‘সন্ত্রাসী আর বোকাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য মিশরীয় সেনাবাহিনী জীবন দিতে পারে’ এই আওয়াজ তুলে জনসমর্থন চেয়ে মুরসি বিরোধীদের রাজপথে নামার আহ্বান দেশটির পতিত স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর। যেই কথা সেই কাজ। বেড়ায় ক্ষেত খেলে ঠেকায় কে। ধর্মনিরপেক্ষ আর বামপন্থি লোকজনের হৈচৈ আর চিত্কারে উত্তপ্ত কায়রোর রাজপথ। দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ এমন সব অজুহাতে হাওয়া হয়ে গেলেন মাত্র এক বছর আগে শপথ নেয়া দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। এ যেন পরীক্ষায় বসা কিশোরের পাস মার্কের উত্তর লেখার আগেই খাতা ছিনতাই।
প্রায় নয় দশক আগে হাসান আল বান্না প্রতিষ্ঠিত আল ইখওয়ান-আল-মুসলিমুন বা মুসলিম ব্রাদারহুডও কম যায় না। তার এক দাবি প্রেসিডেন্ট মুরসির স্বপদে পুনর্বহাল। সেই ষাটের দশকের গোড়ার দিকে একবার দেশের অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনে ক্ষমতা ছুঁই ছুঁই অবস্থায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় দলটি। ২০১১-এর আরব বসন্ত পরবর্তীতে পুনরায় নিবন্ধিত হয় ব্রাদারহুড। অসীম ধৈর্য আর অশেষ বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসা ইসলামপন্থি দলটিকে পশ্চিমারা মেনে নেয় উদার গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল হিসেবে। ১৯৫২ সালের সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন জামাল আবদেল নাসের থেকে সেনা শাসন পাকাপোক্ত। ক্ষমতার রসাস্বাদনে মত্ত মিশরীয় সশস্ত্র বাহিনী। সংগত কারণেই ক্ষমতাপ্রাপ্তির বছরান্তে ক্ষমতাচ্যুত ব্রাদারহুডের ক্ষোভ ও কষ্ট সীমাহীন। সভ্যতার সূতিকাগার নীল নদের অববাহিকায় শুরু হয় রক্তের হোলিখেলা।
২০ আগস্ট ২০১৩, বিভিন্ন সংবাদ মিডিয়ায় প্রকাশ মিশরে প্রিজনভ্যানে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপে ৪০ জন মুরসি সমর্থক নিহত। নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানানো হয়, সম্প্রতি কায়রোর রামসে স্কয়ার এবং আশপাশ এলাকা থেকে ব্রাদারহুডের বিক্ষোভরত অনেক সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযানে আটক ৬ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে কয়েকটি প্রিজনভ্যানে উত্তরের আবু জাবেল কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পথে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন বন্দি প্রিজনভ্যানের একজন গার্ডকে বাইরে থেকে টেনে হিঁচড়ে ভ্যানের ভেতর নিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং তারা তাকে জিম্মি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই অবস্থায় পুলিশ প্রিজনভ্যানে কয়েক দফা টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করলে ৪০ জন মুরসি সমর্থক নিহত হয়। সংবাদটি লোমহর্ষক এবং মানবতাবিরোধী। উদ্ধার কাজের প্রয়োজন ছাড়া পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বাসগৃহে গুহায় জাহাজে খনিতে গুদামে বা কোনো ধরনের যানবাহনে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপে একসঙ্গে ৪০ জন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এটাই হয়তো প্রথম। ৪০ জন বাক স্বাধীনতাকামী মানুষ সরকারি ভাষ্য মতে যদি পালিয়ে যেতে সক্ষমও হতো তাতে জগতের এমন কী ক্ষতি হতো? কোনো মানুষ কি পালিয়ে বাঁচতে পারে? অধিকন্তু ঘটনার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ ছাড়া আর কি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল? এমনিতেই নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অপসারণে মিশর উত্তাল। প্রশ্ন জাগে এ-কি একদিনে গণতন্ত্রকামী ৬শ’ মুরসি সমর্থককে সরাসরি গুলি করে খুন করার ধারাবাহিক নীল নকশার অংশ? কবে কখন কোথায় ঘটে এই গ্যাস নিক্ষেপের নির্মম ঘটনা? টানা হেঁচড়া করা পুলিশ সদস্যটির ব্যাপারে সরকারি ভাষ্য নীরব কেন? ঘাতক চিরদিনই তার কৃতকর্ম ধামাচাপা দিতে রচনা করে অলীক কাহিনী। আমাজানের জংগলে হারিয়ে যাওয়া একটি কুকুরের সন্ধানে একাধিক হেলিকপ্টার উড়িয়ে দেয়া মানবতার প্রবক্তা পশ্চিমা শক্তি এই নির্মম ও নিষ্ঠুর ঘটনায় একটিবারের জন্য উচ্চারণ করল না ‘আ!’ কিংবা ‘উ!’।
সম্মুখ সমরে জীবনদান আর প্রিজনভ্যানে গ্যাস নিক্ষেপে মানুষ মারা এক নয়। সভ্যতার প্রথম উষার সলজ্জ হাসি ছড়িয়ে পড়া নীল নদের আঁখি-পল্লব মিশর। মিশরের এই বীভত্স ঘটনাটি আমাদেরকে হিটলারের গ্যাস-চেম্বারে ইহুদি নিধনকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক : কবি
