গত ২১ আগস্টের পর হইতে বিশ্ববাসীর ভিতরে একটি চাপা অস্বস্তি ছিল সিরিয়ায় আসন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতি লইয়া। গত দুই দিনের তাত্পর্যময় কিছু উদ্যোগ যেন গুমোট যুদ্ধাবস্থার ভিতরে স্বস্তির শীতল হাওয়ার পরশ বুলাইয়াছে। গত ২১ আগস্ট সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের তিন শহরতলিতে রাসায়নিক গ্যাস হামলায় পলকের তরে প্রাণ হারায় শত শত মানুষ, যাহার ভিতরে শিশুদের সংখ্যাই অধিক। সরকারবিরোধী পক্ষ অভিযোগের আঙুল তুলিয়াছিল প্রেসিডেন্ট আসাদের দিকে। আসাদ বলিয়াছিলেন, দুষ্কর্মটি তাহার নহে। তারপর সিরিয়া আক্রমণের দামামা বাজিয়া উঠিলে এইদিকে বিশ্বের পরাশক্তিরা দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়। সেই ক্ষণে সিরিয়ার উপর মার্কিন আক্রমণ, যদিও তাহা ‘সীমিত পরিসরে’ বলা হইয়াছিল, যেন হইয়া ওঠে সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু অর্থনীতিসহ বিশ্বের বিবিধ হিসাব-নিকাশ সমর্থন করিয়াছিল না আসন্ন যুদ্ধের এই দামামাকে।
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত ১০ সেপ্টেম্বর সিরিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে স্পষ্ট করিয়াছেন সিরিয়া লইয়া তাহাদের সর্বশেষ পরিকল্পনা, যাহা যুদ্ধাবস্থার তপ্ত জমিনে শীতল বারিবর্ষণ করিয়াছে। ওবামা তাঁহার এই অভিভাষণে ব্যাখ্যা করিয়াছেন সিরিয়ার উপর আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপ হইতে সরিয়া ভিন্ন উপায় খুঁজিবার কারণ। ওবামা স্পষ্টত কিছু তাত্পর্যপূর্ণ উপলব্ধির কথা শোনাইয়াছেন—অন্য কাহারও গৃহযুদ্ধ শক্তি দিয়া সমাধান করিতে পারে না আমেরিকা, বিশেষ করিয়া ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধের এক দশক পর। তবে ২১ আগস্ট রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালাইয়া সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ যে বিশ্বের রাসায়নিক অস্ত্র সংবরণের মৌলিক নীতিমালা লংঘন করিয়াছেন, তাহা স্পষ্টতই উচ্চারণ করেন ওবামা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ট্রেঞ্চগুলিতে বিষাক্ত গ্যাস হামলাসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাত্সীদের ‘হলোকস্ট’-এর উদাহরণ টানিয়া ওবামা ইহার ভয়াবহতা ও অমানবিকতার দিক তুলিয়া ধরিয়া বলেন, যেহেতু এই সকল অস্ত্র ব্যাপকহারে হত্যাযজ্ঞ ঘটাইতে পারে, সৈন্য এবং শিশুদের ভিতরে কোনো পার্থক্য করিতে পারে না, তাই সভ্য বিশ্ব এইগুলি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত লয়, এবং তাহা নিষিদ্ধ করিতে প্রায় এক শতাব্দীকাল পার হইয়া গিয়াছে। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করিবার চুক্তিতে বর্তমানে ১৮৯টি দেশের সরকার যোগ দিয়াছে এবং যা পুরো বিশ্বের মানব সমাজের শতকরা ৯৮ ভাগের প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং সিরিয়ায় এমন অস্ত্রের অমানবিকতার বীভত্সরূপ নিঃসন্দেহে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। ওবামার মতে, সিরিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণের বিশ্বাসযোগ্য হুমকি কাজে লাগিয়াছে। তাহার সহিত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের গঠনমূলক আলোচনা হইয়াছে বলিয়াই রুশ সরকার প্রেসিডেন্ট আসাদকে তাহার রাসায়নিক অস্ত্র পরিত্যাগ করিবার বিষয়ে চাপ দিয়াছে। ইহা নি:সন্দেহে ওবামার কূটনৈতিক জয় যে, আসাদ শাসকগোষ্ঠী এখন স্বীকার করিয়াছে যে, তাহাদের নিকট এই ধরনের অস্ত্র রহিয়াছে এবং এমনকি ইহাও বলিয়াছে যে, তাহারা রাসায়নিক অস্ত্র সনদে যোগদান করিবে যেখানে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
এই সময়ে আমেরিকা সামরিক অভিযান চালাইলে তাহার খেসারত যে বিশ্ব অর্থনীতির উপর পড়িতে বাধ্য হইত, এই সংকট অনুধাবনে ব্যর্থ হন নাই ওবামা। তাহা ছাড়া যুদ্ধের ফলে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বন্ধ হইবার পরিবর্তে আরও প্রবলরূপ ধারণ করিবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বিগত ১৫ বত্সর ধরিয়া ইরাক ও আফগান রণাঙ্গনে ক্রমাগত লড়িতে থাকা আমেরিকার উপর নূতন করিয়া লড়াইয়ে না জড়াইয়া পড়িবার ব্যাপারে ওবামার উপর মার্কিন নাগরিকদের চাপও বাড়িতেছিল ভীষণ।
সুতরাং এক্ষণে রাশিয়ার মধ্যস্থতা এবং ওবামার দূরদৃষ্টির মাধ্যমে সিরিয়াকে রাসায়নিক নিরস্ত্রীকরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বিশ্বের সার্বিক প্রেক্ষাপটে অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইহার ফলে আগামী দিনে যুদ্ধের পরিবর্তে এমত কূটনৈতিক পথেই সিরিয়া-সংকটের সমাধান যে অসম্ভব নহে, সেই পথও প্রশস্ত হয়।
