সমপ্রতি বরিশালে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন খেলাধুলা ও সাঁতার প্রতিযোগিতায় মেয়েদের ফুটবলে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করিয়াছে ভান্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ৪২তম এই আঞ্চলিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এতদঞ্চলের বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় উপলক্ষে গত বুধবার মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এক আনন্দ র্যালিতে অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা ট্রফি হাতে উল্লাস ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। আমাদের নিকট এই ঘটনার একটি আলাদা তাত্পর্য বিদ্যমান। দেখা যাইতেছে, এখন খেলাধুলায় আমাদের মেয়েরাও আগাইয়া আসিতেছে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের এই যুগে তাহাদের খেলার ধরনও পাল্টাইয়া যাইতেছে। কতিপয় গ্রামীণ ও লোকজ খেলার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদিও তাহাদের গভীর আগ্রহের বিষয়বস্তুতে পরিণত হইয়াছে। তাহাছাড়া প্রাগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুস্থ ও সবল থাকার প্রত্যয়ে শরীর চর্চা ও খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগের তুলনায় সচেতনতা বাড়িয়াছে। শিক্ষার প্রসার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন যেখানে হয়, সেখানে এমনিতেই সকল ক্ষেত্রে জাগরণের সৃষ্টি হয়।
তাহার পরও না বলিলে নয় যে, বাংলাদেশের মেয়ারা ইদানীং ক্রিকেটে উন্নতি লাভ করিলেও ফুটবলে অনেক পিছাইয়া আছে। কেননা জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে প্রমীলা ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয় মাত্র কয়েক বত্সর আগে ২০০৭ সালে। এই টুর্নামেন্টে বিভিন্ন জেলার ৮টি দল অংশগ্রহণ করে। পরের বত্সর প্রথমবারের ন্যায় প্রমীলা স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় প্রমীলা ফুটবল দল সাফ উয়োমেনস চ্যাম্পিয়নশিপ ও এএফসি উয়োমেনস এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে অংশগ্রহণ করিয়াছে। সেখানে আহামরি কোন সাফল্য নাই। শুধু প্রমীলাদের দোষ দিয়া লাভ নাই, আসলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ফুটবল দিন দিন তাহার গৌরব হারাইয়া ফেলিতেছে। সমপ্রতি নেপালে শেষ হইল সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে বাংলাদেশ নেপাল ও পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হইয়া আমাদের হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করিয়াছে। যদিও ভারতের সঙ্গে আমাদের জিতিবার সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছিল, তথাপি শেষপর্যন্ত তাহা ১-১ গোলে ড্র হয়। সেই আসরের ফাইনালে আফগানিস্তান ভারতকে ২-০ গোলে হারাইয়া দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ফুটবল শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে। পর্যাপ্ত স্টেডিয়াম ও ফুটবল অবকাঠামো না থাকা সত্বেও তাহাদের এই সাফল্যের রহস্য হইল সেই দেশের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ইউরোপের লীগে অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন। বাংলাদেশে ফুটবলের প্রতি জনগণের ব্যাপক আগ্রহ ও ভালবাসা থাকিলেও পেশাদারিত্ব ও বিনিয়োগের অভাব প্রকট।
আশার কথা হইল, দ্বিতীয় মেয়াদে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন বা সাফের সভাপতি হইয়াছেন বাফুফে সভাপতি ও আমাদের কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন। বাংলাদেশের ফুটবলকে আগাইয়া নিতে আশা করি তিনি আরও সক্রিয় হইবেন। আগামী সাফ ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হইবে ২০১৫ সালে ভারতে। এই ব্যাপারে এখন হইতেই পরিকল্পনামাফিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে। একই সঙ্গে মেয়েদের ফুটবলের উন্নতিতেও একযোগে কাজ করিয়া যাইতে হইবে। ভান্ডারিয়াসহ দেশের তৃণমূল পর্যায়ের যেসব মেয়ে ফুটবলে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখিতেছে তাহাদের নানাভাবে অনুপ্রাণিত করিতে হইবে। স্কুল পর্যায়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রতিবত্সরই আয়োজনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূর করিতে হইবে ফুটবলের অব্যবস্থাপনা। ঢাকার বাহিরে গ্রাম-গঞ্জে এখনও ক্রিকেটের চাইতে ফুটবল টুর্নামেন্টই বেশি আয়োজন করা হয়। সুতরাং ফুটবলের ব্যাপারে আর অবহেলা কাম্য নহে। তাহাদের মধ্য হইতে নূতন নূতন ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণের চেষ্টা করিতে হইবে। পরিশেষে ভান্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কৃতী ফুটবলারদের আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
