[ রা জ নী তি ]

আর কালক্ষেপণ নয়

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৯
আমাদের রাজনীতির দীনতা এখন দারিদ্র্য সীমার অনেক নিচে নেমে গেছে। দেশপ্রেম ও জনকল্যাণের বদলে যখন রাজনীতিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে যাবতীয় সুধা আকণ্ঠ পান করা একমাত্র অভীষ্ট হয় তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিচার বুদ্ধি লোপ পায়। ব্যক্তি গোষ্ঠী ও জাতীয় সম্মানের বিষয়টি এসব রাজনীতিকদের ভাবায় না। শুধু ‘তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই।’ রাজনীতিকে এখন এমন জায়গা করে নেয়া হয়েছে যে, নিজ ঘরের সদস্য এবং পাড়া-প্রতিবেশীরাও আপস করিয়ে দিতে পারছে না। স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ক্ষমতার রাজনীতিকরা এখন ঘরের ঝগড়া মেটাতে বিদেশি ‘প্রভুদের’ কাছে মাথা নত করছেন। তবে মন্দের ভালো খুঁজে শেষবারের মত মানুষ অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে চায়। তাই এখন আমাদের ভাবনা জানুয়ারি সমাগত। একারণে যে বন্ধু বা প্রভুই মধ্যস্থতা করুক তা যেন দ্রুত করা হয়। এখন যত কালক্ষেপণ করা হবে দেশ তত সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে। একই সাথে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ আরো অন্ধকারে ঢাকা পড়বে। সংবাদপত্রের সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা শীঘ্রই উপস্থাপন করবে। সেখানে এই সরকারের প্রধান হবেন একজন অরাজনৈতিক ও নির্দলীয় ব্যক্তি। আমাদের রাজনীতিকগণ স্বাধীন সার্বভৌম দেশে রাজনীতি করলেও মাথা বিকিয়ে দিয়েছেন বিদেশি মোড়লদের কাছেই। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় এই দরোজা সবচেয়ে বেশি খোলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের দরবারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির ছোটাছুটি তখন দেখবার মত ছিল। মুক্তিযুদ্ধস্নাত মুক্ত বিবেকের কাছে ছিল লজ্জার। এবারের নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিজেরাই কি মেটাতে পারতাম না? পারতাম, যদি সকল পক্ষের বদ্ধ রাজনীতির অচলায়তন থেকে বেরুনো যেতো এবং গণতন্ত্রের প্রতি শর্তহীন শ্রদ্ধা রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু সবকিছু অসম্ভব হয়ে গেছে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার প্রশ্নে। আধুনিক সময়ের বুর্জোয়া রাজনীতির অভীষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া। এটি দোষের কিছু নয়। কিন্তু অন্যায় হচ্ছে জনগণের আস্থা অর্জন করে জনগণের ইচ্ছেয় নয় নানা কূট পথে ক্ষমতাসীন থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতাটিই ক্ষতিগ্রস্ত করছে গণতন্ত্রকে। আর তাই কোনো রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে বিবদমান দলগুলো সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। এর বড় কারণ সংলাপের মধ্য দিয়ে ফয়সালা করতে সকল পক্ষের ভয়—একটি গেল গেল ভাব কাজ করে। বুঝি নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার ছক নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া দুই বড় দলের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এত বেশি যে, সংলাপের টেবিলে বসা নিরর্থক হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে সংকট যখন অনেক বেশি জটিলতার আবর্তে তলিয়ে যেতে থাকে তখন আমাদের নেতা-নেত্রীদের বিদেশি মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়। আর এসব কারণে বিদেশি মোড়লরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে বেশ মজাই পান মনে হচ্ছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা স্থানীয় বড় বিদেশি মোড়ল হিসেবে চষে বেড়াচ্ছেন দেশ আর হিতোপদেশ দিচ্ছেন অহরহ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোড়লরাতো এখন বেশ সক্রিয়। জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বান কি মুন তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে ভূমিকা রাখতেই পারেন। এবার সংকটের মাহাত্ম্য এত বেশি যে, তিনি দুই নেত্রীর সাথে টেলিফোনে কথা বলে বরফ গলানোর চেষ্টা করেছেন। যে চীন পরের দেশের বিষয়-আসয় নিয়ে পারতে কথা বলে না তাদের কাছেও এখন বাংলাদেশের রাজনীতি গরিবের বৌ হয়ে গেছে। চীনের রাষ্ট্রদূতও পরামর্শ দিতে কসুর করছেন না। এ প্রসঙ্গে আরেকটি চটকদার বিষয় যোগ হয়েছে সমপ্রতি। নিউইয়র্কে বান কি মুনের মধ্যস্থতায় সংলাপ হওয়ার প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন স্বয়ং জাতিসংঘের মহাসচিব। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন এটি সাধারণ ঘটনা। তবে বিশেষত্ব হচ্ছে এ সময় মহাসচিব বিএনপির দু’জন প্রতিনিধিকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট এই সুযোগে দুই পক্ষকে সংলাপে বসিয়ে একটি সমাধান তৈরি করে দেয়া। আমন্ত্রণে বিএনপির মধ্যে একটি চনমনে ভাব দেখা যাচ্ছিল। বিগত কয়েক মাসের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যাবে সংলাপের ভবিষ্যত্ পেণ্ডুলামের মত দুলছে। এপ্রিল-মে মাসের দিকে সরল পথে নির্বাচনে জেতার মত আত্মবিশ্বাস বিএনপির ছিল না। বরঞ্চ আত্মবিশ্বাসী ছিল আওয়ামী লীগ। তাই সেসময় নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে সংলাপে আওয়ামী লীগের আগ্রহ ছিল। গত মে মাসের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেত্রীর কাছে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রী বরাবর চিঠি দেয়ার কথাও বলেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তখন বাউলি কাটতে থাকে বিএনপি। সংলাপের সম্ভাবনা নস্যাত্ করে দিয়ে ৪ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়া সরকারের পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের পর বিএনপির হালে পানি পড়েছে। নির্বাচনে জেতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তাই এবাউট টার্ন করছে আওয়ামী লীগ। সংলাপের বিষয়টি তেমন আমল পাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের মহাসচিবের ব্যবস্থাপনায় সংলাপের সম্ভাবনা বিএনপিকে উত্সাহিত করে তুলেছিল। ১০ সেপ্টেম্বরের পত্র-পত্রিকায় জানা গেল, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। এই খবরে হতাশা নেমে এলো বিএনপি শিবিরে। কারণ বিএনপি ভেবে রেখেছিল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিএনপির আলোচনা হলে সেখানে তাদের তৈরি নির্দলীয় ব্যক্তির অধীনে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করবে। মোড়লদের চোখের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত না করতে পারবেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অধিবেশনে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা অসমর্থিত তথ্যে চাউর হয়ে গেলে হতাশা নেমে আসে বিরোধী দলের শিবিরে। বলা হতে থাকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীদের চাপে সিদ্ধান্ত যদি নিতে হয় সে ভয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে যাত্রা বাতিল করেছেন। কিন্তু পেণ্ডুলামের দুলুুনি বন্ধ হলো না। দিনের আলো না মেলাতেই সরকারি সিদ্ধান্ত এলো প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। এ লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত এবারের বিএনপির প্রতিক্রিয়া আমাদের জানা হলো না। অনেকের মত আমিও বিশ্বাস করি নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দুই প্রধান দলের আর কোনো পথ নেই। ক্ষমতায় থাকার সুবিধায় আওয়ামী লীগ না হয় নানাভাবে গুছিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করবে। ইতোমধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার একরকম ঘোষণাই দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এই ঘোষণা সরলভাবে গ্রহণ করলে মানতে হবে আওয়ামী লীগ কোনো সমঝোতার সুযোগ রাখেনি। বিষয়টি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হাঁটার মত না। আমাদের ধারণা এটি সরকার পক্ষের চূড়ান্ত কথা নয়। দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি রাজনৈতিক বক্তব্য মাত্র। সমঝোতা বৈঠক নিশ্চয়ই হবে। আর সেখানে ‘তালগাছটি আমার’ বলে কোনো পক্ষেরই বসে থাকার উপায় নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে যেমন বিএনপি তথা ১৮ দলকে নেমে আসতে হবে, তেমনি দলীয় সরকারের কথিত বক্তব্য থেকে আওয়ামী লীগকেও সরে আসতে হবে। সংলাপতো হয় আপসরফা তৈরির জন্য। এ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির নিজ অবস্থানে শক্তভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। যত হৈচৈ হোক না কেন বিএনপি আর তার বন্ধু দলগুলো ছাড়া জাতীয় পার্টিসহ ছোট-বড় সব দলই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে বলে আমাদের ধারণা। সংবিধান ও কোর্টের রায়ের শক্তিতে সরকারের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলারও কোনো সুযোগ থাকবে না। এরমধ্যে জামায়াত যদি তার নিবন্ধন হারায় তাহলে খুচরো দলগুলোসহ বিএনপি একা হয়ে যাবে। এ অবস্থায় বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগ স্বস্তি পেতে পারে। এসব অংক বিএনপি নেতারা যে মেলাতে পারছেন না তা নয়। শুধু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তাছাড়া বিএনপি ভালো করেই জানে নির্বাচনের এই ডামাডোলের সময় আন্দোলন করে সব উল্টে দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। শুধু শুধু নির্বাচনী প্রচারণার সময় নষ্ট করা হবে। তাছাড়া বিএনপি তো কার্যত নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেও গেছে। গত সপ্তাহে নরসিংদীর জনসভায় বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভাষণে নির্বাচনী বক্তৃতার আমেজ স্পষ্ট হয়েছে। এত কিছুর পরেও বলবো নির্বাচনে যদি যেতেই হয় তবে এত কালক্ষেপণ কেন? সমস্ত রাগ অভিমান লজ্জা ঝেড়ে ফেলে সংলাপে বসে মধ্যস্থতায় চলে আসা জরুরি। নির্বাচনের মাঠে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে। আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকদের কাছে কিঞ্চিত্ দেশপ্রেম আশা করাটা নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না। যে দেশে হাজার বছরের উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, আট শতক থেকে গণতন্ত্রের চর্চা করেছে বাঙালি, ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য দেশকে গর্বিত করছে, বিশ্ববাসীর কাছে ভাষা আন্দোলন আমাদের অহংকারকে করেছে সুপ্রতিষ্ঠিত। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে ষাটের দশকে বাঙালি উত্তাল করে তুলেছিল পূর্ব পাকিস্তান। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশ স্বাধীন করার গৌরব রয়েছে যে জাতির ললাটে সে জাতির রাজনৈতিক ভুবনের আজকের ত্রাণকর্তারা যদি সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য স্বাজাত্যবোধ ভুলে যান তবে এর চেয়ে বেদনার কিছু হতে পারে না। আমাদের রাজনৈতিক সংকট মেটাতে বিদেশিদের ডেকে আনার মত হীনমন্যতা খুবই দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের চোখে এসব রাজনৈতিক দারিদ্র্য ঠিকই ধরা পড়ে। সুতরাং অসংস্কৃত আচরণ ভোটার ভুলে যাবে এমন ভাবা ঠিক নয়। এসব কারণে প্রার্থনা করবো আমাদের ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের চোখের সামনে থেকে ইন্দ্রজালের ঘোর কেটে যাক। উভয় পক্ষের রাজনীতিকগণ আর কালক্ষেপণ না করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে রাজনৈতিক ফয়সালা করার পদক্ষেপ নিশ্চিত করুন।  লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন