোনো কারণ নাই। আমাদের দেশে নির্বাচন লইয়া এই টানাপোড়েন বা উত্তেজনা যে নূতন নহে, তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে কী হইয়াছে তাহা কমবেশি সকলেই জানেন। স্বাধীনতার আগে, পাকিস্তানি শাসনামলে, অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নহে। ইহা অনস্বীকার্য যে নানা বাধাবিপত্তির ভিতর দিয়া আমাদের গণতন্ত্র আগাইয়া যাইতেছে। পরিপক্বতাও অর্জন করিতেছে ধীরে ধীরে। ইহার সর্বাপেক্ষা বড়ো উদাহরণ হইল, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে বাহ্যত যতো বাকবিতণ্ডাই হউক না কেন— নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করিবার ব্যাপারে ইতিমধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতাও যে গড়িয়া উঠিয়াছে বর্তমান সংসদসহ বিগত চারটি সংসদের দিকে তাকাইলেই তাহা স্পষ্ট হইয়া যায়। আর ইহা সর্বজনবিদিত যে, গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের এই ধারাবাহিকতার কোনো বিকল্প নাই। কে না জানেন যে, গণতন্ত্রের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নহে। পৃথিবীর কোথাও রাতারাতি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় নাই। অথচ আমাদের দেশে যেন পান হইতে চুন খসিবারও উপায় নাই। ‘গেল গেল’ বলিয়া কিছু লোক জনগণকে আতঙ্কিত করিয়া তোলেন। ঢালাওভাবে বিষোদগার করেন রাজনীতি এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে। পরিহাসের বিষয় হইল, ‘সুশীল’ তকমাধারী স্যুট-টাই পরিহিত যেইসব ব্যক্তি এই ধরনের রব তুলিয়া থাকেন তাহাদের জনগণের মুখোমুখি হইবার সত্সাহস নাই, অথচ ক্ষমতার খায়েস আছে! সম্ভবত সেই অন্তর্জালায় বারবার বিদ্ধ হইতেছে আমাদের বিকাশমান গণতন্ত্র। অতএব, অধৈর্য হইবার যেমন কিছু নাই, তেমনি অতি উত্সাহী উচ্চকণ্ঠ হতাশাবেপারিদের ব্যাপারে সতর্ক হইবারও আবশ্যকতা আছে বৈকি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন