রা জ নী তি

তাহলে সমঝোতার উদ্যোগ নেবে কে?

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৩
গত ১২ তারিখ সন্ধ্যায় এ লেখাটি শুরু করার আগে ইন্টারনেটে কয়েকটি পত্রিকা দেখছিলাম। কয়েকটি সংবাদের বিস্তারিত পড়তে গিয়ে দেখলাম, ‘২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন: স্পিকার’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয়েছে, ‘বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নবম সংসদের ১৯তম তথা শেষ অধিবেশনে স্পিকার বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের ২৫ জানুয়ারি বর্তমান সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে। আর মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাত্ আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো সময় সাধারণ নির্বাচন হবে।’ ওই পোর্টালে সর্বাধিক পঠিত সংবাদের তালিকায় ‘আইনমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক’ শিরোনামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদে বলা হয়, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির চিঠি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের প্রস্তাব নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকারের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে আইনমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক করেছেন। সূত্র মতে, নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষেই নেতারা অবস্থান নেন। আর সংবিধানের আওতায় সংসদে আলোচনার পক্ষে মত দেন।’ এছাড়া ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হবে না’—শীর্ষক আরেকটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক পর্যালোচনা সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। সেই সঙ্গে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেও কোনো নির্বাচন হবে না।’ আগামী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্বিগ্ন দেশবাসী প্রতিদিন এ ধরনের সংবাদ দেখতে দেখতে ত্যাক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছে, যেখানে ঘুরে-ফিরে থাকছে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতাদের সংসদ ভাঙা বা বহাল থাকা ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে একই মুখে একেকদিন একেক রকম কথা আর বিরোধী দলের চর্বিতচর্বণ—তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হবে না; কিংবা লাগাতার আন্দোলনের হুমকি! সভা- সেমিনারে কেউ নতুন কোনো কথা বললেই তা নিয়ে উচ্চকণ্ঠে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেন টক’শোর আলোচকরা; পক্ষে-বিপক্ষে ওঠে তর্ক-বিতর্কের ঝড়; পত্রিকায় ছাপা হয় সম্পাদকীয়-মতামতধর্মী লেখা। হোটেল-রেস্টুরেন্টে চায়ের টেবিলে, অফিস-আদালতে কাজের ফাঁকে আড্ডা-বৈঠকে এ নিয়ে চলে সীমাহীন বাহাস। আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে গত কয়েকমাস ধরে এভাবেই নানা আলোচনা-বক্তব্য আর টক’শো-কলামের ঘূর্ণায়মান জালে আটকে আছে দেশবাসী। রাজনৈতিক ধূম্রজালে দেশের ভবিষ্যত্ ঠিক কোন্ পথে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। আন্দোলন-সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেও দেশে যে নির্বাচনী বাতাস বইতে শুরু করেছে, এরই মধ্যে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। নিজ নিজ আসনে প্রকাশ্যে-গোপনে যথেষ্ট তত্পরতা শুরু করে দিয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনায় বসছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনও জেলা পর্যায়ে জনসভার মাধ্যমে এক ধরনের জনসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। এটা ঠিক যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা না থাকলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এতদিনে অনেকটা চূড়ান্ত হয়ে যেত। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় থাকতো উত্সবমুখর পরিবেশ ও নির্বাচনী আমেজ। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে ক্ষমতাসীন ও প্রধান বিরোধী জোটের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে আগামী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কোনো অবস্থায় অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না—এই যুক্তিতে সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে। কিন্তু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার যে বিধান রাখা হয়েছে, তাতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো দূরের কথা—এমনকি নির্বাচন করাও কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন একজন নির্বাচন কমিশনার। রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঝে-মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনা উঁকি দিলেও সংবিধানের বাইরে কোনো ধরনের সমঝোতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনো অনড় আছে আওয়ামী লীগ। সুনির্দিষ্ট দুটি ইস্যু—তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না বলে তারা বার বার জানিয়ে আসছে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতারা নির্বাচন নিয়ে বিশেষ করে সংসদ ও মন্ত্রিসভা বহাল থাকা নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী সব সময় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের কথা বললেও, সর্বশেষ মন্তব্য করেছেন যে সংসদ ও মন্ত্রীদের বহাল রেখেই নির্বাচন হবে। সংবিধানে এই বিধান থাকলেও এখন শেষ মুহূর্তে এসে তাকে আঁঁকড়ে ধরে থাকা মানে হচ্ছে বিরোধী জোটকে ভিন্ন দিকে ঠেলে দেয়া। প্রধানমন্ত্রীর সামপ্রতিক এ বক্তব্য তাঁর আগের অবস্থানের সঙ্গে সাযুজ্যও নয়। এর আগে খোদ জাতীয় সংসদে তিনি নির্বাচনের সময় সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা বলেছিলেন; এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। এছাড়া কিছুদিন আগে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘নির্বাচনকালে সংসদ ভেঙে দেয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্যকেও এক্ষেত্রে আরেকটি উদাহরণ হিসেবে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু গত ২ সেপ্টেম্বর সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে দেয়া বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা ওই অবস্থান থেকে সরে আসেন। এ ধরনের উল্টা বক্তব্য রাজনৈতিক মহল কেন—দেশি-বিদেশি কোনো মহলেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সংসদ বহাল রাখার ইঙ্গিত স্পষ্ট করার পর ক’দিন না যেতেই সরকারের তরফ থেকে শোনা গেল ভিন্ন সুর। এবার দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বিবিসি সংলাপে বললেন, নির্বাচনকালে সংসদ বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনার পর। কিন্তু যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, সেখানে তাঁর উপদেষ্টার কথায় কতটুকু ভরসা করা যায়? আবার নির্বাচন কমিশন চাইলে সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারে— এইচ টি ইমামের এমন মন্তব্যের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ সাংবাদিকদের জানালেন, ‘সংসদ ভাঙ্গা বা বহাল রাখার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের নির্বাচন কমিশনের নয়।’ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য চলমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে বৈকি। একটি বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও নির্বাচন করার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। তবে, যেসব গণতান্ত্রিক দেশের কথা প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে থাকেন, সেসব দেশে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয় কি না—এটা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী জানেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ২৯ অক্টোবর সংসদ ভেঙে দেবেন বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটাই তাঁর গণতান্ত্রিক চেতনা ও চিন্তাধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল। হঠাত্ কেন প্রধানমন্ত্রী সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে চাইছেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। হয়তো তিনি বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এ ধরনের খেলা খেলছেন। কিন্তু কোনো একটি কথা বা বিবৃতি সংসদে ও রেডিও-টিভিতে ঘোষণা দেয়ার পর সেটা যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয় না থেকে সকলের বিষয় হয়ে যায়, প্রধানমন্ত্রীর তা না বোঝার কথা নয়। উপরন্তু, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সংসদ না ভেঙে নির্বাচনের দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেমন নেই, বাংলাদেশেও নেই। কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদী কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্ষমতায় যায়, আবার বিরোধী দলে আসে—এটাই বাস্তবতা। বর্তমান সরকারের কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে, যে ক’দিন ক্ষমতায় থাকা যায়, তার চেষ্টা করছে তারা। আওয়ামী লীগের মতো একটি দল কেন সংবিধানের অস্পষ্ট ধারার দোহাই দিয়ে বিতর্কিতভাবে মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তা করবে, তা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। সংবিধানে অস্পষ্টতা থাকলেও গণতন্ত্রের প্রথাগত নিয়ম ও ঐতিহ্য মেনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার দিকনির্দেশনাও সংবিধানে দেয়া থাকলেও সরকার সেই পথে যেতে সমস্যা কোথায়? বিরোধী দল হিসেবে বরং বিএনপির অবস্থান এখন অনেকটাই নমনীয়। বিএনপির তত্পরতা দেখে মনে হচ্ছে, দলটির কৌশল হলো কূটনীতিকমহলের উদ্যোগের প্রতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমর্থন জানানো। ফলে এক্ষেত্রেও সরকারি দলই বেশি চাপের মুখে পড়বে বলে আমার ধারণা। আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বিএনপি হেকমতের পরিচয় দিয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও দলটি কোনো কর্মসূচি দেয়নি। শুধু দেশব্যাপী জেলায় জেলায় খালেদা জিয়ার গণসংযোগ কর্মসূচি আগের মতোই চলছে। বিএনপি হয়তো সব শেষে সরকারের অবস্থান দেখে দাবি আদায়ে অবরোধসহ লাগাতার কর্মসূচি দিবে। আর মেয়াদের শেষ সময়ের এই আন্দোলনে বিরোধী দল যে ঝুঁকিও নেবে—এটা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়। কারণ সামনে যতদিন যাবে মনোবল ভেঙে যাবে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের। পত্রিকার খবরে এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের কমিটি করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক নেতাকর্মী পাওয়া যাচ্ছে না! এক্ষেত্রে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে গত নির্বাচনের আগে উদ্ভূত সংকট এবং পরবর্তী পরিস্থিতি এক্ষেত্রে হয়তো বিবেচনা করা হচ্ছে। আলোচিত লগি-বৈঠার আন্দোলন হয়েছিল জোট সরকারের পদত্যাগের পরের দিন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমঝোতার ব্যর্থতা এবং ক্রমাগত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ ধরে দেশে জরুরি অবস্থাও জারি হয়েছিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, চারদলীয় জোট সরকারের উদ্যোগে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির একতরফা একটি নির্বাচন জাতিসংঘের কথিত একটি চিঠির সূত্র ধরেই বাতিল হয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান দুই দলের অনড় অবস্থানের মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে স্বাভাবিকভাবেই অতীতের মতো কূটনৈতিক চাপও তত বাড়তে থাকবে। এমনকি এক পর্যায়ে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যাপারে কূটনীতিক গোষ্ঠী নীতিগত একটি অবস্থানও নিতে পারে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, দুই দলের নেতারা নিজেরাই যদি নির্বাচনের ব্যাপারে যার যার অবস্থানে অটল থাকেন, তাহলে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বা মধ্যস্থতায় আদৌ কোনো সুফল পাওয়া যাবে কি? এ ব্যাপারে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ১৯৯৬ সালে দেশে প্রায় একই রকম রাজনৈতিক সংকট বিরাজ করছিল। সে সময় মধ্যস্থতার জন্য এসেছিলেন কমনওয়েলথের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার মধ্যে একটি আপস রফার চেষ্টা করেছিলেন স্টিফেন। সবাই জানেন, তার সে মিশন ব্যর্থ হয়েছিল। চলমান সংকটে এখন বাকি আছে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে বাড়তে এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত গিয়েছে। রাজনীতির জন্য সর্বশেষ দূর্বার্তা হচ্ছে, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাও আপাতত আর হচ্ছে না। গত ১৩ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আলোচনা হচ্ছে না’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট ও আগামী নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নিউইয়র্কে আলোচনার জন্য সরকারি দল রাজি না হওয়ায় বিএনপির প্রতিনিধি দলও জাতিসংঘে যাওয়ার কর্মসূচি বাতিল করেছে।’ এতকিছুর পরও সমাধান না হওয়ার লক্ষণ ভালো নয়, এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আলোচনার পথ এভাবে বন্ধ হতে থাকলে এক পর্যায়ে অনিবার্য হয়ে পড়বে সংঘাত-সংঘর্ষ। আগামী নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের যে আশু ও শান্তিপূর্ণ সমাধান জরুরি হয়ে পড়লেও প্রশ্ন হলো, সেই সমাধানটি কীভাবে হবে। সংকট উত্তোরণের জন্য এই মুহূর্তে যা করা যেতে পারে তা হলো, সংসদের সর্বশেষ যে অধিবেশন শুরু হয়েছে, বিরোধী দল এই অধিবেশনে অংশ নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো সম্পর্কে তাদের রূপরেখা তুলে ধরতে পারে। একইভাবে সরকারি দলও চাইলে বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের মানুষ উভয়পক্ষের প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে এবং এর তুলনামূলক বিচার করতে পারবে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথ সুগম করতে আরও কয়েকটি বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। যেমন: সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রশ্নটিকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে; এবং আগামী সংসদ নির্বাচন ও সংসদ বহাল থাকা নিয়ে সরকারি দলের অবস্থান স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করা জরুরি। এ ছাড়া জাতিসংঘের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রাজনৈতিক) অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর আবার বাংলাদেশে আসার কথা আছে। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে কোনো সমঝোতা করা যায় কি না, তা উভয় দল ভেবে দেখতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের নিজ নিজ অনড় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে; আর এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কথায় আছে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? প্রধান দুই দলকে আলোচনার টেবিলে একত্রিত করাতে পারবেন কে বা কারা? জাতির এ ক্রান্তিকালে কোনো না কোনো পক্ষকে তো সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সেটা বিদেশি তথা পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারীদের পরিবর্তে নিজেরা বসে সমঝোতায় আসতে পারলেই ভালো হয়। কারণ বিদেশিদের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের বিবাদ-মীমাংসার চেষ্টায় কখনও ভালো ফল মেলেনি। বরং প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক নেতারা কূটনীতিকদের দেশের পরিস্থিতিতে অযাচিতভাবে নাক গলানোর যে সুযোগ তৈরি করে দেন, জনগণ কখনও তা ভালো চোখে দেখেনি। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন