অদ্য আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রত্যেক বত্সরের ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখটি বিশ্বজুড়িয়া গণতন্ত্র দিবস হিসাবে পালিত হইতেছে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালনের প্রস্তাবনাতে জাতিসংঘ এই সত্যটি উচ্চারণ করিয়াছিল যে গণতন্ত্রের একক কোন মডেল নাই এবং গণতন্ত্র কেবলমাত্র একটি দেশ বা অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ নহে। জাতিসংঘ এই সত্যও বিস্মরণ হয় নাই যে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রহিয়াছে।
জাতিসংঘের করণীয় জাতিসংঘ করিয়াছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন হইতে জগত্বাসী কী দেখিতেছে? বিশ্বমুরুব্বীরা যেন গণতন্ত্রের একটিমাত্র মডেলকেই সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছে। ইহাই প্রত্যক্ষ করিতেছে জগত্বাসী। নিজেদের দেশে বহুলাংশে চর্চা করিলেও, উত্তর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির ক্ষেত্রে আসিয়া বিশ্বমুরুব্বীর অবস্থান পাল্টাইয়া যাইতেছে। উত্তর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে নির্বাচনভিত্তিক যেই গণতন্ত্র কায়েম করানো হইতেছে তাহার কেন্দ্র-ভিত্তি-মূলে রহিয়াছে বাজার অর্থনীতিকে অমোঘ-অনিবার্য করিয়া তুলিবার মাধ্যমে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির উপরে পরোক্ষ শাসন এবং সরাসরি শোষণের পথটি সুগম করিয়া রাখা। ঐতিহাসিক কারণে মূলধন, প্রযুক্তি ও বাজারের জন্য ধনী দেশগুলির মুখাপেক্ষী হইতে বাধ্য হইয়া থাকা নুতন রাষ্ট্রগুলি কোনক্রমেই এই দুষ্ট ফাঁদের বাহিরে আসিতে পারিতেছে না অথবা বলা চলে ইচ্ছা থাকিলেও বাহির হইবার সামর্থ্য অর্জন করিতে পারিতেছে না। কয়েকটি ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে, উত্তর ঔপনিবেশিক এই সকল রাষ্ট্রগুলিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা করা এবং তৃণমূল অবধি গণতন্ত্রের অনুশীলনের মত বিষয়গুলিকে গুরুত্বপূর্ণ করিয়া তোলা হইতেছে না। বরং কোন কোন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক এলিটদিগের ক্ষমতা অভিমুখী বিবাদ মীমাংসার নামে নির্বাচন অনুষ্ঠাকেই গণতন্ত্রের একমাত্র শর্ত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়া ফেলা হইতেছে। এইখানেই শেষ নহে।
দেখা যাইতেছে যে বিশ্বমুরুব্বীরা একবিংশ শতাব্দীর প্রায়-সূচনালগ্ন হইতে গণতন্ত্রের গুণকীর্তন, মহিমা প্রচার কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহবানের মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখিতে পারিতেছেন না। বরং তাহারা বিশ্বের দিকে-দিকে সহিংস উপায়ে গণতন্ত্র গলাধঃকরণ করাইবার পথ ধরিয়াছেন। বহু বিশ্লেষক অবশ্য এই সহিংসার মধ্যে কেবল উগ্র-গণতন্ত্র প্রেমই দেখিতে পান না; বরং তাহারা এই সহিংসার মধ্যে বিশ্বজুড়িয়া সামরিক-রাজনৈতিক আধিপত্য অক্ষুণ্ন রাখা এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলির প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে নিয়ন্ত্রণ টিকাইয়া রাখিবার দূরভিসন্ধিও দেখিতে পান।
তবে এই কথা ঠিক যে উত্তর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে দুর্বল গণতন্ত্র কেবলমাত্র বহিঃশক্তির চক্রান্ত উদ্ভূত নহে। ন্যায্য কথা বলিলে ইহাই বলিতে হইবে যে এই দায় প্রধানত রাজনীতিক এলিটদিগের। উত্তর ঔপনিবেশিক অনেক রাষ্ট্রেই রাজনৈতিক এলিটদিগের মধ্যেকার সমঝোতার অভাব শিশু-গণতন্ত্রের বিকাশকে যে কেবলমাত্র বাধাগ্রস্ত করে তাহা নহে; বরং ইহার পরিণতিতে ক্ষমতা থাকিয়া-থাকিয়া অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তগত হইয়া যায়। এমতাবস্থায় স্বভাবতই জাতিসংঘের আরও একটি বক্তব্যও অর্থহীন হইয়া যায়। বিশ্ব গণতন্ত্র দিবসের প্রস্তাবনাতে অন্যান্য বক্তব্যের সহিত জাতিসংঘের পক্ষ হইতে এই কথাও বলা হইয়াছিল যে, “গণতন্ত্র হইতেছে একটি বৈশ্বিক মূল্যবোধ যাহা নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাদি স্থির করিবার নিমিত্তে জনগণের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত ইচ্ছার উপরে প্রতিষ্ঠিত”। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে জাতিসংঘের এই শুভেচ্ছা দুনিয়ার নানান স্থানে পড়িয়া-পড়িয়া মার খাইতেছে। আগামী বত্সরে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালন করিবার আগে বিদ্যমান পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটুক এই হইতেছে কামনা।
